গেম অব বিবাহ || রম্যগল্প

আমার হাতে একটা ভালো পাত্র এসেছে, বিসিএস ক্যাডার৷ মাত্রই চাকরি পেয়ে বিয়ের বাজারে নেমেছে দামি থলে হাতে। ভালো ফ্যামিলির মেয়ে খুজছে, সাথে শিক্ষিতা ও সুন্দরী। পাত্রের খোজ এনেছে আমার আম্মু। আম্মুর বান্ধবীর ভাইয়ের ছেলে সে। নাম সিয়াম। উচা লম্বা, দেখতে শুনতেও খারাপ না।

আম্মু খেতে বসে আমাকে বললেন, ভালো কোনো মেয়ের খোজ থাকলে আমি যেন তাকে জানাই৷ আমার ভার্সিটির কেউ আছে কিনা, অথবা বন্ধুদের বোন। আমি অনেকক্ষণ চিন্তাভাবনা করার পর মনে মনে যে মেয়েটাকে ঠিক করলাম, সে একদম পারফেক্ট। অন্তত একজন বিসিএস ক্যাডার পাত্রের জন্য তো অবশ্যই৷ পড়ছে একটা নামকরা পাবলিক ভার্সিটিতে, অসম্ভব সুন্দরী। লম্বায় ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি।

মেয়ের বাবা শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের বড় কর্মকর্তা হিসাবে রিটায়ার্ড করেছেন বছরখানেক হলো। এক ভাই ডাক্তার, আরেক ভাই সুপ্রিম কোর্টের উকিল। মেয়ের নাম বিন্তি। এটা ডাকনাম, ভালো নাম ফারহিন নাহার৷ মেয়ের বাসা থেকে আপাতত বিয়ের ব্যাপারে কোনো কথাবার্তা হচ্ছে না, কিন্তু আমি শিওর বিসিএস ক্যাডার পাত্র হলে তারা অবশ্যই রাজি হবে।

আগের জামানায় রাজকুমারদের যেমন কোনো বাবা মেয়ে দিতে অরাজি হতো না, তেমনি এই জামানার রাজকুমার হলো বিসিএস ক্যাডাররা। যারা রাজকীয় আস্তাবলের ঘোড়া না পেলেও, সরকারি গাড়ি পায়। প্রজাদের কাছ থেকে কর না পেলেও, জনগনের থেকে প্রচুর ঘুষ পায়।

আমি আম্মুকে বললাম, একটা মেয়ে আছে পরিচিত। দাড়াও ছবি দেখাই। ডান হাত দিয়ে ভাত খেতে খেতে বা হাত দিয়ে ফোন বের করলাম পকেট থেকে। ফেসবুকে গিয়ে বিন্তির আইডি থেকে ছবি বের করে আম্মুর সামনে ধরলাম। নিজের অজান্তেই আম্মুর মুখ দিয়ে যে শব্দটা বের হলো, সেটা- ওয়াও৷ আম্মু মুগ্ধ হয়ে অনেক্ক্ষণ মেয়েটাকে দেখার পর বললেন, ‘এই মেয়ের সাথে যেকরেই হোক আমি সিয়ামের বিয়ে দেব। তুই এর বাসার ঠিকানা আর অবিভাবকের ফোন নাম্বার দে আমাকে।’

আমি আচ্ছা ঠিক আছে বলে ভাতের মধ্যে হাত ধুয়ে উঠে পড়লাম।

আম্মু অবাক হয়ে বললেন, ‘কি রে, খাওয়া শেষ করলি না?’

আমি না সূচক মাথা নাড়লাম, ‘খিদে নাই।’

আম্মুকে কিভাবে বোঝাই যে আমার গলা দিয়ে আর একটা ভাতও নামবে না৷ যে মেয়ের বিয়ে ঠিক হতে যাচ্ছে বিসিএস ক্যাডারের সাথে, সেই বিন্তি মেয়েটা যে আমার জীবনের সবকিছু। আমার প্রেমিকা৷

