জাপান মানেই শতভাগ সারপ্রাইজের নিশ্চয়তা!

পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত আর ব্যতিক্রমী দেশগুলোর তালিকা তৈরি করলে জাপানের নাম থাকবে নিঃসন্দেহে ওপরের দিকে। মজার মজার কাজকর্মের জন্য আর ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে জাপানের সুনাম রয়েছে সেই অনেকদিন আগে থেকেই। বেশকিছু ক্ষেত্রে গবেষণা করে জাপান সম্পর্কে নানা তথ্য মিলেছে, যা রীতিমতো বিস্ময় জাগানিয়া।

টোকিও পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ শহর

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট রিসার্চ সেন্টার থেকে স্বাস্থ্য ,নিরাপত্তা, অবকাঠামো ইত্যাদি বিচার করে একটি জরিপ করা হয়েছে যাতে প্রথম স্থান দখল করেছে জাপানের রাজধানী টোকিও। এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে সিঙ্গাপুর এবং তৃতীয় স্থান দখল করেছে জাপানেরই আরেক শহর ওসাকা।

বিস্তারিত দিকনির্দেশনা গাইড

জাপানের যেখানেই আপনি যাননা কেন,পাবেন সব রকম দিকনির্দেশনা। বাসস্ট্যান্ড, পাতাল রেল সবখানেই গাইডের জন্য আছে বিভিন্ন ছবি সংবলিত ম্যানুয়াল, যা আপনিও সহজেই বুঝতে পারবেন। কারণ শুধু স্থানীয়দের জন্য নয়, বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের যাতে এগুলো বুঝতে অসুবিধা না হয়, সেজন্য জাপানিজ ভাষার পাশাপাশি নির্দেশনাগুলো ইংরেজিতেও অনুবাদ করা থাকে।

কমন বার্থডে!

আশ্চর্য লাগলেও ব্যাপারটা কিন্তু সত্যি ঘটে জাপানে। জাপানে বসবাসকারী ৩, ৫ ও ৭ বছরের বাচ্চাদের জন্য প্রতিবছর ১৫ নভেম্বর এক বড়সড় উৎসবের আয়োজন করা হয়, যার নাম শিটি গো সান। নামটার ইংরেজি আক্ষরিক অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, সেভেন ফাইভ থ্রি। বেজোড় সংখ্যাকে জাপানে ম্যাজিকাল নাম্বার হিসেবে ধরা হয়। আর ৩, ৫ ও ৭ বছর বয়স হলো সব শিশুদের বেড়ে ওঠার একটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

সকালের ব্যায়াম

জাপানের সব স্কুলেরই ছাত্রছাত্রী এবং চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ তাদের দিন শুরু করে বিভিন্ন শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে। ১৯২৮ সাল থেকে এই ব্যায়ামের বিষয়টি চালু হয় জাপানে এবং এখনো চলছে। কাজে উৎসাহ ও উদ্দীপনা যোগানো, পরস্পরের প্রতি বন্ধুসুলভ মনোভাবসহ বিভিন্ন মানসিক ও শারীরিক দক্ষতা অর্জনে এই ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলেই বিশ্বাস করে জাপানিজরা।

প্রিমিয়াম ফ্রাইডে

জাপানের মানুষজন কর্মঠ, তা সবাই জানেন। তবে সেখানকার বেশিরভাগ মানুষ প্রতিদিনের বাড়তি কর্মব্যস্ততায় ক্লান্ত হয়ে পড়েন দ্রুতই। এই সমস্যা দূর করতে জাপান সরকার এক বিশেষ উদ্যোগ নেয়, যা প্রিমিয়াম ফ্রাইডে নামে পরিচিত। এই সিস্টেমের কারণে প্রতি মাসের শেষ শুক্রবারে কর্মজীবী মানুষজন তাদের নির্ধারিত সময়ের কিছু আগেই কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারেন। যাতে তারা নতুন উদ্যমে কাজে মনোযোগ দিতে পারেন।

হাজার বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠান

সম্পত্তির স্বত্বাধিকার সম্পর্কিত আইন খুব কঠোরভাবে পালন করা হয় জাপানে। সেজন্যেই বেশকিছু প্রাচীন কোম্পানি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখনো মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হোশি রিয়োকান নামের একটি ঐতিহ্যবাহী জাপানিজ হোটেলের কথা। তারা ৭১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে এখনো ব্যবসা করে আসছে এবং প্রায় ৪৬ পুরুষ ধরে বংশ পরম্পরায় একই পরিবার এই হোটেলের মালিক! অবাক হবার মতোই ব্যাপার!

বন্যপ্রাণীর বিচিত্র বিচরণভূমি

বন্যপ্রাণীর সুরক্ষার ব্যাপারটিকেও সমান গুরুত্বে দিয়ে থাকে জাপান। যেমন জাও ফক্স ভিলেজের কথা বলা যায়। হনশু আইল্যান্ডের মিয়াগিতে অবস্থিত গ্রামটিতে প্রচুর বন্য শেয়ালের বাস, অবশ্য একটি নির্দিষ্ট বেষ্টনির ভেতরে। দর্শনার্থীরা বাইরে থেকে প্রাণীগুলোকে দেখতে আসেন, খাবারও দেন, তবে শিশুদের প্রবেশ নিষেধ।

ঝড়ের গতিতে রাস্তা মেরামত!

