একজন বাংলাদেশি শেক্সপিয়ার

হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা সাহিত্যকে যিনি পুনর্জন্ম দিয়েছেন, নতুন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করেছেন, নিয়তির পরিহাসে সুদীর্ঘ একবছর সংগ্রামের পর ক্যান্সারের কাছে হার মেনে তাকে চলে যেতে হয়েছে মাত্র চৌষট্টি বছর বয়সেই। কথার জাদুকর হয়তো এখন অন্যভুবনে, কিন্তু তার সৃষ্টিকর্মগুলোর দিকে তাকালে এখনো চোখের কোণ আর্দ্র হয়ে আসে।

হুমায়ূন আহমেদ শুধু বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ত্রাণকর্তাই ছিলেন না, তার একক অবদানে বাংলার সাহিত্যপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু কলকাতা থেকে ঢাকায় সরে বাধ্য হয়েছিলো। ঢাল-তলোয়ার নয়, শুধুমাত্র তার লেখনীর দ্বারাই তিনি এ অসাধ্য সাধন করতে পেরেছিলেন।

হুমায়ূন আহমেদের দীর্ঘ ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত সাহিত্যজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে তাঁর লেখনীর প্রভাব। তাঁর লেখা এতো প্রভাবশালী ছিলো যে মানুষ কেবল তাঁর বই থেকে শুধু মানসিক পরিতৃপ্তিই পেতো না, বরং হিমু, মিসির আলী এবং বাকের ভাইয়ের মত কাল্পনিক চরিত্রগুলোর মধ্যে নিজেদেরকে খুঁজে পেয়েছিলো। তিনি নিজের লেখনীর মাধ্যমে ফলে গন্ধ, শব্দ, এবং অনুভূতির যে স্ফুরণ ঘটিয়েছিলেন, সেটাকে পারমানবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী বললে অত্যুক্তি হবে না।

তবে হুমায়ূন যে গণমানুষের মানসপটে পৌঁছাতে পেরেছিলেন, কেউ কেউ তা তার মৃত্যুর পরেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়া এ ঔপন্যাসিকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, সুপার বাউলের মত নামীদামী ইভেন্টকেও হার মানিয়েছিল। সেদিন গোটা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ কেবল একটি ধ্বনিতেই প্রকম্পিত হয়েছিলো। আবার দেখা হবে হে বন্ধু, আবার দেখা হবে।

একজন পথিকৃৎয়ের প্রস্থান কিভাবে একটি জাতির আবেগ-অনূভুতিগুলোকে একীভূত করে দিয়ে যেতে পারে, তার জ্বলজ্বলে দৃষ্টান্ত হুময়ূন আহমেদ। বাংলাদেশ হয়তো অনেক দেশ থেকে পিছিয়ে আছে, কিন্তু এদেশের মানুষের চিন্তাধারা আরো অনেকের থেকে এগিয়ে। কারণ হুমায়ূন আহমেদের মতো একজন মানুষের জন্ম এদেশে, যিনি গোটা জাতিকে এক কাতারে আনতে পেরেছিলেন। তাহলে বিশ্ব সাহিত্যে হুমায়ুনের অবদান সম্পর্কে আমাদের মূল্যায়ন কি?

তিনি ছিলেন মধ্যবিত্ত বাঙালী জীবনচিত্রের নিখুঁত চিত্রশিল্পী, জীবনদর্শনের দার্শনিক। তার সাহিত্যজীবনের বর্ণিল পথচলা শুরূ হয়েছিলো ১৯৭১ সালে ‘নন্দিত নরকে’ দিয়ে, যা তার সর্বাধিক বিখ্যাত রচনাগুলোর মধ্যে একটি। বিপুল পাঠকপ্রিয়তা অর্জন ছাড়াও ‘নন্দিত নরকে’ ড. আহমদ শরীফের মতো জাঁদরেল সমালোচকদেরকে মুগ্ধ করতে সক্ষম হয়। তার লেখা দুশতাধিক বইয়ের অধিকাংশই বেস্টসেলারের মর্যাদা লাভ করেছে।

এছাড়াও, তিনি শিল্পকলায়, বিশেষ করে চলচ্চিত্রে প্রচুর অবদান রেখেছেন।

এদেশের নাট্যঙ্গনে যে গুটিকয়েক নাট্যকার ঈর্ষনীয় প্রভাব বিস্তার করে এসেছেন, তাদের মধ্যে হুমায়ূনের নামটি শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়। তার ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের কাল্পনিক চরিত্র বাকের ভাই মানুষের মনে এমনভাবে আসন গেড়ে বসে যে বাকের ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ড রহিত করার জন্য সেসময় রাস্তায় রাস্তায় মিছিল হয়েছিলো। এমনকি অনেকেই হুমায়ূনের সাথে যোগাযোগ করে তাকে নাটকটির স্ক্রিপ্ট পরিবর্তন করতে অনুরোধ করেছিলেন।

