ঘুড্ডি: সময়কে পেছনে ফেলা আধুনিক চলচ্চিত্র

১৯ ডিসেম্বর, ১৯৮০। প্রায় চার দশক আগে ঢাকাই যে চলচ্চিত্র উত্তর আধুনিকতার ছোঁয়া নিয়ে মুক্তি পায় সেটা ছিলো সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী পরিচালিত ‘ঘুড্ডি’।

বুদ্ধিজীবী হারানো সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের কোন চলচ্চিত্রে এমন সহজ ধারাবাহিকতা, উদ্ভাবনী ও জটিল চলচ্চিত্র কৌশল ও আবহ সঙ্গীতের এমন দুর্দান্ত ব্যবহার দেখা যায়নি। গতানুগতিক ছবির কাঠামো কিছুটা অনুসরণ করেও ছবিটি পরিপূর্ণ ছিলো শক্তিশালী রাজনীতি দৃষ্টিভঙ্গি ও শিল্প সাহিত্যের অমিয় রসে।

তৎকালীন বাণিজ্যিক ছবিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সালাহউদ্দিন জাকীর এই ঘুড্ডি নির্মাণ যে সেই সময়ের দর্শক মেনে নিতে পারবে না তা তিনি তার ছবিতে নিজেই প্রধান চরিত্র আসাদকে দিয়ে বলিয়েছেন। তবুও সাহসের সাথে এই দেশের চলচ্চিত্র দর্শকদের তিনি দিতে চেয়েছিলেন ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্রের এক নতুন ধারা। কিন্তু, দুর্ভাগ্য এই ২০১৮ সালের দর্শকরাই ব্যর্থ হচ্ছে ছবিটি থেকে এর মূল রস আস্বাদনে। তবে কিভাবে ৩৮ বছর আগের দর্শকরা সহজে মেনে নিবে বাস্তবতার অলঙ্কারে সজ্জিত এই চলচ্চিত্র।

ছবিটি সম্পর্কে যত কথাই বলার থাকনা কেন, বারবার চলে আসবে পরিচালক সালাহউদ্দিন জাকীর কথা। এই চলচ্চিত্রটি দেখলে সবচেয়ে প্রধান যেই দিকটি লক্ষণীয় তা হচ্ছে ২ ঘণ্টা ২০ মিনিটের এই চলচ্চিত্রের জন্য কি বিশদ ‘লেখাপড়া’ পরিচালক করেছেন। বর্তমান পরিচালকদের কাছে এটা কেবলই একটি হাস্যকর টার্ম।

সালাহউদ্দিন জাকী ছবিটির জন্য এমন এমন চরিত্র নির্বাচন করেছেন যারা বর্তমান সময়ে হয়ে উঠেছেন এক একজন কিংবদন্তি। তার দূরদর্শী জহুরী চোখ সেই সকল অভিনেতাদের ভেতর আতশ কাচ ছাড়াই দেখে ফেলেছিলেন। অনুমান করে ফেলেছিলেন তাদের গভীরতা, মেপে ফেলেছিলেন তাদের অভিনয় মাত্রা।

ঘুড্ডি নির্মাণে, তার প্রথা ভাঙার সূচনা আওয়াজটা আসে যখন তিনি ছবিতে প্রত্যেকটি চরিত্রের নাম তাদের আসল নামেই রাখেন। হয়ত এর আগে কখনো এটা ভাবাও যায়নি।

ছবিতে প্রধান চরিত্রটি চিত্রায়িত হয়েছে একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধার বেকার জীবন ও তার অভিলাষী প্রেম নিয়ে। চরিত্রটি সার্থক রুপায়ন করেছেন বাস্তব মুক্তিযোদ্ধা রাইসুল ইসলাম আসাদ। নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সুবর্ণা মুস্তাফা। এই ঘুড্ডি সুবর্ণাকে জীবন নাটাইয়ে বাঁধতে গিয়েই এগিয়ে চলে আসাদের জীবন ও চলচ্চিত্রের মূল গল্প।

ছবিতে আরও আছেন, নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। তাকে অল্প সময়ের জন্য দেখা যায় আসাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে। সুবর্ণার কাজিন হিসেবে আছেন তারিক আনাম খান, আসাদের বন্ধু নায়লা আজাদ নূপুর, সুবর্ণা বা ঘুড্ডির বাবা সৈয়দ হাসান ইমাম। এছাড়াও দুটি বিশেষ চরিত্রে আছেন দুই কিংবদন্তি। ছবিতে মাঝির চরিত্রে আছেন গোলাম মোস্তফা আর ঘুড্ডির বিশ্ববিদ্যালয়য়ের বন্ধু হিসেবে দেখা যায় ক্ষণজন্মা শিল্পী হ্যাপি আকন্দকে।

