যারা ‘জীবনের লক্ষ্য‘ রচনায় প্রাথমিক শিক্ষক হতে চাইতেন…

১.

স্কুল জীবনে ক্লাস শুরু হবার আগে সকালবেলা আমাদের এসমেম্বলিতে হাজির হতে হত। সারীবদ্ধ ছাত্রছাত্রীদের সেখানে যেকোন একজন শিক্ষক কিছু যোগ ব্যায়ামের শিক্ষা দিতেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সবার একসাথে জাতীয় সংগীত গাওয়া যেটা হৃদয়ে দেশাত্ববোধ জাগ্রত করত। কিন্তু এটা ছাড়াও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল অ্যাসেম্বলিতে যেটা সময়ের সাথে সাথে আমাদের মস্তিষ্ক থেকে মুছে যেতে থাকে – আমি শপথ পাঠ করার কথা বলছি।

জাতীয় সঙ্গীত শোনার সুযোগ এখনো হয় টিভি রেডিও বা কোন জাতীয় দিবসে। কিন্তু স্কুল ছাড়ার সাথে সাথে আমরা প্রাত্যহিক শপথ পাঠ করার অভ্যাসটা হারিয়ে ফেলি এবং সেইসাথে দশ বছর ধরে যে শপথ বাক্যগুলো পাঠ করেছিলাম সেগুলার অর্থ উপলব্ধি করা এবং সেটা প্রয়োগ  করার ব্যাপারটা ভুলে যাই। কিন্তু শপথ বা ওয়াদা এমন ব্যাপার যেটা ভাঙ্গাকে যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই খুব গর্হিত একটা কাজ হিসেবে ধরা হয়।

স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিভিন্ন স্তর পার করে যখন আমরা কোন পেশায় নিজেকে নিয়োগ করি তখন সেই সোনালী সকালগুলোতে পাঠ করা শপথ বাক্যগুলা অনেক আগেই বিস্মৃতির অংশ হয়ে যায় ।

২.

স্কুলে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের একটা সাধারণ রচনা ছিল ‘জীবনের লক্ষ্য’। বেশিরভাগ বইতে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে হয় ডাক্তার কিংবা শিক্ষক থাকত । কাকতালীয়ভাবে ছাত্রছাত্রীদের জীবনের লক্ষ্যগুলাও এই দুইটা পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত । ব্যাপারটা আসলেই চমকপ্রদ এই ভেবে যে দেশের প্রায় ৯০ ভাগ ছাত্রছাত্রী ছোটবেলায় ডাক্তার কিংবা শিক্ষক হতে চায়।

কিন্তু এটা আসলেই বাস্তবতা ছিল নাকি শুধু পরীক্ষায় ভাল মার্ক পাওয়ার বা শিক্ষককে সন্তুষ্ট করার জন্য, আবার এমনো হতে পারে যে শিক্ষার্থী নিজের জীবনের লক্ষ্য কি সেটা বলতে না পারার কারণে এটা ঘটতো বা এখনো ঘটছে। উত্তর প্রথমটা হলে বলা যায় আমাদের বেশিরভাগ তরুণ পেশাজীবী সমাজ চরম হতাশায় আক্রান্ত কারণ শুধু ডাক্তার বা শিক্ষক হওয়ার সুযোগ কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা কখনো রাখবেনা।

দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বলা যায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা শিক্ষার্থীদের গৎবাঁধা শিক্ষার দিকে ঝোঁকে রেখেছে। আর তৃতীয়টা ঘটতে পারে ওই বিষয়ে ছাত্রছাত্রীদের পর্যাপ্ত পাঠদান এর অভাব এর ফল হিসেবে, কারণ নিজের সত্যিকার জীবনের লক্ষ্য কি সেটা লিখতে গেলে জীবনের লক্ষ্য কি কি হতে পারে, কোন লক্ষ্য বাস্তবায়নে কি কি করা লাগবে এবং এগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কতটুকু ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা একজন শিক্ষার্থীর থাকতে হবে।

