আত্মহত্যা নয়, জীবনের জয়গান

১.

তার সাথে আমার প্রথম দেখা টিএসসির মোড়ে। টিএসসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা হলেও এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে মেয়ে ছাড়াও বাইরের অনেকেই ঘুরতে আসে। এরকমই একটা সময় আকিল ভাইয়ের সাথে ঘুরতে গিয়ে আরেক জন ঘুরতে আসা মানুষের সাথে পরিচয়। প্রথম দর্শনে লোকটা কারো নজরে পড়বে না, সাধারণ বিশেষত্বহীন একজন মানুষ। কিন্তু আমাদের চোখে ধরা পড়লো ভিন্ন কারণে। ভর দুপুরে নির্জন জায়গায় ২০-২২ বছরের একজন ছেলে হাউমাউ করে কাঁদলে চোখে পড়ারই কথা।

এই এলাকায় মাঝে মাঝে কিছু কিছু পাগল চোখে পড়ে। অনেক পাগলই নিজের মতো করে প্রলাপ বকতে থাকে, কেউ কেউ আবার আপন মনে নিজের সাথেই কথা বলতে থাকে, অনেকে আবার মানুষ দেখলে অকারণে গালাগালি করে। কিন্তু ছেলেটাকে দেখে পাগলও মনে হচ্ছিল না।

আমি পরিচিত মানুষের সাথেই কথা কম বলি, তাই অপরিচিত কারো সাথে কথা বলতে আমার ভালো লাগে না। কিন্তু আকিল ভাইয়ের জোড়াজুড়িতে কথা বললাম।

– কি ব্যাপার ভাই, কাঁদছেন কেন?

– কাঁদলেও জবাবদিহি করতে হবে?

– জবাবদিহির কথা আসছে কেন ভাই? আপনাকে কাঁদতে দেখে খারাপ লাগলো। এজন্য জিজ্ঞেস করলাম।

– আমার জীবনে আর কোন কিছু বাকি নেই। আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। পকেটে ঘুমের ঔষধ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, সাহস পাই নি।

– কি বলছেন ভাই? আত্মহত্যা করবেন কেন? আত্মহত্যা তো মহাপাপ।

– আমি যে কাজ করছি সেটাও মহা পাপ। বেচে থাকার আর কোন মানেই হয় না।

– বুঝলাম আপনি খুব বড় ধরণের কোন অন্যায় কিংবা ভুল করেছেন। হয়তো আত্মহত্যাও করে ফেলবেন। কিন্তু আমাদের সাথে একটু শেয়ার করলেতো সমস্যা নেই। হয়তো আপনি যে ভুল করেছেন ভবিষ্যতে আমরা সেই ভুলটা করলাম না।

আমি আগেও লক্ষ্য করেছি, আকিল ভাইয়ের মানুষকে কনভিন্স করার ক্ষমতা অসাধারণ। লোকটা তার কথা বলা শুরু করলো।

২.

ঘটনা শুনে বুঝলাম পরিস্থিতি আসলেই খারাপ। টিটু (ছেলেটার নাম) ভাই কুড়িগ্রাম থেকে এসেছে। তিতুমির কলেজে একাউন্টিং এ অনার্স করছেন। এক বন্ধুর বুদ্ধিতে শেয়ার বাজারে কিছু টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। লাভ হচ্ছে দেখে বাড়ি থেকেও টাকা এনে এই ব্যাবসায় লাগিয়েছিলেন। এখন সম্পূর্ণ লসের পাল্লায় আছেন। প্রায় ৪০ লাখ টাকা খাটিয়ে এক পর্যায়ে হয়েছিল ৬০ লাখ টাকার মতো। কিন্তু এখন নাকি সেটার মূল্য ১৪ লাখ টাকায় নেমে গিয়েছে।

আমি শেয়ার ব্যবসা ভালো বুঝি না। কিন্তু ৪০ লাখ টাকার জিনিস যখন ৬০ লাখ টাকায় চলে যায় তখন বিক্রি না করে পরে সেটাই ২০ লাখে বিক্রি করার কারণ একটাই মনে হয় ‘অতি লোভে তাতি নষ্ট’ । যাই হোক, যহেতু আমি বিষয়টা বুঝি না তাই এটা নিয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে না। তবে সেটা পরের সমস্যা, এখনকার অবস্থা তো আসলেই খারাপ। বাড়ির অবস্থাও নাকি তেমন সুবিধার না। কিন্তু আকিল ভাইকে এতটা চিন্তিত মনে হচ্ছে না।

– টিটু ভাই কি আগে কখনো শেয়ার ব্যবসা সম্পর্কে ধারণা নিয়েছিলেন?

