গভীর বেদনায় দেই ডুব

শিশুকালে ফ্রেইজ এন্ড ইডিয়মসে কতবার যে মুখস্ত করেছিলাম, লাইফ ইজ নট এ বেড অফ রোজেজ- জীবন পুষ্প শয্যা নয়। তখন কি আর জীবনের মানে বুঝতাম! জীবনকে নাকি আবার পুষ্প শয্যা ভাবতে মানা করা হয়েছে। হলে ছারপোকার কামড় খেয়ে রাত জেগে জেগে ইতোমধ্যে ওই কথার মানে এখন বুঝে গেছি। লেখক আসলে ছারপোকা থেকে সাবধান করার জন্যই হয়ত পুষ্প শয্যা ভাবতে মানা করে দিয়েছিলেন।

তাই বলে ফারুকী কেন তার সিনেমার নাম, নো বেড অফ রোজেজ রাখলেন? তিনিও কি হলে ছারপোকার কামড় খেয়ে ঘুমবিহীন রাত কাটিয়েছিলেন? তাই তিনি আমাদেরকে বেড অফ বাগ দেখাতে চান? ট্রেলার রিলিজ হইল, ভীষণ সাংসারিক টানাপোড়েনের গল্প মনে হইল। গান রিলিজ হইল, আহারে জীবন, আহা জীবন। দর্শককে কি বেদনায় ডুবিয়ে দিতে চাইছেন ফারুকী? জানতে হলে দেখতে হবে। অবশেষে আজকে সিনেমা রিলিজ হইল, প্রথম শো দেখতে চলে গেলাম নন্দিতা সিনেমাহলে।

এক চিত্র পরিচালক জাভেদ হাসানের গল্প। তার নাম আছে, যশ আছে, স্ত্রী আছে, কন্যা আছে, পুত্র আছে, আর কি চাই তবে? প্রেম আছে? আছে হয়ত! স্ত্রী মায়াকে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন বলে কত না যাতনা সইতে হয়েছিল। শ্বশুর মশায় থানা পুলিশ পর্যন্ত করেছিলেন। কিন্তু শ্বাশুরি নিজে তাদেরকে লুকিয়ে রেখেছিলেন বলে শেষ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছিল।

তারপরে অনেকদিন কেটে গেল। জাভেদ এখন দেশের নামকরা চিত্র পরিচালক। গল্প নিয়ে ভাবতে আর নিজেকে সময় দেবার জন্য তিনি দূরে একলা বাড়িতে মাঝেমাঝে রাত্রি যাপন করেন। যেন তার সংসারে থাকতে আর ভাল লাগেনা। যেন মায়ায় আবদ্ধ জীবন থেকে তিনি একটু মুক্তি পেতে চান। যেন তিনি নতুন করে কোন মায়ায় জড়াতে চান। জাভেদের এমন পরিবর্তন স্ত্রী মায়া বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু তিনি জানতে না জাভেদ আসলে কি চান!

তাদের মাঝে ধীরেধীরে দুরত্ব তৈরি হতে থাকে। এর মাঝে একদিন হুট করে জাভেদ তার সিনেমার নায়িকা এবং একই সাথে কন্যা সাবেরির বন্ধু নিতুকে বিয়ে করেন। এই সংবাদে দেশের সকল পত্র পত্রিকা আর নিউজ মিডিয়া সবখানে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিতর্কের চূড়ান্ত পর্যায়ে স্ত্রী মায়া, কন্যা সাবেরি আর তার পুত্র সবাই তাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়।

এত বছর ধরে, এত মমতা দিয়ে গড়ে তোলা নিজের সংসারটি এক মুহুর্তেই যেন তার অতীত হয়ে যায়। সেই বেদনা জাভেদকে চিরতরে গ্রাস করে। এক গভীর শূন্যতায় জাভেদ ডুবে যান। তার মৃত্যু হয়। কন্যা আর পুত্ররা পিতার মৃত দেহকে শেষ বিদায় দেয়। চিরতরে তাকে দাফন করা হয় তারই প্রিয় স্থান নয়নতারায়। সেই সাথে গল্পের সমাপ্তি হয়।

ফারুকীর ডুব সিনেমার গল্পটি এক গভীর বেদনায় দর্শককে সিক্ত করে। সন্তানের প্রতি পিতার ভালবাসা নিয়ে তৈরি এক অনন্য গল্প ডুব। সিনেমাতে একই সাথে একজন প্রেমিক এবং পিতা জাভেদ হাসান চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইরফান খান।

লাঞ্চ বক্স সিনেমার কেরানি প্রেমিক সাজান ফার্নান্দেজকে দেখে কবেই মুগ্ধ হয়েছিলাম। ডুবে ইরফানের অভিনয় দেখে আবারো মুগ্ধ হয়েছি। এক পৃথিবীর সংকোচ আর নীরবতাকে ঠিকঠাক ভাবেই তিনি নিজের চেহারায় ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। যদি ভাষাটিকে তিনি আরেকটু ভালভাবে রপ্ত করতে পারতেন তাহলে আরো ভাল হতো। যদিও বুদ্ধি করে পরিচালক তাকে দিয়ে ইংরেজি বলিয়ে নিয়েছেন। জাভেদের কন্যা সাবেরি চরিত্রে তিশাও সাবলিল ছিলেন।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিব্যক্তিতে তিশা রীতিমত সেরা ছিলেন। জাভেদের প্রথম স্ত্রী মায়া চরিত্রে রোকেয়া প্রাচী আর দ্বিতীয় স্ত্রী এবং সাবেরির বন্ধু নিতু চরিত্রে পার্নো মিত্রও ভাল ছিলেন। আসলে তারা সবাই মিলে একটি বেদনাকে ফুটিয়ে তোলার মিশনে নেমে শেষমেশ সফল হয়েছেন। গভীর বেদনায় তারা দর্শককে ডুবিয়ে দিয়েছেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।