জিততে হবে না, জাস্ট কাঁপিয়ে দিক

ক্রিকেট বিকিকিনিতে ফেবু বাজারে একটা কথার বেশ প্রচলন রয়েছে। ‘আমাদের বিগ হিটার নেই’ এবং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এটাই নাকি বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দিয়েছে! আসলেই কি তাই? টেস্ট ক্রিকেটে তো বিগ হিটারের প্রয়োজন পড়ে না, তাহলে এই ঘরানায় আমরা পিছিয়ে আছি কেন? হিসাবটা ঠিক এই জায়গায় এসেই ডিজিট খুঁজে পায় না। চলুন বেকার সময়কে কাজে লাগিয়ে হিসাবটা মেলানোর একটা চেষ্টা করা যাক।

সবার প্রথমে জেনে নেয়া যাক, ‘বিগ হিটার’ শব্দটা দিয়ে আমরা কি বুঝি। এটা কি মাসল পাওয়ার, নাকি বিগ হিট করতে পারার ক্ষমতা? আমার কাছে কিন্তু দ্বিতীয় অপশনটিকেই পারফেক্ট মনে হয়। যে বিগ হিট করতে পারে, তাকেই কিন্তু বিগ হিটার বলা হয়। মাসল পাওয়ার থাকলেই তাকে বিগ হিটার বলা যায় কি? উহু, সেই সাথে তার হিট করার ক্ষমতাও থাকতে হবে। ব্যাপার যদি সেটাই হয়, তাহলে মাসল পাওয়ারের খুব একটা গুরুত্ব আমি দেখি না।

ছক্কা ১০০ মিটার হল, নাকি ৮০ মিটার সেটা স্কোর বোর্ডে কোন প্রভাব ফেলে না। গেইলের ছক্কাকে আইসিসি খুশি হয়ে ৮ রান দিয়ে দেয় না, আবার মুশির ছক্কাকে হীন মনে করে ৫ রানেও নামিয়ে আনে না। তাহলে দর্শক সারির উপরের তলাতে বল পাঠানোর জন্য বিগ হিটার খোঁজার দরকারটা কোথায়? হ্যাঁ, কিছুটা দরকার তো আছেই! এই যেমন দানবীয় শরীরের একটা মিস হিটও ছক্কা হয়ে যেতে পারে। তবে সেটার পরিমান কত শতাংশ?

কি মনে হয়, গেইল, পাঠান, রাসেল, লুইস এরা শুধু দানবীয় শক্তির জোরে ছয় মারতে পারে? এমনটা ভেবে থাকলে ভাবনায় লাগাম দিয়ে দিন এখনই। আসুরিক শক্তির একটা মূল্য আছে ঠিকই, তবে ক্রিকেটে টাইমিং বলে যে শব্দটা আছে, সেটার মূল্য আরও অনেক বেশি। প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্র্যাকটিস, এটাই হচ্ছে এই মাসল পাওয়ারকে পূর্ণতা দেবার মূল চাবিকাঠি। এই যে, এবিডি, কোহলি, ধাওয়ান, রোহিত, বাটলার এদেরকে আপনার কোনদিক থেকে দানব মনে হয়?

গড়পড়তা চেহারার এই খেলোয়াড়গুলোকে কি আপনি তাণ্ডব চালাতে দেখেন নি? মাসলের ব্যবহার এখানে ঠিক কতটা? এদের নামের পাশে বিগ হিটার তকমা বসাতে আমার কিন্তু একবারও ভাবতে হবে না। বিগ হিটিং ব্যাপারটায় সাইজ খুব একটা ম্যাটার করে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। দিনশেষে আপনাকে দ্রুত রান করতে হবে এটাই মূল বিষয়। অনুশীলন করেই এই হিটিং এবিলিটি নিজের ভেতর আনা যায়, তবে আপনি কতটা ডেডিকেটেড সেটা একটা প্রশ্ন বটে।