– না, ঢাকায় আসার পরেই প্রথম শুনলাম। প্রথমে লাভ ভালোই হয়েছিল। ২ লাখ টাকা থেকে যখন সাড়ে ৪ লাখ টাকায় উঠে গেল তখন মনে হচ্ছিল আরেকটু টাকা খাটালে আরো লাভ হতে পারে।

– কোন কিছুতেই না বুঝে কিছু করার পক্ষপাতি আমি নই। শেয়ার ব্যাবসা সম্পর্কে আমার নিজের ধারণাও কম। তবে আমি একটা জিনিস জানি যে অনেক মানুষ ধার দেনা করেও টাকা শেয়ার ব্যাবসায় খাটিয়ে লস করেছে। তাদের অবস্থা আপনার চেয়েও খারাপ। আপনার টাকাটা তো তবুও নিজের টাকা। এখনও তবুও কিছু টাকা আছে। অনেকের তো ব্যাংকের ধার টানতে হবে। তাদের চেয়ে অন্তত ভাল অবস্থায় আছেন। বাড়িতে কি আপনার টাকার উপরেই নির্ভরশীল।

– সেরকম কিছু না। এখান থেকে টাকা না পাঠালেও চলে যেতে পারবে। তবে আত্মসম্মান বলে একটা কথা আছে। এমনিতেই পড়াশোনাতে তেমন ভালো কিছু করতে পারিনি। তার উপর টাকাটা নষ্ট করলাম।

– অনেকে অনেক কিছুই বলবে। আর ভুল যেহেতু করেছেন কাজেই কিছু কথা হজম করতে শিখুন। আপনি মারা গেলে দুনিয়ার কোন কিছু পাল্টাবে না। কারো কোন লাভ ক্ষতি হবে না। যা হবার আপনারই হবে। আর এত অল্প বয়সে আপনি জীবন যুদ্ধে হেরে যাবেন কেন?

– কি করবো তাহলে আমি? পড়াশোনা করে খুব ভালো চাকরি পাবো এমন নিশ্চয়তাও তো নেই।

– সেটা নেই। তবে প্রতিটা মানুষেরই একটা স্পেশাল গুণ থাকে। আপনার ভেতর কোনটা আছে সেটা আগে বের করতে হবে।

– সেটা বের করে লাভ কি?

– ব্যাবসা অথবা ইকোনমিক্সে দুটো টার্মস প্রচলিত আছে, Absolute advantage আর Comparative advantage. Absolute advantage হচ্ছে কোন একটা দেশ বা জাতি কিংবা ব্যক্তির এমন কিছু বৈশিষ্ট্য যা কিনা অন্য দেশ বা জাতি কিংবা মানুষের মাঝে নেই বললেই চলে। যদিও বা থাকে তাহলেও সেটা খুব কম পরিমাণে। একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝাই। মনে করেন সাউথ আফ্রিকা ডায়মন্ড উৎপাদনে পারদর্শী। এখন আমেরিকাতে ডায়মন্ডের কোন খনি নেই। কাজেই আমরিকাকে ডায়মন্ড কিনতে হলে দক্ষিণ আফ্রিকার (কিংবা যার কাছে ডায়মন্ড আছে) কাছেই যেতে হবে।

অন্যদিকে Comparative advantage হচ্ছে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য যা কিনা অনেকেই করতে পারে কিন্তু যে কিনা সবচেয়ে কম খরচে করতে পারবে সে লাভ বেশী করতে পারবে। মনে করুন গার্মেন্টস অনেকেই উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে এরপরেও গার্মেন্টস শিল্প বেশী গড়ে উঠেছে কেন? আপনার কি মনে হয়? বাংলাদেশ যা তৈরী করতে পারে সেটা জার্মান কিংবা ইটালী তৈরী করতে পারবে না? তারাও পারবে। কিন্তু তাদের উৎপাদন খরচ আমাদের চেয়ে অনেক বেশী পড়বে। তাদের শ্রমিকের খরচ অনেক বেশী আমাদের তুলনায়। তাছাড়া নদীনালা থাকায় আমাদের পানির মূল্যও কম। এ কারণে যে শার্ট বানাতে ওদের দেশে খরচ হয় ২০০ টাকা, সেটাই আমাদের দেশে খরচ হয় ২০ টাকা। আপনি একই জিনিস যদি আরেকজনের চেয়ে কম টাকায় দিতে পারেন তাহলে মানুষ আপনার কাছেই আসবে।

– এই জ্ঞানের কথা আমাকে বলে লাভ কি ভাই?

– লাভ আছে। একটা দেশ কিংবা কোম্পানির যেমন দুই ধরণের অ্যাডভান্টেজ আছে ঠিক তেমনি একজন মানুষেরও এই দুই ধরণের সুবিধা আছে। সেটা জায়গা মতো কাজে লাগাতে পারলেই আপনি সর্বোচ্চ সফলতা পাবেন। সব মানুষের সব গুণ একরকম থাকে না। উন্নত দেশগুলো সফল কেন? কারণ তারা প্রথমেই বের করার চেষ্টা করে কোন বাচ্চার ভেতর কোন গুণটা আছে? তারা ডাক্তারকে ডাক্তার বানানোর চেষ্টা করে, ইঞ্জিনিয়ারকে ইঞ্জিনিয়ার, খেলোয়াড়কে খেলোয়াড় আর কবিকে কবি। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তারা সফলতা পায়। আর আমাদের দেশে যদি কারো কাছে অঙ্ক করতেও ভালো লাগে তাহলেও তাকে আমরা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানিয়ে ফেলতে চাই।

– আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সেটা কি অনুচিত? ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হলে আপনি অন্তত জীবিকা নির্বাহের একটা সুযোগ পাবেন। একজন কবির কি নিশ্চয়তা আছে?

