ডুবে ডুবে ডুবসাঁতার

‘ডুব’ সিনেমা রিলিজ নিয়ে পরিচালক মোস্তফা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী স্বস্তিতে আছেন, আবার সিনেমা রিলিজের একমাত্র বাধা মেহের আফরোজ শাওনও স্বস্তিতে আছেন। তবে অস্বস্তিতে কারা আছেন?

পরিস্কার করে বলি। ডুব সিনেমাটি রিলিজ পাওয়ার কথা ছিলো পহেলা বৈশাখে। কিন্তু অভিযোগ ওঠে সিনেমাটি সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ এর বায়োপিক। এই অভিযোগে হুমায়ুন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন তথ্যমন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন। এতেই বেধে যায় ঝামেলা। আটকে যায় সিনেমাটি। যদিও সিনেমার পরিচালক বরাবরই দাবী করে আসছেন সিনেমাটি কারো বায়োপিক নয়।

‘ডুব’ সিনেমা বায়োপিক বা বায়োপিক নয় এ নিয়ে বিতর্ক আপনারা ইতোমধ্যে অনেক শুনেছেন। সে ব্যাপারে আর আলোচনা করতে চাইনা। কথা বলতে চাই অন্য প্রসঙ্গে।

সব বাধা শেষে ‘ডুব’ সিনেমাটি রিলিজ পেতে যাচ্ছে। আর রিলিজের জন্য মানতে হয়েছে শর্ত। কাচি মারতে হয়েছে স্ক্রিপ্ট রাইটার ও সিনেমার পরিচালকের মেধার সম্পূর্ণ প্রতিফলনের উপর। সিনেমার পাঁচটি দৃশ্য কাটতে হয়েছে শর্ত মোতাবেক। এ ব্যাপারে পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন মিডিয়ায় জানতে চাওয়া হলে জানা যায়, ডুব সিনেমাটি অবশেষে রিলিজ পেয়েছে, এতে তিনি স্বস্তিতে আছেন। সিনেমাতে করাত মারার পরেও স্বস্তির ব্যাপারটা আসলে কেমন তা বোঝা গেলোনা। তবে কী তিনি ভেবছেন যে, শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি রিলিজ পাচ্ছে এইতো বেশি।

 

আবার একই সাথে সিনেমাটি রিলিজ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মেহের আফরোজ শাওন। তিনিও নাকি স্বস্তিতে আছেন। সিনেমা থেকে পাঁচটি দৃশ্য কাটাকে তিনি বিজয় হিসেবেই দেখছেন। এখানেই তার স্বস্তি।

কথা হলো শর্ত মেনে দৃশ্য কাটার পরেও যখন পরিচালক স্বস্তিতে আছে, সিনেমাটি রিলিজে একমাত্র বাধা মেহের আফরোজ শাওন স্বস্তিতে আছে, তবে অস্বস্তিতে আছে কারা? তাদের অস্বস্তিটাই তাহলে কোথায়?

আসলে অস্বস্তিতে আছে সিনেমার দর্শক। দর্শকদের মনে হতে পারে তাদের প্রচণ্ড টক কাচা আম খেতে দেওয়া হয়েছে লবন ছাড়া। সিনেমাটি যখন মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর, দর্শক তবে সাহস করে সে কাচা আমে কামড় বসাবেই। তবে ভয় হচ্ছে কামড় দিয়ে বিব্রত না হতে হয়।

এবার একটু মেহের আফরোজ শাওনের সিনেমার কথায় আসি। তিনিও সিনেমা বানিয়েছেন। ভবিষ্যতেও বানাবেন নিশ্চই। সে ছবিতে প্রেম থাকবে, অভিমান থাকবে, দুঃখ থাকবে, রাগ থাকবে, ঝামেলা থাকবে। কথা হলো তিনি যে সিনেমা বানিয়েছেন তা কারও না কারও জীবনের সাথে মিলে গেছে। ভবিষ্যতেও যে সিনেমা বানাবেন তাতেও কারও না কারও জীবনের গল্পের সাথে মিলে যাবে। তবে সে ব্যাক্তি বা ব্যাক্তিবর্গ এসে যদি দাবি করে যে, এই গল্প তার বায়োপিক, তখন মেহের আফরোজ শাওনের অবস্থান কি একই থাকবে?