তাই, গেইলের আশায় বসে না থেকে রোহিত হবার চেষ্টা করাই উত্তম। বোলিং মেশিনের সামনে নেটে দাঁড়িয়ে যান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন লেন্থ থেকে বলকে পেটাতে থাকুন। ড্যাম্প পিচ, বাউন্সি পিচ, স্পিনিং পিচ সব ধরনের পিচে পেটানোর অনুশীলন করুন। নতুন বল, পুরনো বল সব ধরনের বলকে পিটিয়ে যান, পিটিয়ে পিটিয়ে জাস্ট সুতো উঠিয়ে ফেলুন। ট্রেনার আছেন, আপনার শক্তির ব্যাপারটা উনি দেখবেন। জিমে ঘাম ঝরান, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন করুন, আর সেই সাথে বলকে সীমানা ছাড়া করার লাগাতার অনুশীলন। নিজের সামর্থ্যকে আপনি নিজেই নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারবেন।

সুনীল নারাইনকে দেখুন, গত দুই সিজনেই নিজেকে ট্রান্সফর্ম করে ফেলেছে। শুধু মাসল পাওয়ার দিয়ে এটা সম্ভব? আজ্ঞে না, পুরোটাই পরিশ্রম এবং একাগ্রতা। মুশি, সাকিব, তামিম, সাব্বির, রিয়াদ এমনকি মিরাজও চাইলে বিগ হিটার হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেই সংকল্প তাদের ভেতর আছে কিনা সেটাই মূল বিষয়। নিজেদের সামর্থ্যকে যতদিন নিজেরা চ্যালেঞ্জ না করবে, ততদিন এই ফেবু বাজারে বিগ হিটারের হাহাকার থেকেই যাবে এবং সত্য বলতে জলবায়ু এবং ভৌগলিক কারণে কোনোদিনও আমাদের দেশ থেকে গেইল বা রাসেল টাইপ মাসল পাওয়ার বের হবে না।

তাই, গেইলের আশায় বসে না থেকে রোহিত হবার চেষ্টা করাই উত্তম। বোলিং মেশিনের সামনে নেটে দাঁড়িয়ে যান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন লেন্থ থেকে বলকে পেটাতে থাকুন। ড্যাম্প পিচ, বাউন্সি পিচ, স্পিনিং পিচ সব ধরনের পিচে পেটানোর অনুশীলন করুন। নতুন বল, পুরনো বল সব ধরনের বলকে পিটিয়ে যান, পিটিয়ে পিটিয়ে জাস্ট সুতো উঠিয়ে ফেলুন। ট্রেনার আছেন, আপনার শক্তির ব্যাপারটা উনি দেখবেন। জিমে ঘাম ঝরান, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন করুন, আর সেই সাথে বলকে সীমানা ছাড়া করার লাগাতার অনুশীলন। নিজের সামর্থ্যকে আপনি নিজেই নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারবেন।

হাহাকারের গল্প থেকে বেরিয়ে এবারে আজকের ম্যাচ নিয়ে আলোচনা করা যাক। শক্তির বিচার এবং ফরম্যাটের কারনে এই ম্যাচটা ডেভিড অ্যান্ড গোলিয়াথের যুদ্ধের মত। জানি অনেকেই নাক কুঁচকে আপত্তি জানাবেন, তাই কিছুটা ব্যাখ্যা দিয়ে রাখি আগেভাগেই। পজিশন বিবেচনায় যদি তুলনা করি, রোহিত-ধাওয়ানের ওপেনিং জুটি বিশ্বের যেকোনো ওপেনিং জুটিকে পেছনে ফেলতে পারে, এমনকি ইনফর্ম লিটন-তামিমকেও।

অভিজ্ঞ রায়না, সৌম্য থেকে অবশ্যই বেটার অপশন। মুশি ফুল ফর্মে থাকা অবস্থাতেও টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে মনিশ পান্ডেকে পেছনে ফেলতে পারবে না। রিয়াদ থেকে, রাহুলকে এগিয়ে রাখা যায় যেকোনো বিচারে। রিসভ পান্ট এবং সাব্বিরের তুলনা আপনাদের হাতেই থাক। এবারে আসি বোলারদের তুলনায়, এক মুস্তাফিজ ছাড়া একটা টি-টোয়েন্টি মানের বোলার এই বাংলাদেশ দলে বর্তমানে নেই এটা আপনাকে মেনে নিতে হবে। অপরদিকে চাহাল, উনাদকট, সুন্দর, শার্দুল, বিজয় শংকররা রয়েছেন ফুল ফর্মে।