– না নেই। তবে আপনি যদি আপনার Absolute advantages টা ধরতে পারেন আর সেটা একটু efficiently ভাবে ব্যবহার করতে পারলে ভালো কিছু আশা করা সম্ভব। আপনি শেয়ার ব্যাবসা বুঝেন না, অথচ লাভ হবে মনে করে চলে গেলেন সেই ব্যাবসায়। এত আর্থিক লাভ হলেও কাজের কাজ কিচ্ছু হবে না।

– বুঝলাম, তাহলে এখন আমার কি করা উচিত?

– ব্যক্তিগত ভাবে আপনার কোন কাজটা করতে ভালো লাগে?

– আমার রান্না বান্না করতে ভালো লাগে।

– তাহলে আপনি একটা রেষ্টুরেন্ট কিংবা ফাষ্ট ফুডের দোকানে কিছুদিন কাজ করুন। আপনার বয়সও অল্প। দুই তিনবছর চাকরি বাকরি করলে কিছু ব্যবসার লাইন বের করে ফেলতে পারবেন। আর আপনার যেহেতু দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে তাই কিছু করতে পারবেন আশা করি।

– ধন্যবাদ ভাই। জানিনা কি করবো তবে আপনার সাথে কথা বলে একটু হালকা লাগছে।

– আত্মহত্যার কথা ভুলেও ভাববেন না। ইন্টারে পড়ার সময় আমার এক মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল। সেই মেয়ের বিয়ে হয়ে যাবার পর আমার নিজেরও আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করেছিল। ভাগ্যিস তখন কিছু করিনি। এখন কিন্তু ভালোই আছি।

– মনে থাকবে ভাই আপনার কথা।

ভবিষ্যতে কি হবে জানিনা তবে এই মূহুর্তে আকিল ভাইয়ের কথা শুনে তাকে কনভিন্স মনে হলো।

৩.

টিটু ভাইয়ের সাথে আমার পরবর্তী দেখা গত বছর (২০১৬ সালে), ছেলেটার এখন তার নিজের এলাকার বিভিন্ন জায়গায় চারটা স্ট্রিট ফুডের (রাস্তায় ভ্যান গাড়িতে খাবার) দোকান আছে। আমার সাথে দেখা বসুন্ধরা মার্কেটে। ব্যস্ততার জন্য খুব বেশী কথা বলতে পারলাম না। কিভাবে কি হলো সেটাও জানতে পারলাম না। অল্প সময়ে যা শুনলাম তাতে বুঝলাম টাকা পয়সা মোটামুটি হয়েছে। তবে প্রাথমিক ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল। টাকা পয়সা কম রোজগাড় করলেও নিজের পছন্দ মতো কাজ করতে পেরে খুশী।

ওর ইচ্ছে একটা শপিং মলে ছোট খাটো দেশীয় খাবারের একটা দোকান দেওয়া। শপিং মল গুলোতে বেশিরভাগ দোকানেই চাইনিজ, থাই, ভারতীয় কিংবা ওয়েষ্টার্ন খাবারের কদর। দেশীয় ভাত মাছের কদর কেবল হোটেল গুলোতে আর বড় কিছু রেষ্টুরেন্টে। অথচ, বাংলাদেশের নিজস্ব কিছু খাবারও মার্কেটে জনপ্রিয় করা সম্ভব। ওর ইচ্ছে এগুলো নিয়ে কিছু করার।

আমার ফোন নম্বর রেখে দিল। ঢাকা শহরে কোন দোকান দিলে প্রথম খাবার নাকি আমাকে আর আকিল ভাইকেই খাওয়াবে। Absolute advantage আর Comparative advantage সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে তো বেশ ভালোই হয়। খুব বেশী টাকা উপার্জন করতে না পারলেও নিজের পছন্দের কাজটা করতে পারলে অন্তত ভালো লাগাটা বেড়ে যায়।

সমস্যা হচ্ছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা স্রোতে গা ভাসিয়ে দেই। একটু চিন্তা করলাম আমার কোন কাজটা করতে বেশী ভালো লাগে? আমার কাছে অংক করতে ভালো লাগতো, হয়তো বা অংক নিয়ে লেগে থাকলে ভালো কিছু করতে পারতাম। কিন্তু আপাতত এসব ভেবে কি আসলে কোন লাভ আছে?

কোন মানুষ যদি তার Absolute advantage টা ধরতে পারে আর সেটা efficiently ভাবে ব্যবহার করে comparative advantage এ পরিণত করতে পারে তাহলে সেই মানুষটিই হবে সবচেয়ে সফল।

ভবিষ্যতে আমাদের দেশে এরকম সফল মানুষ দেখার অপেক্ষায় আছি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।