চিরসবুজ একজন রাজপুত্র

সময়টা সম্ভবত সত্তরের দশকের শেষের দিকে। এক অনুষ্ঠানে ‘র‌্যাম্বলিং স্টোনস’ নামের একটি ব্যান্ড দল গান করছিলো। তাদের সঙ্গে এক সুদর্শন যুবকও গান গাচ্ছিলেন। অনুষ্ঠানে ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রবাদ পুরুষ খান আতাউর রহমান। যুবকের গান ও স্টাইলিশ অঙ্গভঙ্গি তাকে বেশ মুগ্ধ করে। অনুষ্ঠান শেষে তিনি সম্ভাবনাময় ওই যুবককে সরাসরি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন। যুবকটিও আগ-পিছ না ভেবে সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন। এরপর, ১৯৬৮ সালে চিত্রনায়িকা কবরীর বিপরীতে ‘আপন পর’ ছবির মধ্যদিয়ে বড় পর্দায় আগমন ঘটে ওই যুবকের।

নিশ্চিত এখনো অনেকেই বুঝতে পারছেন না— আমি কার কথা বলছি। কারণ, নতুন প্রজন্মের বড় একটা অংশের কাছে তার নামটি আজও প্রায় অজানা। তিনি আর কেউ নয়, আমাদের চিরসবুজ নায়ক— জাফর ইকবাল। আশির দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়কদের একজন, কারো কারো মতে তিনিই সবচেয়ে জননন্দিত। তাকে বলা হতো ‘রাজপুত্তুর’। কেউবা বলতো ‘রোমিও’। স্রেফ নায়কই ছিলেন না, বরং একাধারে ছিলেন নায়ক, গায়ক, গিটারবাদক ও মুক্তিযোদ্ধা।

বাংলা চলচ্চিত্রের এই মহানায়কের শুরুটা মূলত গান দিয়ে। খুব ভালো গিটার বাজাতে পারতেন তিনি। সেই সময়ের বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী এলভিস প্রিসলি ছিলেন তার আইডল। প্রিসলির দারুণ ভক্ত ছিলেন তিনি, স্কুল বা কোথাও কোনো ফাংশন হলে গিটার বাজিয়ে প্রিসলির গানের অনুকরণ করতেন। তার বাড়িতেও গানবাজনার রেওয়াজ ছিল। বোন শাহনাজ রহমতুল্লাহ একজন সুপরিচিত কণ্ঠশিল্পী। বড় ভাই আনোয়ার পারভেজও নামকরা শিল্পী। গানের প্রতি তার অজস্র অনুরাগ ছিলো। সেই অনুরাগ থেকেই ১৯৬৬ সালে বন্ধু তোতা, মাহমুদ ও ফারুককে নিয়ে পাশ্চাত্য আবহে গড়ে তোলেন ব্যান্ড দল ‘র‌্যাম্বলিং স্টোনস’।

নায়ক হিসেবে তিনি মানুষের কাছে যতোটা জনপ্রিয়, গায়ক হিসেবেও নাম-ডাক ঠিক কোনো অংশে কম ছিলো না। ‘পিচঢালা পথ’ নামের একটি সিনেমায় প্রথম কণ্ঠ দেন। এরপর প্লেব্যাক করেন ‘ফকির মজনু শাহ’ ছবিতে, আলাউদ্দিন আলির সুর ও সঙ্গীত পরিচালনায় আরেক কিংবদন্তি রুনা লায়লার সঙ্গে।

১৯৮৪ সালে বড় ভাই আনোয়ার পারভেজের সুরে ‘বদনাম’ ছবির ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’ গানেও কণ্ঠ দেন। তাছাড়া আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘কেন তুমি কাঁদালে’ শিরোনামে একটি অডিও অ্যালবাম প্রকাশ করেন, যেটা ওই সময়ে ভালো শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছিলো। কিছুদিন পর গানের জগত ছেড়ে চলচ্চিত্রের বাসিন্দা হলেন, কিন্তু গান তাকে ছেড়ে যাননি।

সত্তরের দশকে চলচ্চিত্রে অভিষেক হলেও এই কিংবদন্তি মূলত জনপ্রিয়তা পেয়েছেন আশির দশকে। মুক্তিযুদ্ধের আগে তিনি কবরীর বিপরীতে ওই একটি ছবিই করেছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শুরু হয়ে গেলে জাফর ইকবাল চলচ্চিত্র ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তিনি আবার চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন।

শহুরে, রোমান্টিক থেকে শুরু করে অমিতাভ বচ্চনের মতো রাগী তরুণের ভূমিকা-সহ প্রায় সব ধরনের চরিত্রে ছিলো তার অবাধ বিচরণ। বিশেষ করে, জীবন-যন্ত্রণায় পীড়িত বিপথগামী তরুণের চরিত্রে তিনি ছিলেন পরিচালকদের পছন্দের শীর্ষে। সামাজিক প্রেমকাহিনী কিংবা গ্রামীণ তরুণের চরিত্রেও স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন। ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মাস্তান’ ছবিটির কথা বলতেই হয়, এই ছবিটি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক ছিলো।

