ডাকবাক্স || ছোটগল্প

– শালু আপা,ডাকবাক্সটা থাকনা।

– পুরানো জিনিস। এখন কী আর চিঠি পত্র আসে! কী করবো রেখে শুধু শুধু?

– থাকনা আপা। ভীষন ভালোলাগে দেখতে। দাদার মুখে কত্ত মজার গল্প শুনেছি ডাকবাক্সটা নিয়ে। বাবাও তো কম মজার গল্প বলেননি!

– তা ঠিক। তাদের অনেক স্মৃতি এ ডাকবাক্স নিয়ে। থাক তবে।

খুশি যেনো আকাশ ছোঁয় লিলির। বেণি দুলিয়ে খুশিতে নেচে বেড়ায়। ওর উচ্ছ্বাস  দেখে হেসে ফেলে শালু। ‘পাগলি মেয়ে’ বলেই নিজের কাজে মন দেয় ও।

হিন্দু পাড়া শেষ হতেই প্রথম পড়ে ওদের বাড়িটা। তবে বাড়ির ধরনে বাড়িতে ঢুকে যে কেউই ভুল করে হিন্দু বাড়ি ভেবে বসবে। এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে। ভীষন পুরনো একতলা বাড়ি। চারপাশে নানান ফুলের গাছ। মিশ্র সুভাসে সারাদিনই ভরে থাকে বাড়িটা। পেছনের বড় বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে কাঠমালতি গাছের ডালগুলো নাড়ায় লিলি শালু এদিকটায় দাঁড়ালেই। তারপর হেসে ছুটে যায় অন্য পাগলামীতে।

বাড়ি জুড়ে শালু, লিলি আর ওদের মা। বড় ভাই শহরে। বাবা গত হয়েছেন বছর দুই পাড় হলো। এরপর থেকে চঞ্চল চারপাশ খানিকটা শান্ত হয়ে গেলো। সন্ধ্যায় বড় ঘরে বসে বাবার হাত নেড়ে নেড়ে ভঙ্গি  করে গল্প বলার পাঠটা ফুরিয়ে গেলো বলে হাসির শব্দে বাড়িটা কেঁপে ওঠাও বন্ধ করে দিলো। মা তো সেই সবসময়ই কম কথা বলেন। উপর থেকে বাবার রসিকতার ঝাঁঝে যতটুকু হাসি বেড়িয়ে আসতো তার দেখা পাওয়াও বন্ধ হয়ে গেলো। ভাগ্যিস লিলি ছিলো! ওর অবুঝ কিশোরীপনায় তবুও খানিকটা জীবিত লাগে বাড়িটাকে।

শালুর ক্লান্ত লাগছে বেশ। প্রায়ই লাগে। মায়ের চোখের নিচের গাঢ়  কালো দাগ সে ক্লান্তিকে আরো বাড়ায় যেনো। মানুষটা দুশ্চিন্তায় কেমন মরা গাছের রোদে পোড়া শুকনো ডালের মতন হয়ে গেছেন! সংসারটা কী দারুনই তো চলছিলো! তবুও স্রষ্টা এমন কেনো চাইলেন? বাবার ওতো বড় রোগটা না হলেই কী হতো না? কিংবা এতো ওতো চেষ্টায় পাশে রাখা যেতো না মানুষটাকে? ধার দেনার পরিমান নাহয় থাকতোই এমন। তবুও বাড়িটা পূর্ণ থাকতো। ঘর জুরে খুশি থাকতো। মায়ের হাসি হাসি মুখটা থাকতো।

প্রত্যেক সপ্তাহে বড় ভাইয়ের চুড়ি কিনে দেওয়ার দিনগুলো থাকতো। সারাদিন বইয়ের পাতায় মুখ গুজে থাকা মানুষটা শহরে কত একলা হয়ে পড়েছে! সময় কি আর পায় এখন বই পড়ার? নিশ্চয়ই ক্লান্ত থাকে দিনশেষে! চোখ ভিজে ওঠে শালুর। হঠাৎ হকচকিয়ে ওঠে শালু। চোখ জোড়া মোছারও সুযোগ পায়না। দৌড়ে ঘরে ঢোকে লিলি। কি যে আনন্দ ওর চোখেমুখে! নিজেকে কয়েক সেকেন্ডেই সামলে নেয় শালু। লিলি দুমুঠো বাসন্তি রংয়া চুড়ি চোখের সামনে মেলে ধরে ওর। অবাক হয়ে তাকায় ও। লিলি একখানা চিঠির খামও বাড়িয়ে ধরে। শালু অবাক হয়ে দেখে কিছুক্ষন। তারপর খামটা খোলে। ভেতরে বড় ভাই তপুর চিঠি। গোটা গোটা সুন্দর লেখাগুলো চিনতে  ভুল হয়না ওর। পড়তে শুরু করে-