বিন্তির সাথে আমার চার বছরের প্রেম। প্রেমের শুরুটা বেশ অদ্ভুত। ও তখন ইন্টার পড়ে আর আমি সবে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। ভার্সিটির হলে আমার রুমের এক বড় ভাই বিন্তিকে প্রাইভেট পড়াতেন। হঠ্যাৎ উনার বাবা মারা যাওয়াতে দীর্ঘদিনের জন্য গ্রামে যাওয়া লাগলো৷ সেই ভাই-ই আমাকে মাসখানেকের জন্য বিন্তিকে পড়ানোর দায়িত্ব দিয়ে যান।

প্রথমদিনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমাকে এক গ্লাস শরবত আর দুইটা শিঙারা দেয়া হয় নাস্তা হিসাবে। শরবতের স্বাদটা কেমন তিতকুটে ছিলো। আমি এক নিঃশ্বাসে গ্লাস শেষ করে দেয়ার কিছুক্ষণ পর বিন্তির আম্মু এইঘরে এসে বলেন, ‘স্যরি, আজই তোমার টিউশনির লাস্ট ডেট।’

আমি অবাক হই। কি বলবো বুঝে উঠতে পারিনা। আমাকে চুপ দেখে বিন্তির আম্মু আবার নিজে থেকেই বলেন, ‘আসলে আমার ছোট নাতি শরবতের গ্লাসের মধ্যে চিনি ভেবে তেলাপোকা মারার ঔষধ গুলায়ে ফেলছে একটু আগে। আমি বিন্তিকে মানা করব বাট তার আগেই তোমাকে দিয়ে দিছে। মনে হয়না তুমি এযাত্রায় বেঁচে যাবা। খুব কড়া বিষ। এদিকে বিন্তির পরীক্ষার আর মাত্র দুই মাস আছে। এখন আরেকটা ভালো স্যার কই যে পাই। তোমার চেনাজানা কেউ থাকলে দ্রুত বলো। বিষের রিয়্যাকশন যেকোনো সময় শুরু হয়ে যেতে পারে।’

আমার মাথার মধ্যে চক্কর দিয়ে ওঠে। আমি চেয়ার থেকে পড়ে যাই। নিজেকে অনেকক্ষণ পর আবিস্কার করি হাসপাতালের বিছানায়৷ ওয়াশ করা হয়েছে। ডাক্তার বলেছে আর রিস্ক নেই। আমি তাকিয়ে দেখি আমার মাথার কাছে বিন্তি বসে আছে৷ তার চোখ লাল। গালে কান্নার দাগ৷ ঘরের মধ্যে আর কেউ নাই। আমার জ্ঞান ফেরা দেখে বিন্তি আমার হাত ধরে কাদতে কাদতে বলে, ‘আমি আপনাকে কখনোই মরে যেতে দিব না। কোনোদিন না।’

আমি আস্তে করে উঠে বসে স্যালাইন ধরানো হাত সাবধানে উচু করে ওর চোখের জল মুছে দেই। ফিসফিস করে বলি, ‘আমিও কোনোদিন তোমাকে কাঁদতে দিব না বিন্তি৷ প্রমিজ।’

অথচ আজ এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যে সামনে বিন্তির কান্নার দিন আসছে, আর আমার মরে যাওয়ার। এই মেয়ের অন্য কোথাও বিয়ে হলে আমি সত্যিই মরে যাবো।

আমি বিন্তিকে ফোন দিলাম, ‘তোমার বাবার সাথে দেখা করতে চাই।’

– সত্যি? বিন্তি খুব খুশি। ফাইনালি তোমার সাহস হল তবে।

– হ্যা, কাল আসব?

– আসো। দুপুরে আমাদের সাথে খাবা।

– ওকে৷ আর তুমি কিছুই বইলো না আঙ্কেলকে আমাদের সম্পর্কে। যা বলার আমিই বলব।

– আচ্ছা বাবা ঠিক আছে।

আমি বিন্তির বাবার সামনে বসে আছি। পাশের রুমে জানালার পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে বিন্তি আমাদের কথা শোনার চেষ্টা করছে। আমি বললাম, ‘আমাকে চিনছেন আঙ্কেল? আমি চার বছর আগে বিন্তিকে প্রাইভেট পড়াইতাম।’

– হ্যা হ্যা, চিনব না কেন? আমাদের জন্য আরেকটু হলে তোমার লাইফ নিয়েই টানাটানি হয়ে যাচ্ছিলো। ভুলি কিভাবে!

