ডিম দিয়ে মসুরীর ডালের গল্প

আলম ঘরে ঢুকেই বললো- কালকে তো ইন্টারের রেজাল্ট দিবে।

দীপা বললো- ও।

– ও মানে? বুঝতেছো ব্যাপারটা? আমার তো মনেই ছিলো না! দুপুর বেলায় শুনলাম কালামের মুখে। তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করলাম আরও চাইর মন দুধের। কালোজাম মিষ্টি একটু বেশী বানাইতে বলছি। চমচম তিরিশ কেজি বেশি। একটু ক্ষীরসাপাতিও বেশী করে করতে বলছি কারিগরকে। ভালো করছি না?

দীপা গম্ভীর মুখে বললো- মিষ্টির আলাপ পরে। তোমাকে কতবার না বলছি ছাতা নিয়ে বাইর হইতে? বাইরে তো এখনও টিপটিপ বৃষ্টি পড়তেছে। মাথা মুছো আগে।

দীপা তোয়ালে হাতে ধরিয়ে চলে গেলো। আলমের ইচ্ছা করছিলো বলতে মাথাটা মুছিয়ে দাও। দীপার গম্ভীর মুখ দেখে আর সাহস হলো না।

বিয়ের পরে প্রথম প্রথম এই জিনিসটা হতো। আলম গোসল করে বের হতে হতে বলতো নাস্তা দাও।

দীপা কড়া মুখে বলতো- আরে! মাথাটাই তো ঠিকমতো মুছো নাই! আমার কাছে তোয়ালে দাও, মুছে দিতেছি।

সেইসব ছিলো সুখের দিন। আলমের ছোট্ট একটা চাকরী ছিলো। নয়টা-পাঁচটা অফিস। শেষ করেই সোজা বাসায়। দীপা হয়তো তরকারী কুটতে বসেছে। আলম পাশেই একটা টুল টেনে বসতো। তারপর গুটগুট আলাপ। বা মাঝেমধ্যে হোটেল থেকে গরম গরম ডালপুরী কিনে আনতো। দীপা ধনেপাতা দিয়ে একটা চাটনী বানাতো। কুটকুট করে খাওয়া।

বছর তিনেক হয়ে গেলো বিয়ের। কোন ছেলেপুলে নেই। ঝোঁকের মাথায় চাকরিটাও ছেড়ে দিয়ে দুই বছর ধরে এই মিষ্টির দোকান নিয়ে আছে আলম। ব্যবসা ব্যবসা করেই সারাটা দিন যায়। দোকান বন্ধ করে এগারোটার আগে বাসায়ই ঢুকতে পারে না। আগের সেই গুটুরগুটুর আলাপ মাথায় উঠেছে।

দীপার মেজাজটাও কেমন যেন তিরিক্ষী হয়ে গেছে। কথা বলতে কেমন যেন ভয় ভয় লাগে। নিজে বউয়ের সাথে একটু রংঢং করে কথা না বলতে পারলে ভালো লাগে?

আলম ফস করে একটা সিগারেট ধরালো। রান্নাঘর থেকে দীপা চেঁচিয়ে বললো- কতবার না বলছি ঘরের মধ্যে সিগারেট ধরাবা না? মানুষটা কথাও শুনে না। বারান্দায় সিগারেট খাইলে কী হয়?

আলম বারান্দার দিকে তাকালো। বৃষ্টি বেড়ে গেছে এখন। বারান্দায় গিয়ে সিগারেট খাবার উপায় নেই। সিগারেট নিভিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেলো- কী রান্না করছো দীপা?

– আলু ঘণ্ট, তেলাপিয়া মাছের তরকারী।

– ইসস… তেলাপিয়া মাছের আবার তরকারী করতে গেছে ক্যান? এইটা ভূনা ভূনা করে খাওয়ার মাছ। পানি দিলেই কেমন ঘাস ঘাস লাগে না?

– খাও, আজকে একটু ঘাস ঘাসই খাও। কালকে ভূনা খাইয়ো।

খাবার টেবিল আছে, চেয়ার আর কেনা হলো না। খাওয়ার সময় টেবিলটা টান দিয়ে খাটেই বসে ওরা। ভাত মাখতে মাখতে আলম বললো- বৃষ্টি হইলে আম্মা কী করতো জানো?

– কী?

– দুই মুঠা মসুরীর ডাল নিতো হাঁড়িতে। একটু পেঁয়াজের কুঁচি, হলুদ, নুন, মরিচের গুঁড়া আর একটু রসুনের কুঁচি দিয়ে সর্ষের তেল দিয়ে ভালো করে মাখাইতো। তারপর একটু পানি দিয়ে চুলায় বসায়ে দিতো।

– মানে মসুরীর ডাল রানতেন?

