টেস্টে যেখানে দুর্বলতা বাংলাদেশের

ঘরের মাঠের সিরিজগুলো আপাতত শেষ এবছরের জন্য। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ দল দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থান করছে পূর্নাঙ্গ সিরিজ খেলার জন্য। মুশফিকুর রহিমের নেতৃত্বের দলটা শেষ সিরিজটায় ও অস্ট্রেলিয়ার মত দলের বিপক্ষে টেস্ট জিতে ১-১ এ টেস্ট সিরিজ ড্র করেছে। হোক সেটা রঙিন পোশাকেই কিংবা সাদা পোশাক, বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস এখন কিন্তু তুঙ্গে। মুখে বলছিনা, বরং পরিসংখ্যানে বলছি।

এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন কোচ ওটিস গিবসন তার সতীর্থের বলেই দিয়েছেন বাংলাদেশের কথা। সতর্ক করে দিয়েছেন সবাইকে। টেস্ট র‌্যাংকিংয়ের ২ নম্বর দল যখন ৯ নম্বর দলার বিপক্ষে মাঠে নামে তখন ওই ২ নম্বর দলটির মেজাজটা যেখানে ফুরফুরে থাকার কথা, সেখানে বলতে পারেন দক্ষিণ আফ্রিকা একটু দ্বিধাবোধই করছেন। প্রতিপক্ষটা যে বাংলাদেশ, তাই একটু বেশিই ভাবতে হচ্ছে তাদের বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারফরমেন্স দেখে। কেননা বাংলাদেশ দল দারুণ আত্মবিশ্বাসী। এমনটাই বললেন ওটিস গিবসন।

তারা স্বাগতিক দেশ। তাদের মতই মাঠ সাজাবে তারা। আমাদের করতে হবে পুরাতন সব ভুল ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে সামনে এগিয়ে যাওয়া। তাই আজ আমি সবার সামনে তুলে ধরব এমন এমন কিছু পরিসংখ্যান যেটা দেখে বুঝতে হবে টেস্টে আমরা কতটা আক্রমনাত্বক এবং অন্য টেস্ট দলগুলো কতটা রক্ষনশীল।

টেস্ট ক্রিকেট আক্রমনাত্বক নয়। এটা খেলতে হবে মাথা ঠান্ডা রেখে বলের গুনাগুন বিশ্লেষন করে। আপনি যদি সাদা পোশাকে মাঠে নেমে রঙিন পোষাকের ন্যায় টেস্ট খেলেন তাহলে ওটা আপনার বোকামি। আর যদি আপনাকে আপনার প্রশিক্ষক সেটা থেকে সরিয়ে না আনতে পারে তাইলে তাকে তার অবস্থান থেকেই সরে দাড়ানো উচিত।

এখন আসি মূল প্রসঙ্গে।

আলোচনার শুরুতে তুলে ধরব টেস্টে এই পর্যন্ত কোন দল কত রান করেছে তার একটা পরিসংখ্যান। এই পরিসংখ্যান তুলে ধরার কারনও আছে, সেটা পরেই বুঝতে পরবেন।

১৩০ বছরের টেস্ট ক্রিকেটে এই পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ৯৯০ ইনিংসে ৪,৮৪,০২৬ রান করেছে ইংলিশরা। বাকি দলগুলোর অবস্থান তাহলে একটু দেখে নিবেন।

টেস্টে সর্বাধিক রান

১. ইংল্যান্ড – ৪,৮৪,০২৬ রান (৯৯০ ইনিংস)

২. অস্ট্রেলিয়া – ৪,১৮,৩৪৪ রান (৮০৩ ইনিংস)

৩. ওয়েস্ট ইন্ডিজ – ২,৬২,৩৩৬ রান (৫২৬ ইনিংস)

৪. ভারত – ২,৬০,২১৫ রান (৫১৫ ইনিংস)

৫. দক্ষিণ আফ্রিকা – ২,০৫,২৬৩ রান (৪১৫ ইনিংস)

৬. পাকিস্তান – ২,০১,৫৩৭ রান (৪১৬ ইনিংস)

৭. নিউজিল্যান্ড – ১,৯৪,৭৯৪ রান (৪২২ ইনিংস)

