সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ জেলের অজানা নৃশংসতা

কেবলমাত্র বাংলাদেশের মতো গুটিকয়েক দেশে অপরাধীদের শাস্তি বিধানের পাশাপাশি ‘মানবাধিকার’ রক্ষা করা হয়, অন্যথায় পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই অপরাধী বিশেষ করে গুরুতর অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনের প্রয়োগ দেখা যায়।

এমন অনেক দেশ আছে যেখানে অপরাধীদের ‘নরকযন্ত্রণা’ ভোগ করতে হয় এবং কারাবাসের প্রথম দিন থেকেই তাদের এই নির্মমতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। তাদের কারাবাস অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মতো স্বস্তিদায়ক তো নয়-ই, বরং রীতিমতো ‘দুঃস্বপ্নের’। বিশ্বের এমনই ভয়ংকর দশটি কারাগারের বর্ণনা পড়ুন বাকি লেখায়:

লা সাবনাটা কারাগার, ভেনেজুয়েলা

দক্ষিণ আমেরিকার এই কারাগারে যে নৃশংসতা ঘটে, তার বিস্তারিত বিবরণ আপনার শিরদাঁড়ায় কাঁপন ধরিয়ে দেবে। দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে নিষ্ঠুর কারাগার হিসাবে বিবেচিত এই জেল বন্দীদের নির্যাতন করে বেশ খ্যাতি কুড়িয়েছে।

যখন কারাগারে কোনও সমস্যা হয়, তখন তাদের কোনও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয় না। শুধু তাই নয়, খাদ্যসংকট সবসময় এই কারাগারে লেগেই থাকে। পাগলামি এই জেলে এতটাই নিয়মিত যে একবার কলেরার প্রকোপে ৭০০ কয়েদী মারা পড়েছিলো। ১৯৯৪ সালে, ১০০ কয়েদীকে হত্যা করা হয় এখানে। সহিংসতা এই কারাগারের নিত্য ঘটনা এবং একে অপরকে আক্রমণ করার অস্ত্র হিসাবে বন্দিদের কাছাকাছি থাকা যেকোনো বস্তুর ব্যবহার করতে কারা কর্তৃপক্ষই নির্দেশ দিয়েছে।

আল হেইর কারাগার, সৌদি আরব

এটি মধ্য প্রাচ্যের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কারাগার। অপরাধীদের নির্যাতনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর উপায়গুলো এই কারা কর্তৃপক্ষের বেশ ভালোই রপ্ত রয়েছে। এই নির্যাতনের প্রতিবাদ করলে কারানিবাসীদের মৃত্যু অবধারিত। ২০০২ সালে, এক কয়েদী জেলে আগুন লাগিয়ে দিলে ১৪০ বন্দীর সাথে ৪০ জন কারারক্ষীও মারা পড়ে।

গিটারমা কারাগার, রুয়ান্ডা

বন্দীদের জন্য এই কারাগারে যে জায়গা রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়, এর চেয়ে বড় অত্যাচার আর কি হতে পারে! মূলত, ৪০০ কয়েদীদের জন্য নকশা করা এই কারাগারে ৬০০০-য়েরও বেশি কয়েদী রয়েছে। এছাড়াও মনুষ্যবর্জ্য দিয়ে অধিকৃত জায়গাটি ভরাট করা হয়, যা পচে গিয়ে বন্দীদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়।

খবর পাওয়া যায়, খাদ্য সরবরাহ এখানে এতই স্বল্প যে বন্দীরা হতাশা আর ক্ষুধায় একে অপরের মাংস ছিঁড়ে খায়। এখানে স্থান পাওয়া বেশিরভাগ বন্দী-ই গণহত্যা সম্পর্কিত অপরাধে জড়িত ছিলো।

দিয়ারবাকির কারাগার, তুরস্ক

লিস্টোভেটিভের খবর অনুযায়ী, এই কারাগারে মানবাধিকারের সর্বোচ্চ লঙ্ঘন হয়। এই কারাগারের বন্দীদের উপর অনেক শারীরিক, মানসিক নির্যাতন এবং যৌন নির্যাতন বহুদিন ধরেই ঘটে চলেছে। কিন্তু এ কিছুই নয়, এই কারাগারের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো এখানে শিশুরাও আজীবনের জন্য অবরুদ্ধ হয়, বিন্দুমাত্র অনুগ্রহ ছাড়া।

লা সান্তা প্রিসন, ফ্রান্স

ফ্রান্সের এই কারাগারটিকে ভয়ঙ্কর এবং মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার স্থান বলে বহুজায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে এবং কারা কর্তৃপক্ষের এমন কাজ বন্দিদের আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে বলেও উল্লেখ রয়েছে।

