গাধাসমগ্র || রম্য

এই দুনিয়ায় কি পরিমান গাধা আছে, জিনিসটা ভাবলে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাইতে হয়। একটা মানুষ মাথায় মাঝারী সাইজের একটা সিলভার কাপ মাছের ব্রেইনের সমপরিমাণ ব্রেইন নিয়ে কিভাবে সারভাইভ করেতেছে, এই পুরো ব্যাপারটা নিঃস্বন্দেহে স্রষ্টার খুব বড় ধরণের নিদর্শন। গতকাল সেরকম এক গাধা আমার বাংলালিংকে তার রবি নাম্বার থেকে ফোন দিয়ে বলে, ‘হ্যালো স্যার, আমি গ্রামীনফোন কাস্টোমার কেয়ার থেকে বলছি। আপনি একটা র‍্যাফেল ড্রতে পঁচিশ লক্ষ টাকা জিতেছেন।’

এটা শুনে আমি হাসবো না কাঁদবো, বুঝে উঠতে পারলাম না। জিপি কোম্পানির এতোই আকাল পড়েছে যে আজকাল তারাও রবি নাম্বার ইউজ করে বাংলালিংকদের অফার দিচ্ছে। হাইরে কপাল! আর সবচাইতে বড় কথা এইসব প্রতারণার দুই নাম্বার সাইডে তো অন্তত বুদ্ধিমান মানুষদের আসা উচিত ছিলো। দেশের আর সমস্ত সেক্টরের মতন ধোঁকাবাজি সেক্টরেও যদি গাধারা চলে আসে, তাইলে দেশ এগোবে কিভাবে?

এইসব গাধাদের কথা ভাবতে গেলে আমার সবার আগে মনে পড়ে যায় আমাদের এলাকার এক ‘ইশমাট বয়’ বড় ভাইয়ের কথা। বাস্তবের নাম সাগর, আর ফেসবুকে তিনি ‘মন খান।’

টিয়া রঙের প্যান্ট আর হলুদ কালারের শার্ট পরে এসে আমাদের আড্ডায় ডেইলি ডায়ালগ ঝাড়েন। সেদিন বলতেছেন, খুলনায় তার একটা গার্লফ্রেন্ড আছে। বিশাল বড়লোকের মেয়ে। ডাক্তারী পড়ে।

আমরা তো অবাক, ‘এইরাম পিস পটাইলেন ক্যামনে?’

ভাই তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে, ‘আরেহ এরজন্য মাথায় জিনিস থাকা লাগে। অল্প একটু মিথ্যা কথা বলছি। বলছি আমি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের টিচার।’

‘তারপর?’

‘তারপর আর কি, এইটা শুনে মেয়ে তো আমারে বিয়ে করবেই। নাছোড়বান্দা। পরে বুদ্ধি করে থামাইছি আপাতত।’

‘কি বুদ্ধি?’

‘হে হে, বলছি মাত্র তো আমি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের স্যার, তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটির স্যার হবো, তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির স্যার হবো, তারপর গিয়ে বিয়ে করবো।’

আমরা ভেবে অবাক হয়ে যাই যে, কোন সে ডাক্তার মেয়ে যে এই মহান মন খানের মিথ্যা ধরতে পারেনা? আমরা তার ডাক্তারী পড়া নিয়ে অবিশ্বাস করি।

আমাদের ভুল ভাঙাতে ভাই প্রেমিকাকে ফোন দিয়ে স্পিকার অন করে।

– হ্যালো জান, খাইছো?

– হ্যা খাইছি, তুমি?

– হুম কি খাইছো?

– এইতো মুরগীর রোস্ট, গরুর কালা ভুনা, খাসির রেজালা, রুইমাছ ভুনা, দই, বোরহানী। তুমি?

ওত্তেরি! আমরা জানতে চাই, দাওয়াত ছিলো নাকি? ভাই স্পিকারের উপর হাত চেপে বলেন, ‘উহু, বড়লোকের মেয়ে। ডেইলি ভালো খাবার খায়।’

তারপর হাত সরিয়ে বলেন, ‘হ্যা বাবু আমিও রোস্ট, রেজালা, ইলিশ মাছের দোপেয়াজা, আর গলদা চিংড়ি ভুনা খেলাম।’

দুজনের খাওয়ার বহর দেখে আমাদের পেটের ভাত হজম হয়ে যাওয়ার জোগাড়। আমরা ফিসফিস করে ভাইকে প্রশ্ন শিখাই দেই।

ভাই জিগায়, ‘হ্যা বাবু, তোমার মেডিকেলে কি কি সাবজেক্ট আছে যেন?’

