জীবনে মোটিভেশনাল স্পিচ কী জরুরী?

জীবনে ‘মোটিভেশনাল স্পিচ’ এর দরকার আছে, খুব দরকার আছে। এটা আমি বিশ্বাস করি। তবে সারাদিন ‘আমি, আমি, আমি আর অত ডিজিট কিংবা এত কম সিজি নিয়ে অমুক পরীক্ষায় প্রথম হইছি এরকম একই গান সারাদিন বাজাইলে সেটা মোটিভেশনাল স্পিচ হতে হতে একসময় ‘ট্রল’ এ পরিণত হবে এটা আমার কাছে স্বাভাবিকই মনে হয়।

তবে এটাও সত্য ওই ‘অত ডিজিট’ কিংবা ‘প্রথম’ না হলে আমরা উনাদের ‘মোটিভেশনাল স্পিচ’ গিলতাম না। হিপোক্রেট সেজে লাভ নাই এক্ষেত্রে। আপনি ট্রল করেন আর যাই করেন, ঠিকই চিপায়-চাপায় পোস্ট পড়েন। ট্রল করার জন্যও পড়েন।

এই মোটিভেশন টা শুধু এক গান না শুনলেও আপনার জীবনে এর দরকার আছে। আমি একবার ৬০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে একজনের ‘মোটিভেশনাল স্পিচ’ শুনতে গেলাম। যেয়ে দেখি বসার জায়গা নাই। দাঁড়িয়েই ঘণ্টা কয়েক সেই ‘স্পিচ’ শুনলাম। শুনে মনে হলো ‘লাইফে কিছু করা দরকার’।

হোস্টেলে ফিরলাম। এফবিতে পোস্ট দিলাম যে লাইফে বহুত কিছু করতে হবে, ব্লা ব্লা লিখে। রাতের খাবার খেতে গিয়ে দেখি চাল শেষ। টাকাও নাই আর। তখন আমার ওই ‘৬০ টাকার’ জন্য খুব কষ্ট হতে লাগল। এক কেজি চাল কিনলে বেশ ক’দিন চলে যেত। মোটিভেশনাল স্পিচ আর ভালো লাগল না। এক প্লেট সাদা ভাত এর থেকে বহুগুণ ভালো।

তবু কেন এর দরকার আছে বলি। একবার একটা ফ্যামিলিগত সমস্যার কারণে পড়াশুনার অবস্থা মোটামুটি খারাপের দিকে যেতে লাগল। সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। আগে ১০০ তে ৯৯ পেলে তখন ৮০ পাচ্ছি। হয়ত এ মানটা আরো কমে যেয়ে ‘০’ হতে পারত। একজন স্যার বাসায় আসলেন। মাথায় হাত রেখে শুধু বললেন ‘আমি জানি, তুই পারবি’। আমার কি হলো আমি জানিনা। এই একটা লাইন শুনে ফাইনালে একটা ভালো রেজাল্ট হয়ে গেল।

এডমিশন টেস্টে সবাই একে একে চান্স পেয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যাচ্ছে। আমি তখন সারা বাংলাদেশ ঘুরছি পরীক্ষা দেয়ার জন্য। কোথাও চান্স পাচ্ছিনা। চান্স না পাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল আমার জন্য। ফ্যামিলির চাপে ‘কী নিয়ে পড়তে হবে, লাইফে কী হব’ এটা যদি চেইঞ্জ করে ফেলতে হয় আর সেই চেইঞ্জ করা ডিসিশনের সাথে যদি আপনি না মানিয়ে নিতে পারেন তবে আপনার কোথাও চান্সটা হবে কেমনে! নিজের সাথে যুদ্ধ করছি, এদিকে ফ্যামিলির সিদ্ধান্ত মানতে পারছি না। আমার মানসিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল।

ফ্রেন্ডরা কেউ অফিসিয়ালি ঘোষণা দিয়ে আমার সাথে সম্পর্ক বাদ দিচ্ছে, তো কেউ আনঅফিসিয়ালি। পাড়ার আন্টিদের ঈদ চলছে। এতদিন যারা আমার থেকে শুনত তাদের ছেলেমেয়েদের কিভাবে পড়াবেন, কই পড়াবেন, তারা তখন ডেকে ডেকে বলতেন, ‘কোথাও গতি হলো তোমার?’ কেউ কেউ ফোন করে খোঁজ নিচ্ছেন ন্যাশনালে চান্স পেয়েছি কি না।

একটা ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা শেষে যথারীতি মুখ কালো করে ফিরছি। একজন বড় ভাইয়ার সাথে দেখা। ভাইয়া শুধু বললেন, ‘বড় ভার্সিটিতে ঝাড়ু দেয়া সাবজেক্টে পড়তে পারো, অথবা ঝাড়ু দেয়া ভার্সিটিতে বড় সাবজেক্টে পড়তে পারো।’ এই একটা কথা শুনে তখন ডিসিশন নিয়ে কোথাও একটা নিজের ছোটখাটো ‘গতি’ করে ফেললাম। খারাপ -ভালো যাই হোক, আমার ভালো লাগে।

ফাইনাল পরীক্ষা। পড়াশুনা না করার জন্য চোখে সর্ষে ফুল দেখছি। সিলেবাস দেখে বুঝলাম ফেইল করতে যাচ্ছি। অটোমেটিক চোখে পানি চলে আসছে। ফেইল করব শেষে! বন্ধু শুধু পাশ থেকে বলল, ‘তুই পারবি, ফেইল করলে করবি, যাস্ট পড়তে থাক’। পরদিন পরীক্ষা দিয়ে বুঝলাম ফেইল হবেনা।

এরকম হাজার হাজার ঘটনা আছে আমার আপনার জীবনে।

এই যে আপনার প্রতি বিশ্বাস রাখা একজন স্যার, একজন বড় ভাই, একজন বন্ধু এরাই আপনার জীবনে একেকজন ‘মোটিভেশনাল স্পিকার’। এই যে আপনি, আপনি নিজেই একজন মোটিভেশনাল স্পিকার, আপনাকে মোটিভেট করতে আপনিই পারবেন। জীবনে এই মোটিভেশনাল স্পিকারদের দরকার আছে। খুবই দরকার আছে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।