৮. শ্রীলংকা – ১,৩২,৯৩৭ রান (২৬২ ইনিংস)

৯. জিম্বাবুয়ে – ৪৭,০৫৭ রান (১০২ ইনিংস)

১০. বাংলাদেশ – ৪৬,৬৮৯ রান (১০২ ইনিংস)

এতো দেখলেন মোট রানের হিসাব। এখন দেখানো যাক টেস্টে প্রতিটি দলের ব্যাটিং অ্যাভারেজ। টেস্টে সবচেয়ে বেশি ৩৪.৩৩ গড়ে রান তুলেছে অস্ট্রেলিয়া দলের ব্যাটসম্যানের আর সবচেয়ে কম ২৪.৬৫ গড়ে রান করেছে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানেরা। পুরো তালিকায় একটু চোখ বুলানো যাক।

টেস্টে প্রতিটি দলের ব্যাটিং গড়

১. অস্ট্রেলিয়া – ৩৪.৩৩ গড়

২. ভারত – ৩৩.৮৭

৩. শ্রীলংকা – ৩২.৮২

৪. পাকিস্তান – ৩২.৭৫

৫. ইংল্যান্ড – ৩২.৩৬

৬. দক্ষিণ আফ্রিকা – ৩২.৩০

৭. ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩২.১২

৮. নিউজিল্যান্ড – ২৮.৯৩

৯. জিম্বাবুয়ে – ২৬.৩৪

১০. বাংলাদেশ ২৪.৬৫

টেস্ট ক্রিকেটের পরিসংখ্যানের গভীরে আরো একটু যাওয়া যাক। প্রথমেই বলেছি টেস্ট খেলাটা রঙ্গিন পোষাকের মত আক্রমনাত্মক নয়। এটা ইকোনমিকের খেলা নয় যে একজন ব্যাটসম্যানকে প্রতি ওভারে নির্দিষ্ট পরিমাণে রান তুলতে হবে। কিন্তু আমাদের ব্যাটসম্যানেরা এই দিকেই যেন বেশি ঝোক দেয়। আমি বলছিনা, এটা বলছে পরিসংখ্যান।

টেস্ট ক্রিকেট শ্রীলঙ্কার পরে দ্বিতীয় সেরা ইকোনমিতে রান তুলেছে বাংলাদেশ! ৩.০৮! পুরো তালিকা দেখে দেওয়া যাক তাহলে।

টেস্টে সকল দলের ব্যাটিং ইকোনমি

১. শ্রীলংকা – ৩.১০

২. বাংলাদেশ – ৩.০৮

৩. ওয়েস্ট ইন্ডিজ – ২.৯৯

৪. অস্ট্রেলিয়া – ২.৯৪

৫. ভারত – ২.৯১

৬. পাকিস্তান – ২.৯০

৭. দক্ষিণ আফ্রিকা – ২.৭৮

৮. ইংল্যান্ড ২.৭৩

৯. জিম্বাবুয়ে ২.৭০ এবং

১০. নিউজিল্যান্ড ২.৬৮

শুধুমাত্র ওভারপ্রতি ইকোনমিতেই বাংলাদেশ এগিয়ে নেই, বরং এগিয়ে আছে টেস্টে বেশি স্ট্রাইক রেটে রান করার দিক দিয়েও! টেস্টে সবচেয়ে বেশী ৪৮.৭৬ স্ট্রাইক রেটে রান করেছে শ্রীলংকা দলের ক্রিকেটারেরা। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ৩ নম্বরে। পুরো তালিকায় একটু নজর দেওয়া যাক।