– হ্যা আঙ্কেল, মনে আছে তাইলে। আমি আসলে আসছি বিন্তির জন্য একটা সম্বন্ধ নিয়ে। ছেলে বিসিএস ক্যাডার।

– তাই নাকি, বেশ বেশ। আমিও ভাবছিলাম ওর বিয়েটা দিয়েই দেব। একটাই মেয়ে আমার। ভালো পাত্রের হাতে তুলে দিতে পারলেই শান্তি।

– সেক্ষেত্রে সিয়াম ভাইয়ের থেকে ভালো পাত্র আর হয়না।

আঙ্কেল ছেলে আর ছেলের ফ্যামিলি সম্পর্কে আরো কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। তারপর বললেন, ‘ছেলের অভিভাবক কাউকে বলো বাসায় এসে কথা বলতে। সবকিছু ঠিক থাকলে আমার আপত্তি নাই।’

– আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আঙ্কেল, আজ তবে আমি যাই। শীঘ্রই সিয়াম ভাইয়ের বাবা মা কে নিয়ে আসবো বিন্তিকে দেখতে।

বাসা থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে বিন্তির কল আসলো ফোনে। আমি রিসিভ করলাম।

– বলো বিন্তি।

– এইটা তু তুমি কি করলা? আমার আব্বুর কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিলা অন্য ছেলের হয়ে৷ মানে কি এসবের? তোমার মাথা ঠিক আছে?

– অন্য ছেলের সাথে তোমার বিয়ে হয়ে গেলে আমার মাথা কিভাবে ঠিক থাকে বিন্তি?

– কিন্তু এর পেছনে দোষ তো তোমার।

– হ্যা গো, যে ছেলে কোনো চাকরি করেনা, বেকার, এইদেশে তার প্রেম করাটাই যে দোষের।

– উফ সোহাইল, তোমার চাকরি পর্যন্ত আমি অবশ্যই ওয়েট করতাম। তুমিই এই বিয়ের ঝামেলা ঢুকাইলা। আমি কিছুই বুঝতেসিনা।

– ভালোবাসা নামের অপরাধ করেছি, প্রেমিকাকে হারানোর শাস্তি তো আমার প্রাপ্যই ছিলো।

– হোয়াট?

– যে জীবন বিসিএস ক্যাডারের, ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ারের, আমাদের সাথে তার কোনোকালে হয়নাকো দেখা।

– তোমার কি হয়েছে বলো আমাকে।

– হৃদয়ের অভ্যন্তরে বহু যত্নে গড়া তোমার জন্য ভালোবাসার প্রাসাদ আজ এক বুলডোজার এসে ভেঙেচুরে দিয়েছে, সাথে ভেঙেছে হৃদয়টাও।

– তোমার মাথা পুরোপুরি গেছে।

– কোনো এক শ্রাবণের রাতে স্বামীর পাশে ঘুম ভেঙে আমার কথা কি ভাববা বিন্তি?

– তুমি গাজা খাইছ? সত্যি বলো।

– আমার রাত জাগা তারা, তোমার আকাশ ছোয়া বাড়ি, আমি পাইনা ছুতে তোমায়, আমার একলা লাগে ভারী।

– তুমি ফোন রাখো। আমাকে আর ফোন দিবানা।

– আমার একলা আকাশ থমকে গেছে রাতের…!

ওপাশ থেকে ফোন কেটে গেলো। আমি পাশের ফার্মেসীতে গেলাম। ঘুমের ঔষধ কিনব দুই পাতা। বিন্তিকে না পেলে এই জীবন রেখে কি লাভ? ওর বিয়ের দিন রাতে সবগুলো একসাথে খেয়ে নিব৷

বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে জোর কদমে। কেনাকাটা থেকে শুরু করে কার্ড বিলি করা, সব চলছে। দুইপক্ষেরই কাছের মানুষ ও ঘটক হিসাবে আমার দায়িত্ব যেন সবচাইতে বেশি। সকালে বিন্তির বাবার সাথে কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করতে যাচ্ছি তো বিকালে সিয়াম ভাইয়ের শেরওয়ানির অর্ডার দিয়ে আসছি। মাঝে সামান্য কথা কাটাকাটির জন্য বিয়ে ভাঙার জোগাড় হচ্ছিলো, আমি বহু কষ্টে দুই পক্ষকে বুঝিয়ে আবার এক করেছি।

