কখনো টাকার পেছনে ছুটিনি: নেইমার

ট্রান্সফার ফি’তে তিনি রীতিমত রেকর্ড গড়েছেন। নেইমারকে নিতে প্যারিস সেন্ট জার্মেইকে শুধু ‘বাই আউট ক্লজ’ই দিতে হয়েছে ২০ কোটি পাউন্ড! প্রতি সপ্তাহে সাত লাখ ৮২ হাজার পাউন্ড বেতন হিসেবে নিলে পাঁচ বছরের পিএসজির ব্যয় গিয়ে দাঁড়াবে ৪০ কোটি পাউন্ডে! অনেকেই তাই মনে করছেন, স্রেফ টাকার জন্যই নেইমার এসেছেন ফরাসী ক্লাবটিতে। তবে, পিএসজির হয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই উড়িয়ে দিলেন সেই মন্তব্য। জানালেন, ক্লাবটির হয়ে তার আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নের কথা।

কেমন লাগছে?

নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পেরে ভালো লাগছে। অসাধারণ শহর প্যারিস। পিএসজি-তে আসতে পেরে আমি সত্যিই খুশি। আমার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। নতুন সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলন, নতুন জার্সিতে মাঠে নেমে লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য মুখিয়ে আছি।

আমার এখানে আসার পিছনে যেমন উচ্চাশা আছে, তেমনি পিএসজিরও উচ্চাশা আছে আমাকে নিয়ে। আমি আরো বড় কিছু অর্জন করতে চাই। এ কারণেই এখানে আসা। দলকে শিরোপা জেতানোর জন্য আমি সবকিছু উজাড় করে দিব। শুধু নতুন চ্যালেঞ্জ নিতেই আমি প্যারিস এসেছি। এ কারণে নয় যে, আমি বার্সেলোনায় তারকা ছিলাম না। আপনারা জানেন, সেখানে কতটা ভালো ছিলাম। পিএসজি শিরোপা উচিয়ে ধরার যোগ্য এবং আমি শিরোপা জিততে চাই। একমাত্র এই প্রেরণাই আমার মধ্যে কাজ করেছে। আমি বড় স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করি।

পিএসজি-তে আসার জন্য এখানকার কার সঙ্গে কথা বলেছিলেন?

পিএসজি-তে আসা জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তগুলোর একটি। আমি বার্সেলোনার মতো একটি ক্লাবে ছিলাম, আমার সেখানে অনেক বন্ধু ছিল। তাই বার্সা ছেড়ে আসা সহজ ছিল না। অনেক দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। জীবন সম্পর্কে বারবার ভেবেছি। অনেক বন্ধুকে ফেলে চলে এসেছি। কিন্তু এটাই ফুটবল। বহতা নদীর মতে, সবকিছু দ্রুত বয়ে যায়।

বার্সার সকল বন্ধুদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে খুব উষ্ণভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু বার্সা ছেড়ে আসার জন্য এটাই সঠিক সময় বলে আমি মনে করেছি। এখানকার ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি এখানে আসছি শুনে তারা খুশি হয়েছে।

সতীর্থ ব্রাজিলিয়ানরা এখানে না থাকলে আপনি কি পিএসজিতে আদৌ আসতেন?

সত্যি কথা বলতে, এটা আমার মনোভাব পরিবর্তন করতে পারত না। নিঃসন্দেহে এখানে আমার অনেক বন্ধু আছে। কিন্তু এখানকার বৈশ্বিক পরিবেশ আমাকে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

অনেক লোক এই বিষয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন। কিন্তু নিজে শতভাগ নিশ্চিত হবার আগ পর্যন্ত অন্যের সঙ্গে কথা বলা আসলে কঠিন। আমি যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, তখন লোকজনের সঙ্গে কথা বলা শুরু করি। আমি প্রতিদিন আমার হূদয়ে কান পেতেছি । আমার মন বলেছে: ‘পিএসজি-তে যাও’।

আপনি কি পুরো সপ্তাহ অনুশীলন করেছেন? আগামীকালই খেলতে পারবেন?

আমি ফুটবল খেলার জন্য ক্ষুধার্ত। আমি খেলার জন্য মুখিয়ে আছি। হ্যাঁ, আমি আগামীকাল (আজ) আমিয়েন্স এর বিরুদ্ধে খেলার জন্য প্রস্তুত।

বার্সেলোনার ভক্তদের আমি সব সময় শ্রদ্ধা করি। সেখানে চার বছর সুখ ভিন্ন অন্য কিছু পাইনি। আমি বিষাদগ্রস্ত নই, বরং উল্টোটাই সত্য। আমি খুশি। শিরোপা উচিয়ে ধরেই সেখানে আমার ফুটবল কাব্যের অধ্যায়গুলো লিখেছি। দলের জন্য কিছু করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু আপনি সবাইকে খুশি করতে পারবেন না। বার্সা ভক্তদের তাদের বন্ধুত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই।

যারা ভাবেন কেবল অর্থের জন্যই আপনি এখানে এসেছেন, তাদেরকে কী বলবেন?