অভিজ্ঞতার কথা বলেও পার পাওয়া যাবে না, কারণ ভারতের এই দলটা যে পরিমান প্রতিযোগিতামুলক ক্রিকেট খেলে, তাতে করে আন্তর্জাতিক ম্যাচের আঁচর এদের কাছে খুব একটা অপরিচিত মনে হবার কথা নয়। এবারে আপনিই বলুন, ডেভিড এবং গোলিয়াথের উপমায় নাক কুঁচকানোর কারন আছে কি নেই?

তাহলে কি ম্যাচ শুরুর আগেই হেরে যাব? এই ভারত কি আমাদের কাছে অপ্রতিরোধ্য? আজ্ঞে, না! এই ম্যাচটাও আমাদের পক্ষে জেতা সম্ভব কিছু যদি কিন্তুর মারপ্যাঁচে। অনেকেই মনে মনে ভারতের একটা জঘন্য দিন এবং আমাদের একটা সেরা দিনের অংক কষতে শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু সেটা এতটা সহজ নয়।

তাদের প্রায় সকল খেলোয়াড় ফর্মে রয়েছে, তাই জঘন্য দিনের প্রত্যাশা হালে পানি পাবে না। তবে একটু ভাগ্যের সহায়তা এবং আমাদের হার না মানা মানসিকতা পাশার দান উল্টে দিতে পারে। হ্যাঁ, টস ভাগ্যটা আমাদের পক্ষে থাকা জরুরী। পরে ব্যাট না করলে এই ভারতীয় দলকে হারানো অসম্ভব রকমের কঠিন। তাছাড়া আমাদের বোলিং এর যে হাল, তাতে করে ২০০ রানও ডিফেন্ড করতে পারব না বলেই মনে হয়। কিন্তু গত ম্যাচের আত্মবিশ্বাস চেজ করার ক্ষেত্রে কাজে আসবে।

সত্য বলতে বোলারদের উপর ভরসা পাচ্ছি না, কিন্তু আমাদের ব্যাটসম্যানরা মানসিক ভাবে শক্ত আছে। এই যে আমরা বলি যে ফর্মে আছে, এই ফর্ম জিনিসটা আসলে কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই না। একটা ম্যাচে বড় রান করলে পরের ম্যাচে ওই খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাসের লেভেলটা অনেক উঁচুতে থাকে এবং সেটাই কিন্তু তার ফর্ম। ওই কনফিডেন্সই তার পায়ের নাড়াচাড়া নিয়ন্ত্রন করে, অন দ্যা আপ কাভার ড্রাইভ খেলায়, মোট কথা তার সক্ষমতার চূড়ান্ত প্রকাশ করায় অবলীলায়।

আর ঠিক এই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের ব্যাটসম্যানরা। ভালো পিচে এমনকি ২০০ রানও আমরা চেজ করে ফেলতে পারব শুধু গত ম্যাচের কনফিডেন্সের কারনে। তাই, পিচের কন্ডিশন যাই হোক না কেন, চেজিং্যের বিকল্প দেখছি না। খর্ব শক্তির দল হয়ে এতটুকু ভাগ্যের সহায়তা তো আমরা ক্রিকেট বিধাতার কাছে আশা করতেই পারি।

জয় আসুক অথবা পরাজয়, সেটা নিয়ে খুব একটা ভাবছি না। শুধু এটুকুই চাওয়া, ওই বাইশ গজে নামা প্রতিটি ক্রিকেটারের শরীরী ভাষায় যেন শিকার ধরার উত্তেজনা বিচ্ছুরিত হয়। প্রতিপক্ষের শরীর বেয়ে যেন ভয়ের শীতল স্রোত নেমে আসে। জিততেই হবে এমন দিব্যি কেউ দেয় নি, জাস্ট কাঁপিয়ে দিক! এমনভাবে খেলুক, যাতে করে আগের জয়টাকে ফ্লুক মনে না হয়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।