সারাদিন বিয়ের কাজ করে এসে রাতে মদ খেয়ে কান্নাকাটি করি। ভীষণ কষ্ট হয়। ফেসবুকে, ‘যে জীবনের দামে তোমাকে কিনেছিলাম, সেই কেনা দামেই তোমাকে বিক্রি করে দিতে হচ্ছে’ টাইপ ছ্যাকা খাওয়া স্ট্যাটাস দিচ্ছি। অনেক লাইক, স্যাড রিয়্যাক্ট, কমেন্ট আর সমবেদনা পাচ্ছি মানুষের থেকে। রাতে ঘুমাতে পারিনা, গলা দিয়ে ভাত নামেনা, প্রচন্ড ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়ে পড়েছি। আম্মু সেদিন আমাকে দেখে আৎকে উঠেছেন, ‘দিনদিন তুই এভাবে শুকিয়ে যাচ্ছিস কেন? অসুস্থ নাকি?’

– অল্প কিছুটা।

– তো ডাক্তার দেখা।

– লাগবে না। বিন্তির বিয়ের দিন রাতে সব ঠিক হয়ে যাবে।

– মানে কি?

– কিছুনা।

আম্মু চলে গেলে আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবি, ‘মরে যাওয়ার পর সব অসুস্থতা ঠিক হয়ে যায়। মৃত মানুষের কোনো ডিপ্রেশন নাই।’

বিয়ের তিন দিন আগে গভীর রাতে বিন্তি আবার আমাকে ফোন দেয়, ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসে কান্না।

– কাঁদছো কেন বিন্তি?

– সোহাইল তুমি এটা কেন করলা? আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে সোহাইল। প্লিজ।

– ভালোবাস আর কষ্ট যে একে অপরের সমার্থক বিন্তি। যেখানে ভালোবাসা আছে সেখানে কষ্টরাও আছে।

– কিন্তু তুমি এটা না করলে তো কষ্ট পাওয়া লাগতো না।

– কোনো এক তারাভরা রাতে আকাশের দিকে চেয়ে তুমি কি আমায় খুজবে বিন্তি? আমি সপ্তর্ষি হয়ে তোমার আকাশে উকি মারবো রোজ।

– প্লিজ হেয়ালি কইরো না। একটু স্বাভাবিকভাবে কথা বলো।

– বেচে থেকে লাভ কি বল, তোকে ছাড়া আর। খুজেছে জবাব অচল, মন কোথাকার।

– আমার মেজাজ কিন্তু এবার খারাপ হচ্ছে।

– পরের জন্মে বয়স যখন ষোলই সঠিক, আমরা তখন প্রেমে পড়ব। মনে থাকবে?

– আমি কিন্তু সুইসাইড করব বলে দিলাম।

– তোমায় চেয়েছিলাম সারা পৃথিবীর বিনিময়ে, তুমি চলে গেলে দুচোখে এক সমুদ্র জল উপহাস দিয়ে।

– কুত্তার বাচ্চা, জানোয়ার, তুই একটা অসুস্থ মানুষ। তুই সাইকো।

– সখি ভালোবাসা কারে কয়, সে কি কেবলি যাতনাময়!

– সোহাইল তুমি একটা ভালো ডাক্তার দেখাও৷ আর কোনোদিন আমার সাথে যোগাযোগ করার ট্রাই কইরো না। বাই।

বিন্তি ফোন রেখে দিলো। আমার ভীষণ কষ্ট হতে লাগলো। সবকিছু মনে হচ্ছে অর্থহীন। এই ঘর, এই বিছানা, টেবিল, টেবিলের ওপর কম্পিউটার, গেম অফ থ্রোনসের লেটেস্ট এপিসোড, সবকিছু। আমি একটা ব্লেড নিয়ে এসে কবজির ওপর চালিয়ে দিলাম। ঝরঝর করে রক্ত বের হচ্ছে। ছোট্ট ফোয়ারার মত। ভীষণ ব্যাথা করছে। তবে শরীরের এই ব্যাথা হৃদয়ের ব্যাথা থেকে খুব সামান্যই।