টেস্টে প্রতিটি দলের ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট

১. শ্রীলংকা – ৪৮.৭৬

২. ভারত – ৪৮.২২

৩. বাংলাদেশ – ৪৭.৯৮

৪. ওয়েস্ট ইন্ডিজ – ৪৭.৭৯

৫. অস্ট্রেলিয়া – ৪৭.৭২

৬. পাকিস্তান – ৪৭.১২

৭. দক্ষিণ আফ্রিকা – ৪৭.০৯

৮. নিউজিল্যান্ড – ৪৩.৬৪

৯. ইংল্যান্ড – ৪৩.৪৪

১০. জিম্বাবুয়ে – ৪১.৫৭

সবচেয়ে বেশি ৯৯০ ইনিংস খেলে প্রায় ৫ লক্ষ রান করা ইংল্যান্ড দলের অবস্থান কোথায় দেখেছেন? ৪৩.৪৪ স্ট্রাইক রেটে ৯ নম্বরে। আপনাকে এটা বুঝতে হবে যে এটা টেস্ট ক্রিকেট। এটা মারমার কাটকাট এর টি-টোয়েন্টি নয় যে স্ট্রাইক রেটের উপর নজর রাখতে হবে।

কথায় কথা মনে পড়ে যায়। তাই আমাকে একটু ফ্লাশফ্যাকে ফিরে যেতে হবে। এই পরিসংখ্যান লিখতে গিয়ে হঠাৎ আমার একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। ২০০৭ সাল, ভারতের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস পরাজয় ঠেকানোর জন্য ২য় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমেছে বাংলাদেশ। ৪ ওভারের ভিতরে বাংলাদেশের ৩ উইকেট নাই! আউট হয়ে গেছেন জাভেদ ওমর, হাবিবুল বাশার ও শাহরিয়ার নাফিস। ঠিক ওই মুহুর্তে ব্যাট হাতে নামলেন আশরাফুল। ৩.৫ ওভারে ১০/৩ রান থেকে ১৩.০ ওভারে বাংলাদেশ ৯১/৪! আশরাফুল আউট হলেন ৪১ বলে ৬৭ করে! অর্থাৎ আশরাফুল যতক্ষণ ক্রিজে ছিলেন ততক্ষণে বাংলাদেশ তুলেছে ৯ ওভারে ৮১ রান! যেখানে আশরাফুলের ব্যাট হইতে এসেছে ৪১ বলে ৬৭ (১২টা চার ও ২টি ছক্কা)! ৬৭ রানের ৬০ রান ই বাউন্ডারি থেকে যেটার স্ট্রাইক রেট ১৬৩+!

খেলা শেষে রাহুল দ্রাবিড আশরাফুলকে ডেকে বললেন, ‘ওহে আশরাফুল, তুমি ৪১ বলে ৬৭ রান না করে যদি ৬৭ বলে ৪১ করতে তাহলে তোমার দল আরো একটাই বেশি সময় ধরে ব্যাটিং করতে পারত। এটাই তো টেস্ট ক্রিকেট।’

রাহুল দ্রাবিডের কথাটা কি যুক্তিসঙ্গত?

হ্যাঁ যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত। কারণ, ওই টেস্টে বাংলাদেশ ইনিংস ও ২৩৯ রানে ভারতের বিপক্ষে পরাজিত হয়।

যেহেতু কথা বলছি আক্রমনাত্বক ব্যাটিং নিয়ে। তাই আমাকে ঠিক ওইভাবেই কথা বলতে হবে পরিসংখ্যান নিয়ে। আশরাফুলের ওই ইনিংসে ৮৯.৫৫% রান ই এসেছিল বাউন্ডারি থেকে! শুধুমাত্র আশরাফুলের কথা বললে ভুল হবে। ওই ম্যাচের ঠিক ১০ বছর পরেও আমাদের ব্যাটসম্যানদের অভ্যাস পাল্টেনি। এখনো ইমরুল, সাব্বির, সৌম্যরা ওই খেলাটাই খেলে যাচ্ছেন, পরিবর্তন বলতে কিছুই দেখছিনা আমরা। রিতিমত একই স্ট্যাইলে খেলে চলেছেন তারা।

ওদের কথাই বা কি বলব! জানলে অবাক হবেন যে টেস্টে বাউন্ডারি হইতে সবচেয়ে বেশি রান সংগ্রহ করার শতকরা তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সবার উপরে! আর সবচেয়ে নিচেয় আছে প্রোটিয়ারা! টেস্টে বাংলাদেশ এই পর্যন্ত যত রান করেছে তার ৫৩.৭০% রান এসেছে বাউন্ডারি থেকে! বাকিদের অবস্থানটা তাহলে আরেকটু দেখে নিই।