নাম গুলো পড়া মাত্রই চোখে ভেসে উঠে এক একজন কীর্তিমানের নাম। যারা নিজেরাই একজন এক একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ৩৮ বছর আগে পরিচালকের এমন চরিত্র নির্বাচন খুব সহজেই প্রশংসার দাবীদার।

এরপর কথা বলতে হয় চলচ্চিত্রে ব্যবহারিত আবহ সঙ্গীত বা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নিয়ে। সিনেমা শুরুর একদম প্রথম দৃশ্যে আসাদ যখন সিগারেট জ্বালাতে নেয় তখন এমন দৃঢ়, মস্তিষ্কে লাগা শব্দে ব্যবহার যেনো শুরু থেকেই পরিচালক দর্শককে সজাগ রাখতে চায়। এরপর যতবারই ক্লাইমেক্স দৃশের অবতারণা ঘটেছে ততবারই পরিচালক ব্যবহার করেছেন দুর্দান্ত আবহ সঙ্গীত যাতে স্পষ্ট পশ্চিমা ছোঁয়া।

সালাহউদ্দিন জাকীর এই ছবির চরিত্র নির্বাচনের পর সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি হচ্ছে এর সংলাপ। এর জন্য অবশ্য ছবিটি তার প্রাপ্য সম্মান পেয়েছে। সেবার ‘ঘুড্ডি’ সংলাপের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। এত গভীর, ভারী ও তাৎপর্যপূর্ণ সংলাপের প্রাচুর্যপূর্ণ ব্যবহার ছবিটিকে যদিও সাধারণের থেকে দূরে নিয়ে গেছে কিন্তু একটুও দুর্ভেদ্য করেনি, বরং এর শিল্পগুণ আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। আসাদ ও ঘুড্ডির সোনারগাঁ দূর্গের দু’জনের যে মোহাচ্ছন্ন সংলাপ বিনিময় তা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আজ অবধি কোন ছবিতে আছে বলে মনে হয় না।

ঘুড্ডি ছবিতে আসাদ একজন বেকার, এবং তার স্বভাব বেপরোয়া, ছন্নছাড়া গোছের। প্রায়ই স্থানীয় ঢাকার আটপৌরে ভাষায় অশুদ্ধ উচ্চারণ নিয়ে কথা বললেও সে শিক্ষিত এবং উঁচু মানের শিল্পের প্রতি তার আকর্ষণ রয়েছে। একই সাথে সাহিত্য জ্ঞান ও ইংরেজিতে কথা বলার ধরণও বেশ মার্জিত।

কিন্তু এই বেকারত্ব বা বোহেমিয়ান জীবন তাকে যাতনা দেয় না। দমিয়ে রাখতে পারেনা তার প্রাণচাঞ্চল্যকে। প্রতিটি দৃশ্যে তার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি সর্বদাই লক্ষ্যনীয়।

আসাদের মুখ ভর্তি দাড়ি গোফের গেটআপে বোহেমিয়ান তরুণের যে ছাপ আছে, তার কাছে সেটা স্মার্ট। তার ঝাকড়া চুল, সানগ্লাস, ভ্যাগাবন্ড ইমেজ আর কাব্যিক কথাবার্তায় ঘ্রাণ আসে মুক্ত স্বাধীনতা বিশ্বাসী এক তারুণ্যর।

কিন্তু এক নিমিষেই ধনী হতে চাওয়া আসাদ খোঁজ করতে থাকে রাজ্যসহ রাজকন্যার। আর সেই মত পেয়েও যায়। তার সাথে দেখা হয় ঘুড্ডির। আসাদ নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেয় মোহাব্বত আলী নামে। আর এখান থেকেই আসাদের দ্বিতীয় সত্তার পথ চলা শুরু।

ঘুড্ডি প্রাচুর্যের প্রাচীরের মধ্যে বড় হওয়া মেয়ে, যে নিজেকে বন্দী হিসেবেই দেখতে পায় এবং যে আসাদের ক্রমাগত মিথ্যে কথায় বিশ্বাস করে যায়। কারণ সে আসাদের মিথ্যা রাঈস লুকে ইমপ্রেস হলেও সে তার মাঝে খুঁজে পায় মুক্তির ঘ্রাণ।