আলাদীনের দৈত্যের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? যা চাওয়া হত,নিমিষেই তা করে ফেলত জাদুর দৈত্য। জাপানকে সেদিক থেকে জাদুর দেশই বলা চলে। ২০১৪ সালে ফুকুওকাতে সাবওয়ে বিল্ডিং এর কারণে একটি রাস্তায় ৪৫ ফুট গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়, যদিও সৌভাগ্যবশত কেউ হতাহত হয়নি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, সেই ভাঙা রাস্তা মেরামত করতে কর্তৃপক্ষ সময় নিয়েছিল মাত্র ৪৮ ঘন্টা! চোখ ছানাবড়া হবার মতোন ব্যাপার,তাই না?

কম জায়গায় বেশি সুবিধা

জাপানের লোকেরা সাধারণত ছোট অ্যাপার্টমেন্টে বাস করতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। আর এই কম জায়গাতেই তারা দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো সাজিয়ে নিতে পারেন। যেমন ব্যালকনিতেই বেসিন সিংক লাগানো থাকে, যাতে সহজেই বারান্দায় থাকা ফুলগাছে পানি দেওয়া যায়।

বুলেট ট্রেন

জাপানের হাই স্পিডের শিনকাসেন ট্রেনগুলোকে বুলেট ট্রেন বলা হয়। কারণ এসব ট্রেন ঘন্টায় ২০০ মিঃ গতি তুলতে পারে এবং সেজন্যেই সময়মতো কোথাও পৌঁছানো নিয়ে যাত্রীদের মাথাব্যথাও নেই!

সেলফোন অ্যালার্ট সিস্টেম

জাপান সরকারের পক্ষ থেকে এই সিস্টেম চালু করা হয়। মেসেজের মাধ্যমে অ্যালার্ট সিস্টেম কাজ করে। আধুনিক মোবাইলে বিল্ট ইন আকারেই এ সুবিধা দেওয়া হয় জাপানে এবং জরুরি কোন পরিস্থিতি দেখা গেলেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ডিভাইস থেকে নির্দিষ্ট এলাকায় অ্যালার্ট সিস্টেম চালু হয়ে যায় মাত্র ৪-২০ সেকেন্ডের মধ্যেই।

বাহারি খাবারের সমাহার

জাপানে প্রায় সবরকমের খাবারই আপনি পাবেন, ঐতিহ্যবাহী খাবার ওকোনোমিয়াকি থেকে শুরু করে সাকুরা (ফ্লেভার দেওয়া চকলেট সুইটস) পর্যন্ত। সম্প্রতি লেগো ফ্যানদের জন্য ক্যাফে খোলা হচ্ছে জাপানে, যেখানে আপনি লেগো ব্লকসের আকারের খাবার পাবেন।

সবজিতেও শিল্পকর্ম

জাপানে উদ্ভট সব চিত্রকর্ম আর আর্টের কথা তো সবাই জানেন। এ কাজে তারা ফল, সবজি কোনো কিছুই বাদ দেয়নি! একে জাপানে মুকিমনো আর্ট (সবজি বা ফল কার্ভিং) বলা হয়। স্পেশাল কার্ভিং নাইফ দিয়ে এই কাজগুলো করা হয়।

টুথপেস্টেই ক্যাভিটি নিরাময়

জাপানের বিজ্ঞানী কাজুই ইয়ামাগাশি এমন টুথপেস্ট আবিষ্কার করেছেন যা কিনা দাঁতের ছোটখাটো ভাঙা অংশ সারিয়ে তুলতে পারে। পেস্টের এক প্রকার লিকুইড দাঁতের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে গিয়ে কিছুসময় পরেই কৃত্রিমভাবে ভাঙা অংশ ভরাট করে দেয় অনেকটা প্রাকৃতিক উপাদানের মতোই!

উদ্ভট যত আবিষ্কার

আজব, মজার ও উদ্ভট সব কাজের জন্য জাপান জগদ্বিখ্যাত। মোবাইলের মাধ্যমে কাউকে চুমু খাওয়ার স্মার্টফোন এটাচমেন্ট, বসে থাকা নারীর কোলের মতোন দেখতে বালিশসহ আরো অনেক উদ্ভট জিনিসের দেখা পাওয়া যাবে জাপানের বিভিন্ন শপিং মলে গেলে।

রাজমিস্ত্রীদের সতর্কতা

জাপানের রাজমিস্ত্রীরা খুব সতর্ক। রাস্তা বা বাসস্থান ঠিকঠাক করার সময় আশেপাশে কোনো গাড়ী থাকলে সেটাকে তারা পাতলা প্লাস্টিকের পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেয়, যাতে তাতে কোনোরকম নোংরা না লাগে।

সর্বত্রই শিল্প

জাপানের ম্যানহোলের ঢাকনার ওপর যে চিত্রকর্ম করা সেটা অন্য যেকোনো দেশের জাদুঘরে থাকা চিত্রকর্মকেও হার মানাবে।

জাপানের স্কুল

জাপানের স্কুলগুলো খুব সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যেমন,এসব স্কুলে গ্রেডিং সিস্টেম নেই। সেখানকার শিক্ষকেরা প্রত্যেকেই ছাত্রছাত্রীদের মাঝে পড়ার আগ্রহ তৈরিতেই বেশি গুরুত্ব দেন। স্কুলে ফোন ব্যবহারেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। যদি ছাত্রদের কেউ মোবাইল ব্যবহার করা অবস্থায় ধরা পড়ে, তবে অভিভাবক নিয়ে এসে সেই ফোন আবার সংগ্রহ করতে হয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। আর মজার ব্যাপার হল, জাপানের স্কুলগুলোতে কোন পরিচ্ছন্নতা কর্মী নেই। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার কাজগুলো করে শিক্ষার্থীরাই।

– ব্রাইট সাইড অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।