বাউন্ডারি থেকে রান

১. বাংলাদেশ – ৫৩.৭০%

২. শ্রীলংকা – ৪৯.৭০%

৩. জিম্বাবুয়ে – ৪৯.৪৫%

৪. নিউজিল্যান্ড – ৪৫.৯৭%

৫. পাকিস্তান – ৪৪.৯১%

৬. ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪৪.৫৪%

৭. ভারত – ৪৩.৫০%

৮. অস্ট্রেলিয়া – ৪০.৯৩%

৯. ইংল্যান্ড – ৪০.৮৯% এবং

১০. দক্ষিণ আফ্রিকা – ৪০.৭৪%

এখন দেখি বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের ভিতরে বাউন্ডারি থেকে সবচেয়ে বেশি রান করেছেন কোন কোন ব্যাটসম্যান।

বাউন্ডারি থেকে রান

১. তামিম ইকবাল – ৫৫.৪৭%

২. হাবিবুল বাশার – ৫৩.৮০%

৩. মোহাম্মদ আশরাফুল ৫৩.৭৩%

৪. মুশফিকুর রহিম – ৫৩.১৬%

৫. সাকিব আল হাসান – ৫২.৬৯%

তালিকায় ইমরুল, সাব্বির সৌম্যদের নাম না দেখে হয়তো অনেকের মনে কৌতুহল জেগেছে। তাদের জন্যও রয়েছে সমবেদনা। এই ক্রিকেটারদের স্বল্প পরিসরের ক্যারিয়ারে ইমরুল ৫৭.৮৩%, সৌম্য ৫৭.১৪% ও সাব্বির ৫২.৯২% রান করেছেন বাউন্ডারি থেকে। তবে ৫০০+ রান করা ব্যাটসম্যানদের ভিতরে বাউন্ডারি থেকে সবচেয়ে বেশি রান কার জানেন? তিনি মাশরাফি বিন মর্তুজা! মাশরাফির করা ৭৯৭ রানের ভিতরে ৬৪.২৪% রান ই এসেছে চার-ছক্কা হইতে।

এটা হলো আমাদের ব্যাটসম্যানদের সম্পূর্ণ ক্যারিয়ারের হিসাব। এখন যদি আপনারা আমাকে বিগত ২-৩ বছরের তালিকা দিতে বলেন সেটাও আমি দিতে পারব। তাহলে এবার দেখে নেওয়া যাক শেষ ৩ বছরে বাউন্ডারি হইতে সবচেয়ে বেশি হারে রান তুলেছে কে।

শেষ তিন বছরে বাউন্ডারি হতে রান

১. সৌম্য সরকার – ৫৭.৫০%

২. ইমরুল কায়েস – ৫৩.৯২%

৩. সাব্বির রহমান – ৫২.৯৪%

৪. সাকিব আল হাসান – ৫২.১২%

৫. মুশফিকুর রহিম – ৪৭.১৭%

৬. মমিনুল হক – ৪৬.৮৮%

৭. তামিম ইকবাল – ৪৬.৩১%

৮. মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ – ৪৪.৯৪

এরা হচ্ছেন আমাদের নিয়মিত টেস্ট ব্যাটসম্যান যারা শেষ ৩ বছরে বাংলাদেশের হয়ে বেশিরভাগ সময়ে টেস্ট খেলেছেন।

তালিকার ৭ নম্বর পজিশনটা একটু দেখুন। তামিম ইকবাল খান। ২০১০ সালের তামিম ইকবালকে আমরা চিনি। সে বছরে তামিম ইকবাল তার টেস্ট ক্যারিয়ারের সেরা বছর কাটিয়েছিলেন ৭ ম্যাচে ৩ সেঞ্চুরীতে ৮৩৭ রান করে। যেখানে তার ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট ছিল ৮০.৭১ করে! আর ওই বছরে তামিমের উপরে শুধু একজনই ছিলেন যিনি ৯০.৮০ স্ট্রাইক রেটে রান করেছিলেন! বিরেন্দ্র শেবাগ। সময়ের সঙ্গে বদলেছে তামিম ইকবালও। ৮০+ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করা তামিম এই সময়ে ৪০-৫০ এর ভিতরে স্ট্রাইক রেটে রান করে টেস্টে।

