জিম্বাবুয়েকে কেন পছন্দ করি?

২০০৪ সালে জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে ’৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর পর প্রায় পাঁচ বছর পর ওয়ানডেতে জয় পেয়েছিলো বাংলাদেশ। মাঝের সময়টা ছিলো ভুলে যাওয়ার মতো। কেনিয়া, কানাডার কাছেও হারতে দেখেছিলাম বাংলাদেশকে। ২০০৫ সালে ফিরতি সফরে এসেছিলো জিম্বাবুয়ে দল। বিদ্রোহের আগুনে পুড়ে জিম্বাবুয়ে তখন নতুন এক দল। সিরিজের আগেই তাই জমজমাট লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছিলো। টেস্ট সিরিজ বাংলাদেশ জিতে নেয় ১-০ ব্যবধানে। এরপর সেই ওয়ানডে সিরিজ, প্রথম দুই ম্যাচ হেরে ০-২ ব্যবধানে পিছিয়ে বাংলাদেশ।

আমি তখন ক্লাস টেনের ছাত্র। ২০০৩ সালের শেষের দিকে খুলনা থেকে ঢাকায় এসেছি পরিবারের সাথে। স্টেডিয়ামে যেয়ে কখনো ক্রিকেট খেলা দেখিনি। সেই সুযোগ আসে ২৯ জানুয়ারি ২০০৫ তারিখে, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলাম। স্টেডিয়ামের গেট দিয়ে গ্যালারিতে ঢুকেই প্রথম যে খেলোয়াড়কে দেখেছিলাম তিনি ব্রেন্ডন টেলর, স্কয়ার লেগে ফিল্ডিং করছিলেন।

বেশ রোমাঞ্চকর এক ম্যাচ ছিলো, মানজারুল ইসলাম রানার দূর্দান্ত বোলিং (৩৪/৪) ম্যাচ জিতিয়েছিলো বাংলাদেশকে। স্টেডিয়ামে বসে বাংলাদেশের জয় দেখা তখন বিরাট এক বিষয়! সেই ম্যাচ এখনো মনের ভেতর গেঁথে আছে। মানুষের জীবনে সব প্রথমের একটা আলাদা জায়গা থাকে, স্টেডিয়ামে দেখা প্রথম সেই ম্যাচের প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে তাই একটা বিশেষ জায়গা করে নেয় সেদিনই।

ওই সিরিজের পর বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম থেকে ক্রিকেট সরিয়ে নেয়া হয় মিরপুরে। প্রায় দুই বছরের কাছাকাছি ঢাকায় কোন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হয়নি (ফতুল্লায় হয়েছে)। বাড়ির পাশে মিরপুর স্টেডিয়াম, সেখানে আমি ফুটবল দেখেছি। ক্রিকেটের জন্য উপযোগী করে তোলার সময় প্রায়ই যেতাম। বিরাট নির্মানযজ্ঞ চলছে। পুরা মাঠের মাটি উঠালো, টুকরা টুকরা কয়লা ফেলা হলো, তার উপর বালি, উইকেট থেকে বাউন্ডারি লাইন পর্যন্ত জিআই পাইপ বসানো (পানি মাটি চুইয়ে ওই পাইপ দিয়ে বের হয়ে যায়), পাইপের উপর আরেক দফা বালি মাটি বসানো ইত্যাদি সবই চোখের সামনে। সেসময় ইনডোর তৈরী হয়েছে, একাডেমি মাঠ ছিলোনা, আউটার স্টেডিয়াম বলা হতো, এলাকার ছেলেপেলে সেখানে ক্রিকেট খেলতো। খোলা সেই মাঠই আজকের একাডেমি মাঠ যেটা বিশ্বকাপের আগে বানানো হয়।

মাঠ যখন প্রস্তুত, অভিষেক সিরিজের অপেক্ষা তখন সরাসরি ভেতরে চলে যেতাম, এক হাত দূরে দাড়িয়ে অনুশীলন দেখা যেত। আশরাফুল, হাবিবুল বাশার, মুশফিক, তুষার, রাজিন, মাশরাফিরা দুই হাত দূরে রানিং, ক্যাচ অনুশীলন করছে! একদিন এতো কাছে চলে গিয়েছিলাম যে আশরাফুল এসে বললেন ‘ভাই একটু পেছনে সরে দাড়ান’! আর এখন কত কড়াকড়ি!