তাঁর চলচ্চিত্রসমূহে অনেকগুলো থিম ও শৈল্পিকতা দেখতে পাওয়া যায়, যেটি একপ্রকারের প্রত্যাশিত। যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মধ্যবিত্তের সংকট, এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক নানা অসংগতি। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে নির্মিত তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র, আগুনের পরশমনি, সেরা ছবি এবং সেরা পরিচালকসহ চারটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।

তার অন্যতম সেরা ছবি ‘শ্যামল ছায়া’, শ্রেষ্ঠ বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার মনোনয়ন অর্জন করে। চলচ্চিত্রকার হিসেবে সত্যজিৎ রায়, জহির রায়হান, বা তারেক মাসুদের সাথে হুমায়ূনের তুলনা করতে যাওয়াটা একটু কঠিনই হবে। কিন্তু নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনি তার সময়ের অন্যতম প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকার ছিলেন।

তার কট্টর সমালোচকদেরাও একবাক্যে স্বীকার করেছেন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ ঘটলেও তাকে পূনর্জীবন দিয়েছেন হুমায়ূন। অতএব, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পরে যদি কাউকে স্থান দিতে হয় তবে সেটা হুমায়ূন আহমেদেরই প্রাপ্য। যদিও এই নিরহংকারী মানুষটি কখনোই নিজেকে মহান লেখক হিসেবে দাবি করেননি।

কয়েক বছর আগে, মুহাম্মদ ইউনূসকে হুমায়ূন আহমেদের সামগ্রিক প্রভাব সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে বলা হলে, সে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হুমায়ূনের রচনাগুলো ঠাকুর ও নজরুলের সময় থেকেও সাহিত্যে বেশি গভীর এবং অধিক ফলপ্রসূ।’ খ্যাতিমান কবি আল মাহমুদ বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের প্রস্থানের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের যে স্বর্ণযুগের ইতি ঘটেছিল, হুমায়ূন আহমেদ তাকে পুনর্জীবন দান করেছেন।’

ফিকশন লেখক ইমদাদুল হক মিলন তাকে তার বাঙালি সাহিত্যের সর্বশক্তিমান স্রস্টা বলে আখ্যায়িত করেছেন, যার নিজের সমস্ত কর্ম ও চিন্তাভাবনার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিলো।

ইমদাদুল হক একথাটি যে মোটেও ভূল বলেননি, হিমু ও মিসির আলী চরিত্র দুটির দিকে তাকালে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মিসির আলী মূলত একটি যুক্তিবাদী মনস্তাত্ত্বিক যিনি যুক্তিবিজ্ঞানের মাধ্যমে নিজের চারপাশে রহস্য উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি মনে করেন, কোনো কিছুই কাকতালীয় নয়। অন্যদিকে, হিমু অ্যান্টি-লজিক দিয়ে কাজ করে। হিমু চরিত্রটির হুমায়ূন আহমেদ আমাদের মনের ভালো ও মন্দ অংশ দুটোর মধ্যকার চিরন্তন লড়াই ফুটিয়ে তুলেছেন।

যদিও হুমায়ূনভক্তদের একটাই আফসোস, তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে খুব বেশী পরিচিতি পাননি, যতটা আশা করা হয়েছিলো। তবে বাংলা সাহিত্যকে যে খাদের কিনারা থেকে টেনে আনতে তিনি পেরেছিলেন, তার জন্য তাকে কৃতিত্ব দিতেই হয়। নোবেল পুরস্কার তিনি পাননি, কিন্তু অগণিত পাঠক-ভক্তদের থেকে যে অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছেন, দাড়িপাল্লায় সেটার ওজন নোবেল থেকেও অনেক অনেক বেশী। অার স্বীকৃতিই যে সাহিত্যে সবকিছু নয়, সে কথা তো আর বলে দেয়া লাগে না!

নানা জরা-ব্যাধিগ্রস্থ এদেশের বই-বিমুখ সমাজকে যিনি বই ধরতে শিখিয়েছেন, বাংলার সেই শেক্সপিয়ার হয়তো আজ ওপর থেকে শোকাতুর এই বাংলার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন আর বলছেন, ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়।’

——-

Tears for Humayun Ahmed: The Shakespeare of Bangladesh – শিরোনামে লেখাটি প্রকাশিত হয় টাইমস অব ইন্ডিয়ায়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।