এতক্ষণ আমাদের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে পরিসংখ্যান সাজিয়েছিলাম। এখন আসা ছোট্ট পরিসরে এসময়কার সেরা ব্যাটসম্যানদের বাউন্ডারি হইতে রান করার হার।

শেষ ৩ বছরে বাউন্ডারি থেকে রান

১. ডেভিড ওয়ার্নার – ৫৩.৪৮%

২. জো রুট – ৫০.৫৭%

৩. অ্যালিস্টেয়ার কুক – ৪৬.৯৭%

৪. স্টিভেন স্মিথ – ৪৬.৮৪%

৫. কেন উইলিয়ামসন – ৪৬.০৭%

৬. বিরাট কোহলি – ৪৪.৪৮%

যে কজনের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে এরা ছাড়া এখনকার সময়ে সেরা টেস্ট পারফরমার তেমন নাই বললেও চলে। যদি থেকেও থাকে তাহলে ওটা ভুল করে থাকলে নিজ দায়িত্বে তার পরিসংখ্যানটা একটু দেখে নিয়েন।

টেস্টে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের ভিতরে সবচেয়ে বেশী স্ট্রাইক রেটে রান করেছেন মোহাম্মদ রফিক ৬৪.৯৬ করে (১০০০+ রান করা ব্যাটসম্যানদের ভিতরে)। তারপর আছেন সাকিব ৬২.১০, হাবিবুল বাশার ৬০.২৭, শাহরিয়ার নাফিস ৫৫.৮৬, তামিম ৫৫.০৯। আর সবচেয়ে কম স্ট্রাইক রেটে রান করা ব্যাটসম্যানদের ভিতরে আছেন খালেদ মাসুদ সুজন ৩৪.০৬, রাজিন সালেহ ৩৫.৮৫, জাভেদ ওমর বেলিম ৩৮.১৪, আশরাফুল ৪৬.০৭, মুশফিক ৪৬.৪৯ স্ট্রাইক রেটে।

অনেক কথা হলো, অনেক পরিসংখ্যান ঘেটে তছনছ করা হলো। মুন্ডুপাত করা হলো টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের সকল পরিসংখ্যানের। তাই শেষে এসে আরেকটি হিসাব না দিলে হয়তো অনেকে মন খারাপ করবে। তাই ওটা কেনইবা বাদ রাখবো।

টেস্টে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের ভিতরে তাদের পরিসংখ্যান হিসেব করে দেখেছি যে কোন কোন ব্যাটসম্যান ইনিংসপ্রতি গড়ে সবচেয়ে বেশী সময়ে ক্রিজে ছিলেন। আমি তো ঘেঁটেঘুঁটে পরিসংখ্যান সংগ্রহ করেছি বলে ব্যাপারটা জানি। কিন্তু আপনার ধারনাটি কি? মনে মনে একটু ভাবুনতো কে সবচেয়ে বেশি সময়ে ২২ গজ পাহারা দিয়েছে?

থাক আর ভাবতে হবেনা। মানুষটি ওই তামিম ইকবাল। তামিম ইকবাল তার টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রতি ইনিংসে গড়ে ১১৮ মিনিট ক্রিজে ছিলেন! যা প্রায় ২ ঘন্টাই বলা চলে, অর্থাৎ ১ সেশন। বাকিদের ভিতরে একমাত্র মুশফিকুর রহিম ই ১০৬ মিনিট ক্রিজে ছিলেন। বাকিরা ১০০ এর নিচে।