জাফর ইকবালের ক্যারিয়ার ওই অর্থে খুব বেশি বড় ছিলো না। তারপরও তিনি মোট ১৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। যার বেশিরভাগই ছিলো ব্যবসা সফল। ১৯৮৯ সালে মুক্তি পায় তার অভিনীত ও আজহারুল ইসলাম খান পরিচালিত ‘অবুঝ হৃদয়’। ত্রিভূজ প্রেমের এ ছবিটি দর্শক ও সমালোচক উভয়ের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। তাছাড়া চম্পা ও ববিতা— দুই বোনের বিপরীতে তার অভিনয়, তাকে এক অন্যন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

ধীরে ধীরে ববিতার সঙ্গে তার ভালো একটা জুটি গড়ে ওঠে। ওই সময় জাফর ইকবাল-ববিতা জুটির ছবি মানেই ছিলো সুপার হিট। এই জুটির বাস্তব জীবনেও প্রেম ছিলো বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে আছে। ফিল্মপাড়ায় নাকি তাদের প্রেম ওপেন সিক্রেটের মতো ছিলো। এবং এগুলো ওই সময়ের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পেতো গুরুত্ব-সহকারে। বিশেষ করে, ‘অবুঝ হৃদয়’ সিনেমার ‘তুমি আমার জীবন’ গানে ববিতার সাথে তার রসায়ন বেশ সমালোচনার জন্ম দেয়। ববিতা সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি প্রায় ৩০টি ছবিতে অভিনয় করেন।

সবমিলিয়ে তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো— ‘ভাই বন্ধু’ ‘চোরের বউ’ ‘অবদান’ ‘সাধারণ মেয়ে’ ‘একই অঙ্গে এত রূপ’ ‘ফকির মজনুশাহ’, ‘দিনের পর দিন’ ‘বেদ্বীন’ ‘অংশীদার’ ‘মেঘবিজলী বাদল’ ‘সাত রাজার ধন’ ‘আশীর্বাদ’ ‘অপমান’ ‘এক মুঠো ভাত’ ‘নয়নের আলো’ ‘গৃহলক্ষ্মী’ ‘ওগো বিদেশিনী’ ‘প্রেমিক’ ‘নবাব’ ‘প্রতিরোধ’ ‘ফুলের মালা’ ‘সিআইডি’ ‘মর্যাদা’ ‘সন্ধি’ ইত্যাদি।

১৯৫০ সালে ঢাকার গুলশানে জন্মগ্রহণ করা এই কিংবদন্তির অভিনয়ের যুগটা ছিলো বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী সময়। তখন সিনেমায় অভিনয় করতেন রাজ্জাক, ফারুক, আলমগীরের মতো তারকারা। কিন্তু জাফর ইকবাল সব কিছুতেই তাদেরকে ছাড়িয়ে যান। নিত্য নতুন ফ্যাশন, অসাধারণ অভিনয় আর রোমান্টিক লুক— সব মিলিয়ে তার হাত ধরে বাংলা সিনেমায় নতুন এক যুগের সূচনা হয়।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, যখন বাংলা সিনেমার আকাশে নক্ষত্র হয়ে জ্বলজ্বল করছিলেন, তখনই হঠাৎ করে আশার প্রদীপ নিভে গেলো। জানা যায়, তিনি ছিলেন বেশ খামখেয়ালী, আবেগপ্রবণ এবং অভিমানী টাইপের মানুষ। অনিয়মিত জীবনযাপন ও অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে তার হৃদযন্ত্র ও কিডনি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবং পরবর্তীতে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। ১৯৯১ সালের ২৭ এপ্রিল ভক্তদের কাঁদিয়ে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সেই পাড়ি জমান সব সীমানার উর্দ্ধে।

এবার নিয়তির একটা নির্মম পরিহাসের কথা বলা যাক। জীবদ্দশায় এই রাজপুত্রের সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ছিলো ‘লক্ষ্মীর সংসার’। এ ছবির একটি দৃশ্যে— জাফর ইকবাল গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে নতুন আসেন, এবং আজিমপুর যাওয়ার রাস্তা খুঁজতে থাকেন। কিন্তু বিধির কি বিধান! এই ছবি মুক্তির এক মাসের মাথায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং আজিমপুর কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন।

আজকে এই চিরসবুজ নায়কের জন্মদিন। শুভ জন্মদিন রাজপুত্র! ওপারে ভালো থাকুন, অনন্তকাল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।