জার্নি ফ্রম স্টেজ শো টু রেড কার্পেট

ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন স্টেজ শো কোরিওগ্রাফার হিসেবে। এরপর ‘জো জিতা ওহি সিকান্দার’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করলেন। কিন্তু নৃত্যপটীয়সী এই তরুনীর গুণের কথা বেশিদিন গোপন রইলো না। সিনেমার নৃত্য পরিচালক ছিলেন বিখ্যাত নৃত্য তারকা সরোজ খান। এই সিনেমার একটি গানে ভিন্ন কিছু চাচ্ছিলেন পরিচালক মনসুর খান।

তখনই সেই তরুনী এগিয়ে এলেন, পরিচালকের মন:পুত হলো। গানের নাম ‘প্যাহেলা নাশা’, সেই থেকে শুরু, একে একে ঢোল বাজনে লাগা, ছাইয়া ছাইয়া, কোয়ি মিল গ্যায়া থেকে ইধার চলা মে উধার চলা, মুন্নি বদনাম, শীলা কি জাওয়ানি – দারুণ সব নৃত্য ভাবনা নিয়ে দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছিলেন,আজ ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সেরা নৃত্যপরিচালকদের মাঝে নিজেকে স্থান করে নিয়েছেন, তিনি ‘ফারাহ খান’।

প্যাহেলা নাশা’’র পর ‘কাভি হাঁ কাভি না’ সিনেমার ‘আনা মেরে পেয়ার কো’ গানের নৃত্য ভাবনা দর্শকদের মুগ্ধ করলো। এরপর জাভেদ আখতারের সুপারিশে অফার এলো বিনোদ চোপড়ার জনপ্রিয় সিনেমা ‘১৯৪২ এ লাভ স্টোরি’র। কিন্তু নায়ক অনিল কাপুরের পছন্দ ছিল সরোজ খান, তবে শেষ পর্যন্ত নৃত্য পরিচালক হিসেবে তিনিই থাকেন। পরবর্তীতে ফারাহ কর্মদক্ষতা দেখে অনিল কাপুর মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।

তবে তাঁর ক্যারিয়ার গঠনে দুইটি গানের নৃত্য পরিচালনা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি  ‘ভিরাসাত’ সিনেমার ‘ঢোল বাজনে লাগা’,গানটা বেশ প্রশংসিত হয়,অর্জন করে নেন প্রথম পুরস্কার।এরপর পরিচালকদের কাছ থেকে বিয়ের গানের কোরিওগ্রাফির ডাক বেশি আসতে থাকে। আরেকটি ‘দিল সে’ সিনেমার ‘ছাইয়া ছাইয়া’ গানের অভিনব নৃত্যভাবনা। এই গানের চিত্রায়নের জন্য চারদিন ট্রেনে কাটিয়েছিলেন, এই গানেই আত্বপ্রকাশ ঘটেছিল আইটেম কন্যা মালাইকা অরোরা খানের।

গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়, পুরস্কৃত ও হন। এছাড়া নব্বই দশকের সুপারহিট সিনেমা ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’র ‘কোয়ি মিল গ্যায়া’ গানের নৃত্য পরিচালক তিনি। এছাড়া ‘দিল তো পাগল হ্যায়’, ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’-সহ আরো বেশ কিছু ছবিতে নৃত্য পরিচালনা করেন। ‘সাপনে’ সিনেমায় প্রভু দেবারও নৃত্য পরিচালনা করেছেন তিনি।

পরবর্তীতে দশকে ছিল নিজের জনপ্রিয়তা ছাড়িয়ে যাওয়ার। কাহো না প্যায়ার হ্যায়, দিল চ্যাহতা হ্যায়, পুকার, ফিজা, কোয়ি মিল গ্যায়ার দারুণ দারুণ গান গুলোতে নৃত্য পরিচালনা করেছেন। নিজের দ্বিতীয় সিনেমার কাজ করার সময় শাহরুখ খানের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। গত দশকের মত এই দশকেও শাহরুখ খানের উল্লেখযোগ্য সিনেমা কাভি খুশি কাভি গাম, অশোকা, জোশ শক্তি: দ্য পাওয়ার, কাল হো না হো, চালতে চালতে, বিল্লু ছবি ছাড়াও নিজের পরিচালত ম্যায় হু না,ওম শান্তি ওম অন্যতম।

‘কাভি খুশি কাভি গাম’-এর ‘বোলে চুড়িয়া’ গানে এক মঞ্চে ছয়জন তারকাকে নাচিয়েছেন। এমনকি ‘ওম শান্তি ওম’-এর সেই তারকাবহুল নাচটিও নিজেই সামলিয়েছেন। ‘দিল চ্যাহতা হ্যায়’ সিনেমার ‘ও লাড়কি হ্যা কাহা’ গানের নাচটিও বেশ দর্শকপ্রিয়। কোয়ি মিল গ্যায়ার ‘ইধার চালা মে উধার চালা’ গানের জন্য পেয়েছিলেন জাতীয় পুরস্কার।