ছবিতে ঘুড্ডি এক সংলাপে বলে , ‘আমি ব্যস্ত মানুষ অনেক ঘৃণা করি’ সে তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে এই কথাটি বলে। আর তাই আসাদের মুক্ত জীবন তাকে আকর্ষিত করে।

বিপরীতমুখি এই দুই চরিত্রের আসাদ এবং প্রথম মুক্তির স্বাদ পাওয়া ঘুড্ডির মধ্যকার প্রেমের সম্পর্কের বিভিন্ন দৃশ্যের মাধ্যমে পরিচালক তুলে ধরেন বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের একটা চিত্র ফুটে উঠে ছবির সংলাপে, চরিত্রগুলোর মাধ্যমে এবং ঘটনাপ্রবাহে।

কিন্তু আসাদের মিথ্যা রাজপ্রাসাদ যে খুব সহসাই সত্যের আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হতে যাচ্ছে তার সেই অনুমান থাকলেও সে প্রস্তুত ছিলো না। কিন্তু প্রকৃতি আপন নিয়মে চলে, ঘুড্ডি জেনে যায় মিথ্যা প্রাচুর্যের সাজ নিয়ে চলছিলো মহাব্বত আলী অর্থাৎ আসাদ।

আসাদ ঘুড্ডির মুখোমুখি হতে ভয় পায়। ঘুড্ডির সামনেই নদীতে ঝাপ দিয়ে স্রোতের গতিতে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়, আর মিথ্যা শহরের খোলস থেকে বেড়িয়ে প্রকাশিত হয় মুক্ত আসাদে।

মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই আসাদ বারবার একটি সংলাপে বলে, আমি খুঁজছি, কি যে খুঁজছি সেটাই খুঁজছি। এতে গভীর মানসিক জীবন দর্শণ অন্তর্নিহিত আছে। আসাদ নিজে মিথ্যা সত্তা থেকে মুক্ত হয়ে বলে, ‘আমিও তো মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। তখন পরাধীন ছিলাম আর এখন কি? খুব বেশি পার্থক্য আছে কি? আমি কি মুক্ত?’

ছবির শেষ দিকে যখন ঘুড্ডি জেনে যায় আসাদের প্রকৃত পরিচয়, তখন তারিককে লেখা এক চিঠিতে আসাদ জানায়, ‘আমি জানি ও জেনে ফেলেছে আমার ধার-করা পোষাকের ইতিহাস। কিন্তু পোষাকের নীচে আমি তো সত্যি, আমার ভালোবাসা তো সত্যি।’

এদিকে আসাদের মিথ্যা মেনে নিতেও সংকোচ করে ঘুড্ডি। আবার আসাদের বিরহে বারাবার নিজের ভেতর নিজে মূর্ছা যায় সে। এগিয়ে আসে বন্ধু তারিক। ফিরে যেতে বলে আসাদের কাছে।

ছবির শেষ দৃশ্যের দুই চরিত্রের মিল অন্য সকল ছবির মত সহজ সমাধান হলেও। এখানে ছিলো মুক্তির ভিন্ন স্বাদ। মিথ্যা থেকে মুক্তি। ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যায় ঘুড্ডির সাথে বসা নৌকায় খালি গায়ে আসাদকে। ধার করা পোষাক সে ছুড়ে ফেলেছে আর প্রয়োজন নেই তার। ‘ঘুড্ডি’তেও সত্যের জয় হয়েছে তবে এমন দার্শনিক ও মানবিক আবেদন যুক্ত খুব কম দেখা গেছে।

‘ঘুড্ডি’তে সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী এমন গান ও আবহ সঙ্গীতের মার্জিত ব্যবহার, শট ধারণের ক্যামেরার অর্থবহ কিন্তু জটিল ও উদ্ভাবনী কৌশল প্রয়োগ, নিজের ছবিতে নিজেকেই সাহসী সমালোচনা আর ‘এক্সপ্লিসিট টিচিং মেথড’ (যখন ছবির কোন চরিত্র দর্শককে উদ্দেশ্য করে সরাসরি কোন রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়) কৌশলের ব্যবহার ছবিটিকে একটি মাস্টারপিসে রুপান্তর করেছে।

আধুনিকতা ও বাণিজ্যিক নামধারী সিনেমাকে চপেটাঘাত করা ৩৮ বছর আগের ঘুড্ডি বাংলা চলচ্চিত্রের আগামী দুই দশকেও আধুনিক সিনেমা হয়েই থাকবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।