জিকা ভাইরাস এবং বাংলাদেশের ঝুঁকি

ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া ভাইরাস যে এডিস প্রজাতির মশা দিয়ে ছড়ায় সেটা আমরা কম বেশি সবাই জানি। ইতোমধ্যে চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত ঢাকাবাসীর অনেকেই নাকাল। সেই একই এডিস প্রজাতির মশা দিয়ে আরেকটি ভয়াবহ ভাইরাস মানুষের শরীরে বাসা বাধতে পারে তা হল জিকা ভাইরাস (Zika virus)।

কেন জিকা ভাইরাস এর ভয়াবহতা ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া জ্বর থেকেও বেশি?

জিকা ভাইরাস একটু বেশি গুরুত্ব বহন করে এই জন্য যে এটি গর্ভবতী মায়েদের মাধ্যমে তাদের পেটে থাকা বাচ্চাকেও সংক্রমণ করতে পারে এবং সেই বাচ্চার জন্মগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে।

কিভাবে ছড়ায়?

এডিস মশা জিকা ভাইরাস বহন করে, মানুষের শরীর থেকে রক্ত নেয়ার সময় সেই ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, পরবর্তীতে ওই মানুষের শরীর থেকে অন্য মশা রক্ত নেয়ার সময় এবং সেই মশা অন্য মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে একই ভাবে। এছাড়াও জিকা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যাক্তি যৌন মিলনের সময় তার সঙ্গী কে ছড়িয়ে দিতে পারেন এই ভাইরাস (এইডস এর এইচআইভি ভাইরাস যেভাবে ছড়ায়)। এছাড়া মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমেও শিশুর শরীরে প্রবেশ করতে পারে এই ভাইরাস।

এটি প্রথম ১৯৪৭ সালে উগান্ডায় রেসাস ম্যাকাক বানরের দেহে পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে উগান্ডা ও তানজানিয়াতে মানবদেহে প্রথমবারের মত শনাক্ত করা হয়।

২০১৫ সালের মে মাসে ব্রাজিলে একসাথে ৪০০০ জন্মগত ত্রুটিসহ (মাইক্রোকেফালি বা ছোট মাথা বিশিষ্ট শিশু ) দেখা দিলে তাদের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে কলাম্বিয়ায় ২০০০০ জনকে শনাক্ত করা হয় যাদের ভিতর প্রায় ২০০০ জন গর্ভবতী।

জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত এক ব্রাজিলিয়ান শিশু

বাংলাদেশ ও জিকা ভাইরাস

মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রায় ৪ লাখ বাংলাদেশি কাজ করে, ২০১৬ সালে সেদেশের প্রায় ২০০০ জিকা আক্রান্ত ব্যাক্তি শনাক্ত করা হয়। এদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন বাংলাদেশির শরীরেও জিকা ভাইরাস পাওয়া যায়। তাদেরকে ভ্রমণকালে বাড়তি সতর্কতা এবং যৌনমিলন এর সময় বাড়তি সতর্ক থাকতে বলা হয়। যদিও, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মাত্র একজন জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত বলে ২০১৬ এর মাঝামাঝি সময়ে সরকারি ঘোষণায় জানানো হয়।

উপসর্গ ও প্রতিকার

৮০ পারসেন্ট মানুষই কোন উপসর্গ ছাড়াই এই ভাইরাস বহন করতে পারে। এছাড়া ডেংগু বা চিকুনগুনিয়ার মত জর, জয়েন্ট পেইন, র‍্যাশ,শরীরে ব্যাথা ইত্যাদি থাকতে পারে। আক্রান্ত ব্যাক্তির এগুলো ছাড়াও ‘গুলেন বারী সিন্ড্রোম’ নামক প্যারালাইসিস রোগ ও হতে পারে। আর গর্ভকালীন মায়েদের মাধ্যমে শিশুর জন্মগত ছোট মাথা (মাইক্রোকেফালি) হতে পারে।

যেহেতু এর কোন টিকা বা ভ্যাক্সিন নাই তাই প্রতিকার এর চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম।প্রতিরোধ বলতে এডিস প্রজাতির মশা যারা রাতের থেকে দিনের বেলা বেশি কামড়ায় তাদের থেকে দূরে থাকতে হবে। বাসা বাড়িতে পরিষ্কার সচ্ছ পানি এদের আবাসস্থল। এগুলো নষ্ট করতে হবে এবং দিনের বেলাতেও ঘুমের সময় মশারী ব্যবহার করতে হবে।

পরিশেষ

জর হলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা বা শুধু নর্মাল ভাইরাল ফ্লু হলেও প্যানিক না হয়ে বা প্যানিক না ছড়িয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত।

———-

লেখক:

মেডিক্যাল অফিসার,

উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স,

জীবননগর, চুয়াডাঙা

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।