শালু,

চিঠিটা তুই পড়বি জানি।ভালো নেই জানি তো। তবে চেষ্টা করিস ভালো থাকার। আমায় নিয়ে ভাবিস না। আমিও চেষ্টা করি ভালো থাকতে। তোদের দুজনের জন্য দুমুঠো চুড়ি পাঠালাম। ওই রংয়ের দুজনের তো জামা আছে দুটো,মিলিয়ে পড়িস। মাকে বলিস একটু ঘুমোতে। চোখের নিচের কালো দাগ না বারুক আর। ভেতরটা মুচড়ে ওঠে বুঝলি! ফোনে তো আর ঠিক করে কথা বলা হয়ে ওঠে না। ওদিকে আমাদের সবার প্রিয় ডাকবাক্সটা! বাবার সাথে সাথে যেনো ওটার গল্পও মরে গেছে। ভাবলাম কিছু আবেগ জমা পড়ুক ওখানে আবার নতুন করে। তাই জামালকে বললাম খামটা হাতে না দিক তোদের,যেনো ডাকবাক্সে ফেলে যায়। তোর চোখ এড়িয়ে গেলেও লিলিটা ঠিকই খুঁজে নিবে। মাঝে মাঝে চোখ রাখিস এখন থেকে। মা আর নিজের যত্ন নিস। লিলির দিকে খেয়াল রাখিস।
ভালোবাসা সবার জন্য।

ইতি

তোদের দাভাই

চোখের জলে চিঠিটা ভিজে যায়। ভেতরটায় ভালোলাগা,খারাপ লাগার এক মিশ্র অনুভুতি টের পায় শালু। চিঠি দিয়ে চুড়ি নিয়ে যেমনি চঞ্চল চড়ুইয়ের মতন ফুরুত করে উড়ে গিয়েছিল লিলি,তেমনি আবার ফিরে এলো। শালুর পাশে বসে চুড়িতে ভরা হাত শালুর কানের কাছে নিয়ে নাড়ালো। দুগাল হেসে বললো কি লিখেছে আপা দাভাই? চলনা মাকে শোনাই। চুড়ি দেখে বেশ খুশি সে! শালু মুচকি হেসে বলে, চল লিলি সোনা।

হলদে তোয়ালে দিয়ে ডাকবাক্সের উপর থেকে ধুলোগুলো মোছে লিলি। দু’দিনেই কেমন একগাদা ধুলো জমে যায়। স্মৃতিগুলোতে এমন ধুলো জমে ঢেকে যায়না কেনো সবটা। বাড়ির সব তো বদলালো একে একে। বাবা হারালেন।  প্রথম বদলটার শুরু সেখান থেকেই। সংসারের হাল ধরে বাবার পরের স্নেহে মাথায় রাখা আরো একটা প্রিয় হাত চলে গেলো শহরে,তপু,ওদের দাভাই। বাড়িটা পড়ে রইলো নিরব। মা চুপসে গেলেন। বোনটা  সামলাতে লাগলো সব। লিলির দস্যিপনা,চঞ্চলতা তখনো চলতো। দাভাই মাসে তিন চারটে চিঠি পাঠাতো শহরের ওর কাছের কেউ এমুখো হলেই।

ডাকবাক্সটা প্রাণ পেলো আবারো। দাদার চিঠি ছাড়াও আরো কেউ  একজনের আবেগ যে খামভর্তি হয়ে এ ডাকবাক্সে জমা হতো তা টেরই পায়নি লিলি। মায়ের মতন বোনটাও নিজের মধ্যে রাখতো সবটা। নাহয় লিলিকে অবুঝ ভেবেছিল হয়তো। খারাপ কি! অবুঝইতো ছিলো ও! তবুও ভালোই। বড্ড ভালো মানুষ রাহাত ভাই। কত উপকার করেছে ওদের। আর শালু আপা! এমন মানুষকে যে কেউই ভালোবেসে ফেলবেন। কোনো রকম চাওয়া টাওয়ার হিসেব ছাড়াই ওর শালু আপাকে তারা নিজেদের ঘরের বউ করে নিলেন। মায়ের কাধ অনেকটা হালকা হলো। কি খুশিইনা ছিলেন সেদিন!

দাভাইয়ের চোখেমুখেও শান্তি ছিলো। শুধু খুশি হতে পারেনি লিলি। শালু আপা ছাড়া কী আর চলে ওর! তবে ধারনাটা ভুল প্রমান হলো সপ্তাহ দুয়েক কাটতেই। দিনগুলো ঠিক চলতে লাগলো। আগের মত না হোক,থেমে থাকেনি। আর এই যে আজ! কিশোরীর গন্ডি পেরিয়ে কেমন তরুনী হয়ে উঠেছে ও! কত কি ভাবতে শিখেছে,বুঝতে শিখেছে। মা,বাড়িটা আর প্রিয় ডাকবাক্সটার খোঁজ তো একাই রাখে এখন। দাভাই,শালু আপা নিয়ম করে চিঠি পাঠায় এর ওর হাতে। ডাকপিয়ন নেই তো কি! চিঠিগুলো হাতে দেয়না কেউ,ডাকবাক্সে ফেলে যায়। আর সে! সেই চিঠিগুলো!

– লিলি, এই লিলি

মায়ের ডাকে কেঁপে ওঠে লিলি। চিঠিটা আরাল করে চটজলদি। মা দেখে ফেললে খুব লজ্জা পেয়ে যাবে। হলদে তোয়ালেতে চিঠিটা মুড়ে ভেতরের দিকে পা ছোটায় লিলি। ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে তাকায় একবার। কত কী বদলে গেলো জীবনের! কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ডাকবাক্সের রংটাও!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।