– আরে শেষ করতে দাও না! ঐ ডাল যখন মাখামাখা অবস্থায় চলে আসতো, আম্মা সাবধানে ডিম ছেড়ে দিতো উপরে। তারপরে কয়েকটা কাঁচামরিচ দিয়ে ঢেকে দিতো। আহারে… কী মজা করে খাইতাম আম্মার রান্না…

দীপা জবাব দিলো- উমম।

– তবে তোমার রান্নাও মজা বউ। শীতকালে হাঁসের তেলতেলা সালুনটা যা হয়না তুমি রানলে… খকখক… খকখক…

– কী হইলো? তেলাপিয়া মাছের কাঁটাও মানুষের গলায় লাগে? দেখি, একটু শুকনা ভাত খাও।

আলম খাওয়া ছেড়ে উঠে গেলো বারান্দায়। বৃষ্টির মধ্যেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গলায় আঙ্গুল দিয়ে কাঁটা বের করার চেষ্টা করছে। দীপার মন খারাপ হয়ে গেলো। এতো খেতে পছন্দ করে মানুষটা! মিষ্টির দোকানে ইনকাম নাই। সপ্তাহে এক দুইটা দিন শস্তার তেলাপিয়া মাছ, গ্রাস কার্প নাহলে মুরগি-টুরগি রান্না হয় বাসায়। আর আজকেই লোকটার এই দুর্গতি হওয়া লাগলো?

মাছের কাঁটা বের হয়েছে। আলমের একটু বমি-টমিও হয়েছে। চোখমুখ লালচে।

দীপা বললো- খাওয়ার তো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। একটু গরম করে দেই?

– গরম করা লাগবে না। রুচী হইতেছে না আজকে আর।

দীপা কথা না বাড়িয়ে প্লেটগুলো নিয়ে ভিতরে চলে গেলো। আলমের একটু মন খারাপ হলো। আহারে, কষ্ট করে রান্না করেছিলো। এই মাছের কাঁটাটাই যত সমস্যার গোঁড়া।

বৃষ্টিটা পড়েই যাচ্ছে একনাগাড়ে। ঘুমানোর আগে কারিগরকে ফোন দিলো একটা। চমচম সিরায় ভিজানো হইছে। সারারাত রস খেয়ে ফুলে টইটুম্বুর হয়ে উঠবে ঐগুলা। সকালে ঐগুলা শোকেসে সাজায়ে মাওয়া ছিটাইতে হবে। সন্দেশটাও একটু বাড়ায়ে রাখতে পারলে ভালো হইতো। যেইটাই বানাক, কালকে বিক্রি মিস নাই। সন্ধ্যার আগেই দোকান খালি হয়ে যাবে। তা হইলে এইবার দুইটা চেয়ার বানায়ে ফেলতে হবে। খাওয়ার সময় টেবিল টানাটানি আর ভাল্লাগে না।

কই গো দীপা, শুইতে আসবা না? – আলম হাঁক দেয়।

আমি আসতেছি। তুমি ঘুমাও। গলার ব্যাথা গেছে? – দীপা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বলে।

– গেছে। সকালে ডাক দিয়ো।

আলম আরেকটা সিগারেট ধরাতে গিয়েও ধরালো না। এমনিতেই রান্না করা মাছ খায়নি, দীপার মেজাজ গরম থাকার কথা। ঝামেলা বাড়ানোর আর দরকার নাই!

গভীর রাতে দীপা ঘুম ভাঙালো আলমের। ঝমঝম শব্দে বৃষ্টি পড়ছে টিনের চালে। আলম ঘুম ঘুম গলায় বললো- কী ব্যাপার? আজকেও টিনের ফুটা দিয়ে পানি পড়তেছে? পরশু না ঠিক করাইলাম?

দীপা বললো- খাইতে আসো। খালি পেটে তো বিয়ের তিনটা বছর তোমাকে ঘুমাইতে দেখলাম না!

আলম দেখলো টেবিল খাটের সাথে লাগানো। তাতে গরম গরম ভাত। একপদের তরকারী। মাখামাখা মসুরীর ডাল। উপরে গোল হয়ে ছড়িয়ে থাকা দুটা ডিম।

– কী তেলেসমাতি! না ঘুমায়ে তুমি তা হইলে এইসব করছো? সেহরি খাইতে বসছি মনে হইতেছে!

– সেহরিই মনে করো। ঈদ গেছে আর কয়দিন হইলো?

আলম কপকপ করে খাওয়া শুরু করেছে। দীপারও খাওয়া শুরু করা উচিৎ, কিন্তু তার খালি আলমের খাওয়াই দেখে যেতে ইচ্ছা করছে। আহারে, কী আগ্রহ নিয়েই মানুষটা খেয়ে যাচ্ছে।

দীপা জিজ্ঞেস করলো- আম্মার মতোন হইছে?

– হইছে। মজা হইছে বউ। শর্ষের তেলের ঝাঁজটা নাকে আসতেছে। আচ্ছা,কালকে জিলাপীও কিছু বাড়ায়ে রাখতে পারলে ভালো হইতো, কী বলো? মানুষ পাশের খুশিটুশিতে মসজিদে সিন্নীটিন্নী দেয়। আমি আসলে একটা গাধা, বিরাট বড় গাধা।

বৃষ্টির আওয়াজে কথা শোনাই কষ্ট হয়ে গিয়েছে। না শোনা যাক। খেতে খেতে, কথা শোনার চেষ্টা করতেই দীপার ভীষণ ভালো লাগছে। ভীষণ!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।