হঠাৎ করে আমার মনে পড়লো, কাল সকালে বিন্তির কিছু আত্মীয়ের বাসায় কার্ড দিয়ে আসতে হবে। দুপুরে আঙ্কেলের সাথে গরুর হাটে যেতে হবে৷ সন্ধ্যায় গায়ে হলুদ৷ ঘর সাজানোর দায়িত্ব আমার। আমি মারা গেলে কিছুই ঠিকমতো হবে না। হয়তো বিয়েটাই ভেঙে যাবে৷ আমি দ্রুত ক্ষতস্থানে ঔষধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেধে নিলাম। আমি মরবো এটা ঠিক, কিন্তু এখনি না। বিক্তির বিয়ের আরো দুইটা দিন বাকি আছে। এখনো সে অন্য কারো বউ হয়ে যায়নি। আচ্ছা, আমার কি কিছুই করার নেই? কিছুই না? হ্যা আছে৷ মনে পড়েছে। আমি ফোন হাতে নিলাম। ফোন করে ক্যাটারিং সার্ভিস বুক করতে হবে। ভুলেই গেছিলাম।

আজ বিন্তির বিয়ে। আমার প্রেমিকার বিয়ে। প্রিতমের ভাষায়, ‘আইজ আমার গার্লফ্রেন্ডের বিয়া।’

আমি আছি বরযাত্রীদের দেখাশোনার দায়িত্বে। তাদের খাবার দেয়া, কার কি লাগবে জিজ্ঞেস করা, বিয়ে পড়ানোর জন্য কাজি নিয়ে আসা, ইত্যাদি৷ আমার নিজেকে জীবন্ত লাশ মনে হচ্ছে। পৃথিবীর সবচাইতে ভারী জিনিস যেমন বাবার কাধে সন্তানের লাশ, তেমনি সবচাইতে কঠিন শোকসভা হলো প্রেমিকের কাছে তার প্রিয়তমার বিয়ের অনুষ্ঠান।

আমার মনে হচ্ছিলো চিৎকার করে বলি, এই বিয়ে বন্ধ করুন প্লিজ। কিন্তু সমাজ নামের একটা তালা যেন আমার কণ্ঠনালীকে বন্ধ করে রেখেছে। বিন্তির বাবা আমাকে ডাক দিলো। বললো, ‘বিন্তিকে দ্রুত বিউটি পার্লার থেকে নিয়ে আসো। ড্রাইভারকে আমি দই আনতে পাঠাইছি৷ তোমাকে ছাড়া বাসায় আর ভরসা করার মত কেউ নাই। এই নাও গাড়ির চাবি।’

আমি গেলাম। বিন্তি পার্লার থেকে বের হয়ে এসে আমার গাড়িতে উঠে বসলো। বধু সাজে অপূর্ব সুন্দরী লাগছে মেয়েটাকে। আমি গাড়ি স্টার্ট করলাম। বিন্তি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালো।

– এদিকে কোথায় যাচ্ছো, সোহাইল?

– দিনাজপুর।

– হোয়াট?

– আমরা পালাচ্ছি।

– কি বলতেছ তুমি? মানে কি এসবের?

– তুমি কি ভাবছিলা বিন্তি? আমি এতো সহজেই তোমার বিয়ে মেনে নিব? আমার হাতে দুইটা অপশন ছিলো। হয় তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া, নাহয় তোমার বিয়ের দিন ঘুমের ঔষধ খেয়ে সুইসাইড করা। আমি ভাবছিলাম প্রথমটার সুযোগ হবে না৷ মৃত্যুই আমার কপালে আছে। কিন্তু তোমার বাবা আমাকে বিউটি পার্লারে পাঠিয়ে সুযোগ করে দিয়েছে৷ এখন আর তোমার আমার মাঝে কেউ আসতে পারবে না। সে বিসিএস ক্যাডারই হোক বা কোনো মন্ত্রী। তুমি এখন থেকে শুধুই আমার।

বিন্তি অনেক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে করে বললো, ‘অ্যাম আই আ জোক টুই ইউ, সোহাইল?’