তাহলে এবার দেখে নেওয়া যাক আমাদের ব্যাটসম্যানদের গড় ধৈর্যের তালিকা।

ইনিংসপ্রতি ক্রিজে থাকার সময়

১. তামিম ইকবাল – ১১৮ মিনিট

২. মুশফিকুর রহিম – ১০৬ মিনিট

৩. ইমরুল কায়েস – ৯৭ মিনিট

৪. মমিনুল হক – ৯৬.১৪ মিনিট

৫. মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ – ৯৬ মিনিট

৬. সাকিব আল হাসান – ৯৪ মিনিট

তালিকা যেখানে আছে সেখানে সৌম্য সাব্বির না থাকলে তো তালিকাটা লবন ছাড়া তরকারির মত হয়ে যায়, তাইনা? তাহলে তারা বাদ পড়বে কেন? হ্যাঁ সৌম্য ইনিংসপ্রতি গড়ে ৭৪ মিনিট ও সাব্বির ৭৩ মিনিট ক্রিজে ছিলেন। যেটা যদি আমরা ওভারপ্রতি হিসাব করি তাহলে দেখা যায় সৌম্য ১৮-১৯ ওভার পর্যন্ত টিকে ছিলেন ক্রিজে।

যাক অনেক কথা হয়েছে। আজ না হয় এই পর্যন্তই থাক। কেননা আমি ইচ্ছে করলে আরো নিচেয় নামতে পারি আমাদের ক্রিকেটারদের ক্রিকেটীয় আমলনামা নিয়ে। কচুকাটা করতে পারি। কিন্তু ঢের হয়েছে। তাই এখানেই সমাপ্তি টানব। এই লেখা লেখার একটাই উদ্দেশ্য যে টেস্ট ক্রিকেটে আমাদের দুর্বলতা ঠিক কোথায়? কেন আমরা বারবার একই ভুল করি, কেনইবা আমরা বুঝিনা এটা টেস্ট ক্রিকেট, কেনইবা আমরা বুঝিনা টেস্টে মারমার কাটকাট চলেনা। পরিসংখ্যান গুলো আমি পর্যায়ক্রমে ঠিকই সাজিয়েছি, তবে এটা সাজানোর মূল লক্ষ্যই হল আমাদের দুর্বলতা কোথায় কোথায় বিদ্যমান আছে। কোন কোন জায়গায় আমাদের আরো কাজ করতে হবে এবং ধৈর্য্যশিল হইতে হবে। আপনি ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াকে দেখুন, বুঝতে পারবেন কোনটা আসল টেস্ট ক্রিকেট।

পরিশেষে আবার একটা ছোট্ট গল্প মনে পড়ে গেল। এটাও ঠিক আমাদের টেস্ট ক্রিকেটের ছোট্ট একটা গল্প, যে গল্পটাতে আপনি বুঝতে পারবেন ‘টেস্ট ক্রিকেট কাকে বলে’।

সময়টা ২৪ নভেম্বর ২০১২, খুলনা টেস্টর চতুর্থ দিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৬৪৮/৯ রানে ইনিংস ঘোষনা দিল বাংলাদেশের বিপক্ষে। তামিম ইকবাল ও নাজিমউদ্দিন যখন বাংলাদেশের চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট হাতে নেমেছে ঠিক ওই সময়ে মুম্বাই টেস্টে প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ড ৬৮/২ রান নিয়ে ব্যাটিং করছে অ্যালিস্টেয়ার কুক ও কেভিন পিটারসেন। মুম্বাইয়ে পিটারসেন মাত্রই ক্রিজে এসেছেন, অপরদিকে খুলনায় ক্রিজে নেমেছেন তামিম ও নাজিমউদ্দিন। কিন্তু দিনশেষে দেখা গেল বাংলাদেশের সংগ্রহ ২২৬/৬ আর অপরদিকে ইংল্যান্ডের সংগ্রহ ১৭৮/২!

কি বুঝলেন?

তাদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্যটা ঠিক এখানে। একই সময়ে ইংল্যান্ডের সংগ্রহ যেখানে মাত্র ১১০/০ রান, সেখানে বাংলাদেশের সংগ্রহ ২২৬/৬! কাকতালীয় হলেও সত্যিটা এই যে উক্ত টেস্টে বাংলাদেশ ১০ উইকেটে পরাজিত হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আর অপরদিকে ইংল্যান্ড ১০ উইকেটে ভারতকে পরাজিত করে। আমাদের টেস্ট ক্রিকেটের দুর্বলতা ঠিক এখানেই। তাদের সঙ্গে এখানেই আমরা পিছিয়ে আছি! এখানেই আমাদের উন্নতি দরকার।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।