এটা একটা উদাহারণ মাত্র – বাস্তবতা হচ্ছে আমরা স্কুল কিংবা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে কোন কিছু শিখি তা বেশিরভাগক্ষেত্রেই বাস্তবজীবনে ওটার প্রয়োগের ব্যাপারটা মাথায় না রেখেই শিখি। আরেকটা উদাহারণ দিই। প্রাইমারি স্কুলে থাককাকালীন বাংলা ক্লাসে বাড়িকাজ খাতায় লিখতাম ‘সদা সত্য কথা বলিব’ – বাস্তবক্ষেত্রে লেখাটার প্রয়োগের হার কত সেটা নিজেকে প্রশ্ন করলেই জানা যাবে। আসল সমস্যা হচ্ছে এগুলা আমাদের শিক্ষিত হবার জন্য শিখানো হয়না , শিখানো হয় ক্লাসে ভাল মার্ক পাওয়ার জন্য। ভাল নম্বর পাওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা ব্যাবহার করে ভাল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল বিষয়ে অধ্যয়ন করে ভাল আয়রোজগারের পথ সুগম করা ।

৩.

একজন স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীকে যখন শিখানো হয় ‘লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে’ তখন বুঝে নিতে হবে শিক্ষাব্যাবস্থায় গলদটা কোথায়, কারণ প্রাইভেট গাড়িতে চড়ার জন্য কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আবশ্যক না। অর্থ উপার্যন আর জ্ঞানার্জন এই দুইটা জিনিস আমাদের সমাজ গুলিয়ে ফেলেছে অনেক আগে থেকে। যেটা থেকে বের হওয়ার জন্য সুশিক্ষার কোন বিকল্প নাই।

একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যাক্তি যখন তার সাইনের খোচায় লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়াকে অন্যায় মনে করেনা – ‘অন্যরা নিচ্ছে তাই সেও নিবে’ এই ধারণায় নিজেকে আশ্বস্ত করে তখন কারো বুঝার অপেক্ষা থাকার কথা না যে শিক্ষা আসলে আমাদের আর মেরুদন্ড হিসেবে কাজ করেনা । উল্টা সেটা দেশ ও সমাজের মেরুদন্ডকে ভেংগে দেবার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে । আর এই ব্যাপারগুলো ঘটার মুল কারণ হচ্ছে আমাদের পড়াশোনা করার পিছনে আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জনের ব্যাপারটাকে প্রাধান্য দেয়া হয় ।

পেশাজীবনে যখন স্বাভাবিক উপায়ে সেই আর্থিক স্বচ্ছলতাটা পাওয়াটা সম্ভব হয়না তখন প্রত্যাশা এবং মজুদের বিয়োগফল শুন্য করতে গিয়ে অতিরিক্ত যোগানের প্রয়োজন পড়ে যেতা হয়ত অনেকসময় বৈধ পথে পাওয়া সম্ভব হয়না ।

৪.

তবে এমন না যে আর্থিক স্বচ্ছলতা প্রয়োজন নাই – মুলত সেটা প্রতিষ্ঠার জন্যই এত কিছু । প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একজন মানুষকে তার চারপাশের সমাজ, প্রকৃতি, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ধর্ম ও আরো অনেক বিষয়ে জ্ঞানদান করে; ব্যবস্থা করে এসব বিষয়ে নিজের অর্জিত জ্ঞানকে অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার। শিক্ষা একজন মানুষের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ধারণা দেয় যেটা তাকে নম্র হতে শেখায় , ধৈর্য ধরতে শেখায় , বিচক্ষন হতে শিখায়।

বিচক্ষনতা ব্যবহার করে একজন মানুষ বুঝতে পারে কোন কোন কাজটা করা ঠিক আর কোন কাজটা ভুল। কোন একজনকে টাকার বিনিময়ে সুবিধা দিলে তাতে লাভ হয় শুধু দুইপক্ষের – আর সঠিক নিয়ম মেনে কাজ করলে তাতে লাভবান হয় একটা সমাজ। এটা বুঝার এবং এটাকে বাস্তবায়ন করার জন্য একজন সাধারণ মানুষকে তৈরি করাই হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য। আপনি অনেক মেধাবি প্রকৌশলী বা ডাক্তার হয়ে কোন লাভ নেই যতক্ষন না সেই মেধাটা মানুষের সত্যিকার উপকারে আসছে। উন্নত জাতিরা উন্নত হয়েছে কারণ তারা তাদের উন্নতির জন্য নতুন নতুন জ্ঞানের শাখা তৈরি করেছে এবং সেগুলা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করেছে এবং তারা বর্তমানে শুধু আর্থিকভাবে নয় – সবদিকে থেকেই স্বচ্ছল।

