টেস্ট লিগ-ওয়ানডে লিগ: ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ

প্রায় দুই বছরের চেষ্টার পরে ক্রিকেট নতুন এক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে চলেছে। এ দু’বছরে এ ব্যাপারে অনেক অনেক মডেল আলোচিত হয়েছে, প্রত্যাখ্যাত হয়েছে কিন্তু ২০১৭ এ এসে প্রায় সবাই একটা মডেল খুঁজে পেতে সক্ষম হয়েছে যাতে সবার চাহিদাই যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়েছে।

৯+৩ মানে মোট ১২ দলের টেস্ট লিগ আর ১৩ দলের ওয়ানডে লিগের মডেল কিছুদিন আগেই চূড়ান্ত করা হয়েছিলো। আগামী মাসে অকল্যান্ডে আইসিসি বোর্ডের কাছে এ মডেল অনুমোদন পেয়ে গেছে। বলা হচ্ছে,  নতুন এই কাঠামোর মধ্য দিয়ে ক্রিকেট প্রবেশ করবে তার নতুন যুগে।

টেস্ট লিগের উপরের স্তরের নয় দল দুই বছরের ব্লকে নিজেদের মধ্যে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে হোম এবং এওয়ে ভিত্তিতে ছয়টা সিরিজ খেলবে। হ্যাঁ, নেগোসিয়েশনের ব্যাপারটা আগের ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রামের মতো বহাল তবিয়তে থাকছে। এই টেস্ট লিগের শেষে পয়েন্ট তালিকার উপরের দুটো দল নিজেদের মধ্যে একটি ফাইনাল ম্যাচ খেলবে। যা মধ্য ২০২১ এ নিরপেক্ষ কোনো ভেন্যুতে (সম্ভবত ইংল্যান্ডে) অনুষ্ঠিত হবে।

কাগজে কলমে এ এক আদর্শ ব্যবস্থা মনে হলেও এর কিছু খুঁত রয়েছে। যেমন ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে হোম-অ্যাওয়ে সিরিজ হবার মতো অবস্থায় নেই। অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব বলেও মনে হচ্ছে না। ফলে, এখানে হস্তক্ষেপের কাজ করতে হবে আইসিসিকে।

আবার বাংলাদেশ টেস্টে উন্নতি করা সত্বেও কুলীন দলগুলো নিজেদের মাটিতে আমাদের আতিথ্য দিতে বরাবরই অনীহা প্রকাশ করে। ফলে, নতুন এই নিয়মে নি:সন্দেহে বাংলাদেশের পরাশক্তিদের সাথে টেস্ট খেলার সুযোগ বাড়ছে।

টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজ খেলতে পেরেছে ১ টি, ভারতে ১ টি টেস্ট, দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনটি, ইংল্যান্ডে ২ টি। এই হারটা এখন থেকে কমে যাওয়ার কথা।

টেস্ট লিগ হবে নয় দলের। মানে প্রথম স্তরের নয়টি দল থাকবে এখানে। আর ওয়ানডে লিগ হবে ১৩ দলের। প্রথম টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হবে ২০১৯ বিশ্বকাপের পর। ফাইনাল হবে ২০২১ সালের এপ্রিলের মধ্যে।
অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশ এই সময়ে ছয়টি টেস্ট সিরিজ খেলবে।

শর্ত হলো, এর মধ্যে তিনটি হতে হবে দেশের মাটিতে ও তিনটি বাইরে। প্রতিটি সিরিজ হবে অন্তত দুই টেস্টের। সর্বোচ্চ পাঁচটি টেস্ট থাকতে পারবে এক সিরিজে। টেস্ট লিগের বাইরেও অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করে টেস্ট খেলার সুযোগ, অর্থাত্ ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রামের বাইরেও টেস্ট খেলার সুযোগ থাকছে।