সত্যি কথা বলতে তারা আমার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আমি  কখনো টাকার পিছনে দৌড়াইনি।

জীবনের চলার পথে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছি সুখকে। আমি আমার পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুখী হতে চেয়েছি। আমি যদি টাকার পিছনে ছুটতাম, তাহলে এখানে আসতাম না। অন্য দেশের অন্য ক্লাবও আমাকে এর চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে নিতে চায়। লোকজনের এমন ভাবনা আমাকে কষ্ট দেয়। তারপরও খুশি, কারণ পিএসজি আমার উপর বিশ্বাস রেখেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় হবার অনুভূতি কী? এটা কি বাড়তি হিসেবে কাজ করবে?

এটা কোনো বোঝা নয়। আমার ওজন ৬৯ কেজি। পিঠে কোনো বোঝা নেই!

পিএসজির বিপক্ষে খেলার সময় আপনি কী ভেবেছিলেন?

পিএসজির বিপক্ষে যখনই খেলেছি, প্রায় সব সময় গোল পেয়েছি। আমার সুবিধা হচ্ছে, এখানে অনেক বড় খেলোয়াড় রয়েছেন। আমি তাদের সঙ্গে খেলে ক্লাবকে এগিয়ে নিতে চেষ্টা করব। সবাই চায় বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলতে। এখানে কিছু সেরা খেলোয়াড় রয়েছেন।

আমি এখনও জানি না কোন পজিশনে খেলব। কারণ এ নিয়ে কোচের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। তিনি যেখানে আমাকে খেলাবেন, সেখানেই খেলব।

বার্সেলোনার লোকজন আপনাকে নিয়ে অসন্তুষ্ট। তারা আপনাকে ফিগোর সঙ্গে তুলনা করেছেন…

আমি খারাপ কিছু করিনি। কষ্ট পাচ্ছি, কারণ ভক্তরা আমার সম্পর্কে এমনটি ভাবছেন। আমার বিশ্বাস তাদের সংখ্যা অল্প। আমি কখনও ভক্তদের অসম্মান করিনি। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের ক্লাবে থাকার কিংবা চলে যাবার অধিকার রয়েছে। আপনি একই ক্লাবে থাকতে বাধ্য নন। আপনি যদি চলে যেতে চান, সেই অধিকার আপনার রয়েছে। পুনরায় বার্সার ভক্ত, ক্লাব এবং সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

বার্সা ছেড়ে আসার জন্য প্রথমে কোচে আর্নেস্তো ভালভারদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাকেই প্রথমে সিদ্ধান্তটা জানিয়েছিলাম। আমি ক্লাব এবং তাকে খুব সম্মান করি।

জেরার্ড পিকের সঙ্গে আমার ছবিটা নিয়ে বেশ হৈচৈ হয়েছে। তিনি এবং আমি দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম, তখন তিনি ছবিটি পোস্ট করে দেন। আমরা আনন্দ করছিলাম। তাকে বলেছিলাম, আমি থাকছি, এটা না লিখতে। কারণ তখনও আমি আমার সিদ্ধান্ত নেইনি। আমি খুব চিন্তিত ছিলাম। তিনি কৌতুক করতে চেয়েছিলেন। পিকে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের একজন। তার জন্য শুভ কামনা।

পিএসজিতে আপনি কী চান? কী পেলে খুশি হবেন?

আমি পিএসজি-কে নিয়ে নতুন ইতিহাস লিখতে চাই। এটাই এখানে আসার একমাত্র কারণ। নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়। কিন্তু আমি অন্য ট্রফিগুলোও চাই।

মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এখানে এসেছেন?

না, বরং এর উল্টোটাই সত্য। আমার বার্সেলোনায় আসার অন্যতম কারণ ছিলেন তিনি। তার সঙ্গে সব সময় খেলতে চেয়েছি। তিনি ছিলেন আমার আদর্শ।

সেখানে কোনো চাপ ছিল না। শুধু প্রথম সপ্তাহে আমার আদর্শ খেলোয়াড়দের সঙ্গে অনুশীলন করার সময় কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলাম। প্রথম সপ্তাহ পর আমি স্বস্তিতেই ছিলাম। সেরাদের সঙ্গে খেলা খুবই সহজ। কারণ তারা সবাই মিলে শিরোপা জিততে চান।

আমি মেসির প্রতি কৃতজ্ঞ কারণ তিনি আমাকে খুব উষ্ণভাবে বার্সায় স্বাগত জানিয়েছেন। তার কাছ থেকে যা শিখেছি, তার প্রতিদান আমি দিতে পারব না। কিন্তু এখন আমি পিএসজি-তে। এখানকার সতীর্থদের সঙ্গে খেলে শিরোপা জিততে চাই।

প্যারিস কি নেইমারের শহর হবে? আইফেল টাওয়ারের মতো আইকনিক হয়ে উঠতে পারবেন?

সবার প্রথমে আমাকে সতীর্থদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলতে হবে। শহরটাকে ভালোভাবে জানতে হবে।

নেইমারকে ছাড়াই প্যারিস অনন্য। বিস্ময়কর সৌন্দর্য ছড়াতে তার কোনো নেইমারকে দরকার নেই। অনিন্দ্য সুন্দর দেশটির একটি বড় ক্লাবে খেলার সুযোগ পেয়ে একজন ব্রাজিলিয়ান হিসেবে আমি গর্বিত।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।