ভাইয়ের বাবু কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই জবাব দেয়, ‘ক্যান্সার আছে, ডায়রিয়া আছে, হাপানী আছে, কলেরা আর হার্ট অ্যাটাকও আছে।’

ওয়াও, আমরা অবাক হওয়ার ভাষাও হারায় ফেলি। মেডিকেলে এ কেমন কেমন সাবজেক্ট!

তবে বুঝতে পারি ভাই যোগ্য সঙ্গীই পেয়েছেন। দু’জনের মাথাতেই জিনিসই আছে খালি, ব্রেইন অন্তত নেই।

ফোন রেখে ভাই আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘হু হু, কি বুঝলি? আমার বিয়েটা হোক তারপর তোদের কারো ক্যান্সার হলে নো টেনশন। ও ক্যান্সার নিয়েই পড়তেছে।’

আমরা ভুল ভাঙাই না। মজা নেয়াই উদ্দেশ্য। মজা নিতে থাকি।

এ তো গেলো রিয়েল লাইফের কথা। ভার্চুয়ালে যেসব গাধা আছে তাদের কাছে রিয়েল লাইফের এগুলা শিশু জাস্ট। বিশেষ করে যারা ফেইক আইডি খোলে। কিছু আইডি দেখলে খুব মায়া লাগে। ইচ্ছা করে এদেরকে ডেকে এনে পাশে বসাই। চা নাস্তা করাই। মাথায় হাত বুলিয়ে বলি, ‘ভাইরে, মনে কষ্ট নিস না। আল্লাহ সবাইরে ব্রেইন জিনিসটা দিয়ে দুনিয়ায় পাঠায় না। কি আর করবি!’

আউল ফাউল নামের আইডি তো আছেই, আজকে দেখলাম এক পোলা আইডি খুলছে ‘আরিফ আর হুসাইন’ নামে। এ পাবলিকরে কি নিজের মত গাধা ভাবে নাকি কে জানে! আইডির অ্যাবাউটে লিখে রাখছে, ‘স্টুডাইড এট, আগের ফেমাস আইডি ডিজেবল। কেউ এই আইডির ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট ঝুলাইস না।’

সিরিয়াসলি! আরিফ আর হুসাইনের আইডি ডিজেবল হয়ে গেলে উনি নতুন আইডি খুলে অ্যাবাউটে এইটা লিখতো?

তারপর তার স্ট্যাটাসগুলা পড়ে আমি আরো বেশি টাস্কিত।

‘মামারা, আগের আইডিতে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার লাইক পাইতাম। ডিজেবল হয়ে ঝামেলায় পড়ছি। সবাই এই আইডিতে হাজিরা দিয়ে যাও।’

আরেকটা স্ট্যাটাস,

‘আমার ফ্রেন্ড লিস্টে liker বেশী না commentr বেশী

তা এই পুস্টে প্রমাণিত হয়ে যা যাবে আমি কিন্তু commentr’

তবে এদের চাইতে আরো বড়, আই মিন সবচে বড় গাধা হলো যারা এইসব ফেক আইডি ধরতে পারেনা। আমার আজকের এই এতোবড় স্ট্যাটাসের অবতারণা এরকম একজনের জন্যই। তিনি আবার সেইরকম সুন্দরী। সুতরাং আমাদের এলাকার সব পোলাপাইন তার পেছনে লাইন ধরে দাঁড়ায় আছে পটানোর আশায়। বলতে লজ্জা লাগতেছে, তারপরও বলি। সেই লাইনের একসাইডে আমিও আছি।

তো কাহিনী হলো মেয়ে ভাড়া থাকে আমাদের বাসার দোতলায়। যেতে আসতে আমার সাথে দেখা হয়। আজকে ছাদে দেখা। খুশিতে টগবগ করে ফুটতেছে। আমারে বলে, ‘জানো জানো, আজকে কি হইছে? আমি তো ভাবতেই পারছিনা। ওহ গড!’

– কি হইছে?

– ইউ কান্ট বিলিভ, আজকে নায়ক সিদ্ধার্থ মালহোত্রা আমারে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠাইছে।

– ওহ আচ্ছা, আমি কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই বলে দেই। ওইটা ফেইক আইডি।

– জীবনেও না, মেয়ে মুহুর্তেই চোখমুখ শক্ত করে ফেলে। ওইটা মোটেও ফেইক না। আমি একশো পার্সেন্ট শিওর। তুমি আইডি দেখলেই বুঝতে পারবা।

আমি আইডি দেখি। আমিও শিওর হই এটা রিয়েলিই সিদ্ধার্থ। আমি দেখি সেই আইডিটার নাম, ‘real siddharth malhotra!!’

এই দুনিয়ায় কি পরিমান গাধা আছে, জিনিসটা ভাবলে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাইতে হয়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।