সেন্সরবোর্ড এর ব্যাপারটাইবা কেমন? আচ্ছা ধরুন কেউ রাজনীতি বিষয়ক একটি সিনেমা বানিয়েছে। রাজনৈতিক সিনেমাতে একজন নেতার বক্তৃতা থাকে, পুলিশের পিটানি থাকে, মার খাওয়া থাকে, মার দেওয়া থাকে। মিছিল থাকে, মিটিং থাকে। দল পরিবর্তন থাকে। দলে বেঈমানি থাকে। মৃত্যু থাকে।

যারা রাজনীতি করে তাদের কারও না কারও সাথে সে সিনেমার গল্প মিলে যেতেই পারে। এখন যদি কারও জীবনের সাথে কিছু কিছু মিলে যায় এবং সে যদি দাবী করে যে এটা তার বায়োপিক, তবেকি তার দেওয়া অভিযোগে সে সিনেমা আটিকে দেওয়া হবে? তার সাথে হুবহু মিলে গেছে এমন পাঁচটা ছয়টা দৃশ্য কেটে দেওয়া হবে? যদি এমন হয় তবে এ দেশে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বলে কিছু থাকবেনা।

 

এবার বায়োপিক এর কথা বলি। সিনেমাটি যদি বায়োপিকই হতো তাতে সমস্যাটা কি? এমন একজন গুণী মানুষকে নিয়ে বায়োপিক হতেই পারে। পৃথিবীতে অনেক অনেক গুণী মানুষকে নিয়ে বায়োপিক হয়েছে। তবে হুমায়ূন আহমেদের বায়োপিক সিনেমা হলে মেহের আফরোজ শাওনের সমস্যাটা কি জানতে ইচ্ছে হয়। তার ভয়টা আসলে কিসে? এমন কোনো ব্যাপার আছে কী যা তিনি দর্শকদের থেকে লুকোতে চান? আশাকরি এমন কিছু নেই।

আচ্ছা যদি কেউ হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে বায়োপিক বানাতেও চায় তবে তার অনুমতি নেওয়া লাগবে কেনো? হুমায়ুন আহমেদকে কি তিনি তার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সম্পত্তি মনে করেন? আচ্ছা কেউ যদি সেক্সপিয়ার, দস্তয়ভস্কি অথবা  অন্য কোনো বিখ্যাত কাউকে নিয়ে বায়োপিক সিনেমা বানাতে যায় তবে কী খুজে খুজে তাদের পরিবারের এক একজনের কাছে যেয়ে অনুমতি নিয়ে আসতে হবে? প্রাচীন বিখ্যাত ব্যক্তিদের কারোরই পরিবারের খুজে পাওয়া যাবেনা বোধয়। তাদের পরিবারের কারও যদি শেষ পর্জন্ত খোঁজ না পাওয়া যায় তবে কী সিনেমাটি বানানো বাদ দিয়ে দিতে হবে?

বায়োপিক বানানোর ক্ষেত্রে অনুমতির ব্যাপারে দেশে কি আইন আছে আমার জানা নেই। আর জানতেও চাইনা। চাইলেই পৃথিবীর সবকছুর মধ্যেই একটা সহজ অঙ্ক কষা যায়। অতো কঠিন কিছু না করলেও চলে। হ্যা কাউকে নিয়ে বায়োপিক বানাতে গেলে অনেক তথ্যের প্রয়োজন।

সঠিক তথ্যের প্রয়োজন। সে কারণে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে সঠিক তথ্যগুলো সংগ্রহ করা খুবই জরুরী। এর জন্য পরিবারের সকল সদস্যর সাথে কথা বলে নিলে ভাল হয়। কিন্তু কেউ যদি দুই একজন সদস্য বাদ দিয়েও সব সঠিক তথ্য দিয়ে বায়োপিক বানাতে পারে তবে সে দুই একজনের সাথে যোগাযোগ করতেই হবে তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যার জীবনের বায়োপিক করছি তার জীবনের গল্পের সঠিক উপস্থাপন হলেইতো ক্ষতি কিছু দেখছিনা।

সর্বশেষ কথা হলো, হুমায়ুন আহমেদ কারও ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সম্পত্তি নয়। হুমায়ুন আহমেদ একজন আকাশ। সে আকাশকে সবার অধিকার আছে ভালবাসার। সে আকাশকে মানুষকে ভালবাসতে দিন। আকাশটা আরও সুন্দর হতে দিন। আকাশটা আরও বড় হতে দিন। এ আকাশটিকে বিশ্বমণ্ডলে ছড়িয়ে যেতে দিন।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও দিনে দিনে আরেকটা আকাশ হয়ে উঠেছেন। তাকে তাকে আরও বড় হতে দিন। ফারুকী নামের আকাশটাকে আরও উদার হতে দিন। পারলে সাহায্য করুন, না পারলে দয়া করে বাধা হয়ে দাঁড়াবেননা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।