ওয়ানডে লিগ শুরু হবে ২০২০ সালের মে মাসে । দুই বছরব্যাপী টুর্নামেন্ট চলবে ২০২৩ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত। ওয়ানডে লিগকে তখন বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব হিসেবেও বিবেচনা করা হবে। ২০২৩ বিশ্বকাপের পর ওয়ানডে লিগ হয়ে যাবে তিন বছর মেয়াদী।

টেস্ট লিগের মডেল অনুসারে জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তান, আয়ারল্যান্ড হবে সে তিন দল যারা টেস্ট লিগে থাকবে না। এর পরিবর্তে উপরের নয় দল তাদের সূচির মাঝে ফাঁক বের করে এ তিন দলের সাথে খেলবে। এটা সম্ভব হতে পারে পরিপূর্ণ সদস্যদের নিজেদের সফরের সময়ে।

যেমন, কোনো দল ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে (পাকিস্তানের সাথে খেলতে) গেলে সেখানে আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তানের বিপক্ষে একটি টেস্ট খেলবে প্রস্তুতি ম্যাচের পরিবর্তে। এটাই আপাতত তাদের উন্নতির একমাত্র পথ।

ওয়ানডে লিগ খেলা হবে ১৩ দলের মধ্যে যার পুরষ্কার হবে বিশ্বকাপে কোয়ালিফিকেশন। প্রত্যেকটা দল বাকি বারো দলের আটটার বিপক্ষে খেলবে দুই বছরে। চলমান এফটিপি প্রোগ্রামের কড়া শিডিউল একে ২০২০ এর আগে শুরু হতে দিচ্ছে না। যার কারণে ওয়ানডে লিগ শুরু হবার সম্ভাব্য সময় নির্ধারিত হয়েছে ২০২০ এর মে মাসে।

টি-টোয়েন্টি সিরিজগুলো হবে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার ভিত্তিতে। কিন্তু, জানুয়ারি ২০২১ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আঞ্চলিক বাছাই পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। এ থেকে দলগুলো বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে।

এ ওয়ানডে লিগের প্রস্তাবিত কাঠামো অনর্থক দ্বিপক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজে কিছুটা লাগাম টেনে ধরবে। কিছুটা বলা হচ্ছে একারণে যে সদস্যরা মে ২০২২ থেকে জানুয়ারি ২০২৩ পর্যন্ত আট মাসের একটা উইন্ডো খোলা রেখেছ শুধু ইচ্ছেমতো ওয়ানডে খেলার জন্য। ২০২৩ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এ উইন্ডো হবে একটা ‘রান আপ পিরিয়ড’। এ সময়ে অনুষ্ঠিত সব ওডিআই ওয়ানডে লিগের আওতার বাইরে থাকবে এবং বিশ্বকাপে উত্তরণের ক্ষেত্রে কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়াবেনা।

কিন্তু, সবচেয়ে বড় সমস্যাটা দাঁড় করাতে পারে ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগগুলো। প্রায় প্রতি মাসেই কোনো না কোনো দেশের টি-টোয়েন্টি লিগ অনুষ্ঠিত হতে থাকে। একে কি করে ক্যালেন্ডারের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার হাত থেকে বাঁচানো যায়?

অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড, যারা নিজেদের টি-টোয়েন্টি লিগ তাদের আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের সমান্তরালে আয়োজন করে, তাদের ক্ষেত্রে এটা কোনো সমস্যা তৈরি করবে না। ভারতের ক্ষেত্রেও না, কারণ তাদের আইপিএলও আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডার ব্যতিরেকে হয় না।

সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়বে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) এবং ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকা (সিএসএ)। কারণ তাদের পিএসএল আর গ্লোবাল টি-টোয়েন্টি লিগ অনুষ্ঠিত হয় হোম সিজন চলাকালে। আর এটা পরিচালিত হয় প্রাইভেট ফ্র্যাঞ্চাইজি দ্বারা যারা চায় লিগে দলের স্টার ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ। নীতিনির্ধারকরা এসব সমস্যার সমাধান করেন কীভাবে এখন সেটাই দেখার বিষয়।

ইএসপিএন ক্রিকইনফো অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।