২০০৬ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ সফরে আসলো জিম্বাবুয়ে। ওয়ানডে সিরিজের চতুর্থ ম্যাচ ৮ ডিসেম্বর ২০০৬ তারিখে। শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের অভিষেক ম্যাচ! সেদিন মনে আছে মিরপুরে যেন ঈদ! মানুষের স্রোত স্টেডিয়ামের দিকে। ঢাকায় ক্রিকেট ফিরেছে, দেশের “হোম অব ক্রিকেট”-এর যাত্রা শুরু হচ্ছে। মানুষ সেদিন শুধু বাংলাদেশ না, জিম্বাবুয়ের জন্যেও বড় বড় প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে হাজির স্টেডিয়ামে। জিম্বাবুয়ে যেন কত আপন আমাদের! সেদিন আমিও ছিলাম স্টেডিয়ামে, বাংলাদেশের আরো একটি জয়ের সাক্ষী হয়েছিলাম, মাঠে বসে আমার দেখা দ্বিতীয় ম্যাচ।

২০০৪ থেকে ২০১৫, এই সময়টায় বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত প্রতিপক্ষ ছিলো জিম্বাবুয়ে। সময়টা দুই দলের জন্যেই কঠিন ছিলো, জিম্বাবুয়ে টেস্ট ক্রিকেট থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসনে, বাংলাদেশ তখন নিয়মিত খেলা পাবার জন্য ব্যাকুল। ‘বড় দল’ বলে পরিচিত যারা তাদের সাথে খেলার সুযোগ হয় কম, তৎকালীন কোচ ডেভ হোয়াটমোরের থিওরি ছিলো ছোট দলের সাথে খেলে হলেও জয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা। বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে তখন কাছাকাছি দল, এই দুই দলের সিরিজ মানে ‘গরিবের অ্যাশেজ’।

সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহরা ক্যারিয়ারের শুরুতে সবচেয়ে বেশিবার যাদের বিপক্ষে মাঠে নেমেছে তারা জিম্বাবুয়ে। তামিমের সর্বোচ্চ ওয়ানডে স্কোর, সাকিবের দ্রুততম সেঞ্চুরি, মুশফিকের ক্যারিয়ারের একমাত্র ওপেন করা, নাসিরের অভিষেকে সর্বোচ্চ রান, শাহাদাতের হ্যাট্রিক, জিয়ার পাঁচ উইকেট, ছক্কা নাইমের সেই বিখ্যাত তিন ছক্কা, তাইজুল, লিখনদের বোলিং এইরকম আরো কত রেকর্ড যে পাওয়া যাবে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে!

আমাদের কাছে তখন জিম্বাবুয়ে সবচেয়ে পরিচিত প্রতিপক্ষ, তাদের প্রতিটা প্লেয়ার যেন আমাদেরও খুব পরিচিত! এই যে ‘ছোট দল’ থেকে সমীহ জাগানো এক দলে পরিনত হয়েছে বাংলাদেশ রূপক অর্থে বলাই যায় সেটাতো জিম্বাবুয়ের সাথে খেলে খেলেই! এজন্য জিম্বাবুয়ের প্রতি রয়েছে আমার গভীর শ্রদ্ধা, যখন কাউকে পাশে পাইনি তখনো জিম্বাবুয়েকে পেয়েছি পাশে আমরা।

আবার স্পিন নির্ভর বাংলাদেশের পেসারদের উত্থানের সময়টাতে বোলিং কোচ ছিলেন হিথ স্ট্রিক। তাকেও খুব ভালো লাগে। বিনয়ী মানুষ, পরিশ্রমী কোচ।

টাটেন্ডা টাইবু, ব্রেন্ডন টেলর, হ্যামিল্টন মাসাকাদজা, ক্রিস্টোফার এমপফু, এলটন চিগুম্বুরা, স্টুয়ার্ট মাৎসিকানেরি, রে প্রাইস …নামগুলার সাথে কে না পরিচিত বাংলাদেশের?

বাস্তবসম্মত কারনেই বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে সিরিজ এখন কমে এসেছে। আগের মতো আর দেখা সাক্ষাৎ হয়না। সত্যিটা হলো, বিসিবি এখন জিম্বাবুয়ের চেয়ে আফগানিস্তানকে বেশি গুরুত্ব দেয় (এটা খারাপ না, ক্রিকেটের বিচারে ঠিকই আছে)। ২০১৫ সালে সর্বশেষ যখন জিম্বাবুয়ে বাংলাদেশ সফরে আসে (ওয়ানডে সিরিজ) তখনো স্টেডিয়ামে গিয়েছিলাম, মুশফিকের দূর্দান্ত এক সেঞ্চুরি দেখেছিলাম।

বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে ম্যাচ মানেই নস্টালজিয়ায় ভোগা, অনেক স্মৃতি, অনেক প্রাপ্তি আবার অনেক অপ্রত্যাশিত পরাজয়!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।