বন্দিদের আত্মহত্যা করার উপায়গুলিও আপনাকে ভয় পাইয়ে দেবে। বন্দিরা তাদের জীবন শেষ করার জন্য ইঁদুর মারার বিষ খেয়েছে, কখনোবা কাঁটাচামচ দিয়ে আত্মহনন করেছে, এমনকি অনেকে ড্রেনেও ঝাপ দিয়েছে বলে জানা যায়। প্রতি বছরই এখানে ১০০ জনেরও বেশি বন্দী আত্মহত্যা করে বলে খবর রয়েছে।

বং কয়াং কারাগার, থাইল্যান্ড

শোনা যায়, এখানকার মানসিক চাপ এক মাসের মধ্যে কোনো ব্যক্তিকে পাগল করার জন্য যথেষ্ট। প্রথম তিন মাসে শাস্তির মাধ্যম হিসেবে বন্দিদের পায়ে লোহা বেধে দেয়া হয়, আর যদি পরবর্তীকালে তাদের মৃত্যুদণ্ড না হয় তবে এই লোহাকে তাদের পায়ে স্থারী রূপ দেয়া হয়।

এটিকে থাইল্যান্ডের সবচেয়ে নৃশংস কারাগার বলে মনে করা হয়। অনেক বিদেশী এবং মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কয়েদখানা এটি।

তাদমোর সামরিক কারাগার, সিরিয়া

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই কারাগারটি বিশ্বের ‘সবচেয়ে নিপীড়ক কারাগার’ হিসাবে ঘোষণা করেছে। সংগঠনটি আরও বলেছে যে, কারাগারটির প্রতিটি কাজ-ই করা হয়, বন্দীদের নির্যাতনের উদ্দেশ্যে। বৃহৎ পরিসরে যে নির্যাতন বাস্তবায়ন করা হয়।

বন্দিদের প্রতি উদ্দাম আচরণের জন্য এই কারাগারের রক্ষীরা বিখ্যাত। কয়েদীদের কুড়াল দিয়ে কেটে ফেলার, কয়েদীদের শরীরে দড়ি বেধে মেরে ফেলার, এমনকি বন্দীদের ধাতব পাইপ দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলার ‘লাইসেন্স’ও কারা কর্তৃপক্ষ কারারক্ষীদের দিয়ে রেখেছে।

টেক্সাস রাজ্য কারাগার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

এই কারাগারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সংখ্যক বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। যার মানে দাঁড়ায়, এই কারাগারে স্থান পাওয়া যেকোনো ব্যক্তি-ই তার পাপপূর্ণ জীবন থেকে মুক্তি পাবার সেরা সুযোগ পাবে।

ক্যাম্প ২২, উত্তর কোরিয়া

রাজনৈতিক বন্দীদের নির্বাসনে পাঠানোর জন্য এই কারাগারটি ১৯৬৫ সাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সুবিশাল আয়তনের এই কারাগার প্রায় ৫০ হাজার বন্দির স্থান সংকুলানে সক্ষম।

এই কারাগারের শাস্তির উপায়টি সত্যিই অদ্ভুত। কেননা এখানে অপরাধীর পুরো পরিবারকেই তিন প্রজন্মের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়, যাতে অপরাধীর পুরো পরিবারটিই একেবারে সমূলে ‘উৎপাটিত’ হয়।

এই কারাগারের নির্যাতনের আরেকটি মাধ্যম হল, বিভিন্ন অ্যানথ্রাক্স, বোমা পরীক্ষা এবং অন্যান্য নৃশংস জৈবিক অস্ত্রের ক্ষমতা পরীক্ষার জন্য এই কারাগারের কয়েদীদের ‘গিনিপিগ’ বানানো।

কারানদুরু জেল, ব্রাজিল

এটি ১৯৯১ সালের ট্র্যাজেডির জন্য বিখ্যাত (পড়ুন কুখ্যাত), যা ‘কারানদুরু গণহত্যা’ নামে ব্যাপক পরিচিত।

কয়েদীদের উপর এই ‘গণহত্যা’ কার্যকর করা হয় এই কারাগারের কারারক্ষীদের দ্বারা। এক স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক, ড্রাজিও ভ্যারেলা তাঁর বই ‘কারানদুরু স্টেশন’-এ সেখানে অবস্থানকালে মুখোমুখি হওয়া তার নিজের অভিজ্ঞতার এবং সেখানকার ভয়ঙ্কর অবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন। ৪৬ বছরে এই কারাগারে ১৩০০ বন্দী মারা গিয়েছে। এই নির্মমতার সমাপ্তি ঘটাতে ২০০২ সালে এই কারাগার বন্ধ হয়ে যায়। নিশ্চিতভাবেই এটি বিশ্বের সবচেয়ে ‘জঘন্য কারাগার’ ছিলো। এই নির্মমতার কারণ জানতে চেয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ব্রাজিল সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলো এবং ব্রাজিল সরকার উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছিলো।

– আরভিসিজে.কম অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।