এই সেম কথাটা কয়দিন পর আমাকে বিন্তির বাবাও বলেছিলো।

দিনাজপুর গিয়ে এক ফ্রেন্ডের বাসায় আমরা বিয়ে করেছি। তিনদিন হানিমুন করে ঢাকায় ফিরলাম৷ আমার আম্মু খুব রেগে আছে আমার উপর৷ কথা বলা বন্ধ করে দিছে আমার সাথে। ছেলেপক্ষ আমাকে খুজছে, পাইলেই কঠিন মাইর দিবে। তবে এই পাগলামি আমি করেছি তার পেছনে কারণ আছে। ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিলো একদম সিনেমার মত বিয়ের আসর থেকে প্রেমিকাকে পালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করব৷ রাগ করে আমার নিজের আম্মু কথা বন্ধ করে দিবে আমার সাথে।

প্রেমিকার হবু বরের লোকজন মারার জন্য খুজবে। প্রেমিকার বাবা বলবে, আজ থেকে আমার দরজা তোমার জন্য বন্ধ। কিন্তু অবস্থা এমন দাড়াইছে যে আমি বললেই আম্মু রাজি হবে সেই মেয়ের সাথে আমাকে বিয়ে দিতে। প্রেমিকার বাবাও না করবে না। আজকালকার বাবা মায়ের এক একটাই প্রবলেম। তারা প্রেমের ব্যাপারে অনেক উদার। ছেলে মেয়ের ইচ্ছা মেনে নেয়। আগেরকালের মত এতো কঠোর হয় না৷ এজন্যই এসব করেছি। প্লান অনুযায়ী আম্মুর কথা বন্ধ আর বরপক্ষ মারার জন্য খুজছে, এই দুইটা হইছে ঠিকঠাক৷ শুধু প্রেমিকার বাবার চিরদিনের জন্য দরজা বন্ধ করে দেয়ার স্বপ্নটাই পূরণ হইলো না। ধুর!

বিন্তির বাবাকে গিয়ে সালাম করলাম। উনি হতাশ গলায় বললেন, ‘তুমি আমাকে আগে একবার বলতে পারতে তুমি ওকে পছন্দ করো? তুমি তো ছেলে খারাপ না। আমি রাজি হইতাম। আমার এতোগুলো টাকা জলে যাইতো না। এই নাটকটা কেন করলা তুমি? অ্যাম আই আ জোক টু ইউ?’

আমি উচ্চস্বরে বললাম, ‘চৌধুরী সাহেব, আপনি বড়লোক হতে পারেন কিন্তু আমার প্রেম কিনতে পারবেন না।’

– এগুলা তুমি কি বলতেছ?

– আপনার সব খেলা শেষ।

– হোয়াট?

– ভালোবাসা যদি একটা খেলা হয়, তবে আমি সেই খেলার বিরাট কোহলি৷ আর আপনি শুভাগত হোম।

– তোমার মাথা কি ঠিক আছে?

– সোহাইল একবার যা বলে তাই করে। পরে এমনকি সে নিজের কথাও শুনেনা।

– প্লিজ স্টপ।

– আমার আর বিন্তিকে আপনি আলাদা করবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু আপনার দিন শেষ৷ খেল খতম।

– আর ইউ স্টুপিড?

– হাহা হা, আপনার সব চাল ব্যার্থ৷ আজ থেকে আমিই এই এলাকার কিং।

– বিন্তি তুই ওকে চুপ করতে বল।

– কুত্তার বাচ্চা, এই কুত্তার বাচ্চা।

বিন্তির বাবা আমাকে ঠাস করে একটা থাপ্পড় দিলেন। প্রচন্ড রেগেমেগে বললেন, ‘এই মুহুর্তে তুমি তোমার বউ নিয়ে আমার বাসা থেকে বের হয়ে যাও। আমি আর কোনোদিন তোমার মুখ দেখতে চাইনা। আজ থেকে আমার বাড়ির দরজা তোমার জন্য বন্ধ।’

ইয়েস, ফাইনালি। আমি খুশি হলাম। মিশন কমপ্লিট!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।