অন্যদিকে আমাদের শিক্ষাব্যাবস্থা উন্নতদের তৈরি করা সিস্টেম সম্পর্কে আমাদের শিক্ষাদান করে যেন আমরা একইভাবে আমাদেরও আরো উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারি। আপনি যখন একটা কম্পিউটার বানাবেন তখন আপনাকে সেটা বানানোর যেই নির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রচলিত আছে সেটাকেই অনুসরণ করতে হবে।

সমাজব্যাবস্থাও একই – একটা সমাজের শৃঙ্খলা এবং উন্নয়ন বজায় রাখতে যে সব পদ্ধতি এই বিষয়ে সফলরা তৈরি করেছে আপনাকে ঠিক সেভাবেই বাস্তবায়ন করতে হবে। এর সামান্য গ্রহণ করে আর সামান্য ফেলে দিয়ে সেই বাস্তবায়ন সম্ভন না, ঠিক কম্পিউটারের বিভিন্ন অংশের মত ব্যাপার। আরো বড় উদাহারণ হচ্ছে মানবদেহ যার প্রতিটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গই সঠিকভাবে কার্যকর থাকা আবশ্যক। কোন একটি অঙ্গ বিকল হয়ে গেলে পুরা সিস্টেমটাই ধীর এবং অচল হয়ে যায়। শিক্ষা ব্যাবস্থা হচ্ছে মানদেহের মেরুদন্ড যেটা ঠিক থাকলে এবং সঠিকভাবে সঞ্চালিত হলে পুরা সামাজিক সিস্টেমটা স্বাভাবিক থাকে।

৫.

শিক্ষাকে দুইভাগে ব্যবহার করা যায় । নিজে জেনে নিজের মধ্যেই রেখে অন্যকে নিজের উপর নির্ভরশীল করে তোলা। আরেকটা হচ্ছে, নিজে জেনে অন্যকেও জানানো যাতে সেও একইভাবে ওই শিক্ষাটা ব্যাবহার করতে পারে। প্রথমটা যদি কোথাও প্রচলিত থাকে সেক্ষেত্রে শিক্ষার সঠিক ব্যবহারটা হবেনা।

এভাবে চললে সিস্টেমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে এবং একসময় সেটা ধীর গতির বা কোন কোন ক্ষেত্রে অচল হয়ে পড়তে পারে। সমাজের একেকজনকে একেক বিষয়ে শিক্ষাদান করানো হয় ওই ক্ষেত্রে সমাজে অবদান রাখার উদ্দেশ্যে । যখন সঠিকভাবে শিক্ষাটা কাজে না লাগে তখন সেটিই হয়ে যেতে পারে গলার কাঁটা ।

৬.

একজন পরমাণু বিজ্ঞানী তার জ্ঞান দিয়ে পারমাণবিক বোমাও তৈরি করতে, আবার বিদ্যুৎও উৎপাদন করতে পারে।  কিংবা একজন পুলিশকে বন্দুক দেয়া হয় সন্ত্রাসীকে ঘায়েল করার জন্য – কিন্তু সেটা ততক্ষনই সত্য যতক্ষণ পুলিশ সেটা মনে ধারণ করবে। না করলে সেটা নিষ্পাপ মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

একটা জাতির উন্নতির জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নেই, কিন্তু সেই শিক্ষা দেওয়ার আগে সেটা সঠিকভাবে ব্যবহার করার মানসিকতা তৈরি করা অনেক বেশি গুরুত্বপুর্ণ। পুলিশের বন্দুকের গুলির ন্যায় শিক্ষার উদ্দেশ্যও সৎ – তবে তার প্রয়োগটা যথাযথ না হলে শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড না হয়ে ব্যাধিতে পরিণত হতে পারে।

 

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।