২০১০ সাল ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সুবর্ণ সময়। বছরের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি গান দাবাং সিনেমার ‘মুন্নি বদনাম’ ও ‘তিস মার খান’ সিনেমার ‘শিলা কি জাওয়ানি’র নৃত্য পরিচালক তিনি। এ যেন নিজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, দু’টি গানই পরিপূর্ণতা পেয়েছিল তাঁর নৃত্যের অভিনব মুদ্রায়। ‘তিস মার খান’ যতই সমালোচিত হউক, অন্তত এই ‘শিলা কি জাওয়ানি’তে ক্যাটরিনা কাইফের নাচ দর্শকদের কাছে অতি প্রিয় হয়ে থাকবে, আর ‘দাবাং’ তো বক্স অফিসে রেকর্ড করা সিনেমা,যার অন্যতম সহায়ক এই ‘মুন্নি বদনাম’ গানটি, মালাইকা অরোরার সম্ভবত সর্বশেষ হিট গান।

এছাড়া ফারাহ খানের নৃত্য নির্দেশনায় স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ারের ‘রাধা’ ও ‘দাবাঙ ২’ সিনেমার ‘ফেভিকল’ গানটি বেশ আলোচিত হয়েছিল। সুপারস্টার মাধুরী দীক্ষিত তাঁর সবচেয়ে প্রিয় নায়িকা। তাঁর সাথে অনেক বছর পর ‘ইয়ে জওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি’ সিনেমায় ‘ঘাগড়া’ গানে কাজ করেছেন। সেটাও বেশ জনপ্রিয়তা পায়, দিলওয়ালের ‘গেরুয়া’ গানটিও তাঁর নির্দেশিত। এখন অবশ্য তিনি বলিউডে অনিয়মিত, সর্বশেষ কাজ করেছেন ‘কঙফু ইয়োগা’ ছবিতে।

নৃত্য পরিচালনার বাইরে সিনেমা পরিচালনা করেছেন চারটি, তবে নিজেকে সমাদৃত করতে পারেননি। শেষ দুটো সিনেমা দর্শকমহলে সমালোচিত হয়েছে। বিভিন্ন টিভি রিয়েলিটি শোতে বিচারক হিসেবে কাজ করছেন, অভিনয় ও করেছেন বেশ কটি সিনেমায়, যার মধ্যে অন্যতম ‘শিরি ফরহাদ কি তো নিকাল পাড়ি’।

সুপারস্টার মাধুরী দীক্ষিতই হলেন ফারাহ’র সবচেয়ে প্রিয় নায়িকা। তাঁর সাথে অনেক বছর পর ‘ইয়ে জওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি’ সিনেমায় ‘ঘাগড়া’ গানে কাজ করেছেন। ২০১৩ সালের এই কাজটিও বেশ জনপ্রিয়তা পায়। বলিউডে মুন্নি, শিলা, আনারকলিদের আগমণ হয়েছে তাঁর হাত ধরেই।

বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে একবার জাতীয় পুরস্কার ছাড়াও পেয়েছেন ছয়বার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। ব্যক্তি জীবনে বিয়ে করেছেন শিরিষ কুন্দেরকে। রয়েছে তিনটি জমজ সন্তান। পরিচালক সাজিদ খান তাঁর ভাই হন। ফারাহ আর সাজিদ হলেন ফারহান আখতার ও জয়া আখতারের খালাতো ভাইবোন। ফারহান-জয়ার মা স্ক্রিনরাইটার হানি ইরানী ও ফারাহ-সাজিদের মা মানেকা ইরানী হলেন আপন দুই বোন।

ফারাহ খানের জন্ম ১৯৬৫ সালের নয় জানুয়ারি। ফারাহ-সাজিদের বাবা কামরান খানও চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন। যদিও, দারা সিংয়ের সাথে মিলে তিনি দ্বিতীয় সারির সিনেমাই করতেন। ফারাহদের বয়স যখন মাত্র পাঁচ তখন বাবা-মার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আর মদের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা কামরানের জীবনের প্রদীপ নিভে যায় আগে ভাগেই। বাধ্য হয়েই বয়স হওয়ার আগেই নিজের পায়ে দাঁড়ান ফারাহ আর সাজিদ। সেটা যে তাঁরা খুব সফলভাবেই হতে পেরেছেন, তা আর কে না জানে!

 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।