চিন্তা নাড়ানো সম্ভাবনার গল্প অরিজিন

থ্রিলারপ্রেমীদের কাছে ড্যান ব্রাউন একটি অতিপরিচিত নাম। গত অক্টোবরে বেরিয়েছে তাঁর সৃষ্টি বিখ্যাত ‘সিম্বলজিস্ট প্রফেসর রবার্ট ল্যাংডন’ সিরিজের পাঁচ নম্বর কিস্তি ‘অরিজিন’। যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হবার মাত্র একুশ দিন পর বাতিঘর প্রকাশনী বইটির অনুবাদ বাংলাদেশের বাজারে আনে। অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন এবং সালমান হক। আমি এই অনুবাদেরই পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখতে যাচ্ছি। বইটির মুদ্রিত মূল্য ৪০০ টাকা।

প্রথমেই অনুবাদের মান নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। অনুবাদ যথেষ্টই সাবলীল, পড়ার সময় আরোপিত বলে মনে হয় না। তবে বই প্রকাশে তাড়াহুড়োর ছাপ বইটিতে কিছুটা আছে। হ্রস্ব-ই কার এবং দীর্ঘ-ই কারের যথেচ্ছ ব্যবহার চোখের জন্য কিছুটা পীড়াদায়ক। এছাড়া প্রচ্ছদ বেশ ভালো লেগেছে,সুন্দর ডিজাইন। বইটি হার্ডকভারের এবং হোয়াইট প্রিন্টে ছাপানো। সব মিলিয়ে গেট-আপ খুবই ভালো।

এবার কাহিনী প্রসঙ্গে আসি। ড্যান ব্রাউনের সৃষ্টি করা বিখ্যাত চরিত্র ‘সিম্বলজিস্ট প্রফেসর রবার্ট ল্যাংডন’। প্রফেসর ল্যাংডন বিশ্ববিদ্যালয়ে সিম্বলজি পড়ান। প্রাচীন শিল্প এবং ধর্মীয় সিম্বল খোঁজা ও ব্যাখ্যা করাই তাঁর কাজ। এসব করতে গিয়েই বিভিন্ন সময় নানারকম রহস্য উদঘাটনে তিনি জড়িয়ে পড়েছেন। এই বইয়েও সেরকম একটি রহস্যভেদ করতে চলেছেন তিনি।

এই সিরিজের আগের চারটি বই থেকে ‘অরিজিন’ কিছুটা ভিন্ন। আগের বইগুলোর মত একদম মাথা ঘুরিয়ে দেয়া কোন আবিষ্কার প্রফেসর ল্যাংডন নিজে করেননি, বরং এই কাহিনী এগিয়েছে ল্যাংডনের পুরোনো ছাত্র এডমন্ড কিয়ার্শের আবিষ্কার নিয়ে।

এডমন্ড কিয়ার্শ একজন ফিউচারিস্ট এবং প্রযুক্তিবিদ। তিনি একজন শিল্প ও সিম্বল অনুরাগীও বটে। গণিতের গেম থিওরি তাঁর কাজের ক্ষেত্র। এই গেম থিওরি ব্যবহার করে সঠিক ভবিষ্যতবাণী করা যায়।কিয়ার্শ যে কয়টি ভবিষ্যতবাণী প্রকাশ করেছেন তার সবকয়টিই মিলে গিয়েছে। এবার স্পেনের বিলবাও শহরে কিয়ার্শ তাঁর নতুন আবিষ্কারের ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। বিশাল এক বিতর্কের সৃষ্টি হতে যাচ্ছে এই ঘোষণার মাধ্যমে। কিয়ার্শ আবিষ্কার করেছেন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন ও সবচেয়ে বেশি খোঁজা দু’টি প্রশ্নের উত্তর। এই আবিষ্কার নাকি পৃথিবী থেকে মুছে দেবে ধর্মের অস্তিত্ব! এই ঘোষণার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন প্রফেসর রবার্ট ল্যাংডন।

অদৃশ্য একটি পক্ষ সক্রিয় হয়ে উঠল এই অনুষ্ঠান পণ্ড করে দিতে। অনুষ্ঠান শুরু করেও আবিষ্কারের ঘোষণা পর্যন্ত আসতে পারলেন না এডমন্ড কিয়ার্শ। প্রেজেন্টেশনের মাঝপথেই প্রফেসর ল্যাংডনের চোখের সামনে খুন হয়ে গেলেন তিনি। কিয়ার্শের প্রেজেন্টেশনের বাকি অংশ রয়েছে তাঁর একটি গোপন সার্ভারে যেটার পাসওয়ার্ড কিয়ার্শ ছাড়া কেউ জানে না! এই পাসওয়ার্ডের সংকেত রয়েছে ইতিহাস, আধুনিক শিল্পকলা ও প্রযুক্তির এক গোলকধাঁধায়। ল্যাংডন নামলেন এই পাসওয়ার্ড ও সার্ভারের খোঁজে। সঙ্গী হিসেবে পেলেন এম্ব্রা ভিদাল ও কিয়ার্শের তৈরী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুপার কমপিউটার ‘উইনস্টন’-কে।

কাহিনী আপনাকে বারবার ইঙ্গিত দেবে একটি ভীষণ শক্তিশালী প্রতিপক্ষের। এতটাই শক্তিশালী যে স্পেনের রাজপরিবার পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণে। বারবার রাজশক্তি ল্যাংডনের এই খোঁজে বাঁধা দেবে। তার সাথে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, শাসনব্যবস্থায় চার্চের হস্তক্ষেপ এবং রাজতন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ।

আস্তে আস্তে পাঠকের সামনে তৃতীয় আরেকটি পক্ষ স্পষ্ট হবে। এই তৃতীয় পক্ষকে সবজান্তা কিন্তু কেউই তৃতীয় আরেকটি পক্ষ যে আছে সে সম্পর্কে সচেতন হবে না। পাঠক মনে মনে একজন নির্দিষ্ট ভিলেনের ছবি এঁকে ফেলবেন, একসময় স্বস্তিও পাবেন অনুমান মিলে যাওয়ায় কিন্তু তখনই কাহিনীর সর্বশেষ টুইস্ট আপনাকে ভীষণ চমকে দেবে! তৃতীয় পক্ষ সবসময় পাঠকের সামনেই থাকবেন কিন্তু পাঠক চিনতে পারবেন না।

সব শেষে পাঠক পাবেন সেই দুইটি প্রশ্নের উত্তর। খুব চেনা দুইটি প্রশ্ন এবং উত্তরও খুব পরিচিত। কিন্তু উপস্থাপনার গুণেই লেখক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন এগুলো কতটুকু বাস্তব এবং বাস্তবেই আমরা কতটুকু ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হতে যাচ্ছি নিকট ভবিষ্যতে!

‘অরিজিন’ সম্ভাবনার কাহিনী। অতীতের বিভিন্ন ঘটনার সম্ভাবনা ও ভবিষ্যত পৃথিবীর রূপই ‘অরিজিন’ পাঠকের সামনে তুলে ধরে। এটা গল্প হলেও প্রসঙ্গগুলো ভীষণ বাস্তব। এটা পাঠকের চিন্তায় নাড়া দিয়ে যায়,নতুন ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।