খ্যাতির সাথে ফ্রিতে কিছু বিড়ম্বনা চলে আসে: রিয়াদ

ক’দিন হল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আঙ্গিনায় এক দশক পূরণ করলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। এসময়ে ২৫টি টেস্ট, ১৪৫ টি একদিনের ম্যাচ এবং ৫৮ টি টি টোয়েন্টি খেলেছেন এ অলরাউন্ডার। সংখ্যাগুলো যদিও তাঁর প্রতিভার প্রতি সুবিচার করছে না, তারপরেও তাঁর অর্জনে তিনি খুশি। বরং, এটা তাঁকে নির্বাচকদের আস্থার প্রতিদান দিতে বদ্ধপরিকর করে তোলে, নিজেকে আরও শাণিত করতে অনুপ্রাণিত করে। সম্প্রতি ক্রিকেট বিষয়ক ভারতীয়  গণমাধ্যম ক্রিকবাজে এক সাক্ষাৎকারে উঠে আছে তার ক্যারিয়ারের নানা দিক। অনুবাদ করেছেন নেয়ামত উল্লাহ।

সেই ২০০৭ এ শ্রীলঙ্কায় আন্তর্জাতিক অভিষেক থেকে আজকে ২০১৭ এ ক্যারিয়ারের এক দশক পূর্তি। কেমন লাগছে এ পথচলা?

– এখন পর্যন্ত আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমি দলকে আরো ভালো সার্ভিস দিতে পারতাম। দশটা বছর এ আঙ্গিনায় কাটানোর পরে এসে এখন মনে হয় অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দলকে আমার সেরাটা দেওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় এটাই।

আপনি কি মনে করেন এ দশ বছরে আপনি আপনার প্রতিভার শতভাগ পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছেন?

– এটা সত্য যে আমি হয়তো নিজেকে সেভাবে মূল্যায়ন করতে পারবোনা, তবে আমার মনে হয় আমি আরও ভালো করতে পারতাম। উন্নতি করার অনেক সুযোগ ছিলো। তবে আমি আমার সীমাবদ্ধতাগুলোকে আরো কমিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, আমার ক্যারিয়ার সেরা খেলাটা অদূর ভবিষ্যতে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

শততম টেস্টে স্কোয়াডে থাকার পরেও একাদশে ছিলেন না, আপনার কি মনে হয় দশ বছর পরেও দলে আপনি আপনার পাওনাটা পান?

– দেখুন আমি কাউকে দোষারোপ করতে চাইনা। আমি মনে করি এটা আমার দোষ যে আমি ঠিকঠাক পারফর্ম করতে পারিনি। আর তাই একাদশে জায়গা হয়নি। যদি পারফর্ম করতাম তাহলে দলে আমার জায়গা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠতো না। এটা আমার জন্য একটা শিক্ষা ছিলো। কারণ ক্যারিয়ারে এমন অনেক উত্থান পতন ছিলো, আছে, থাকবেও। খারাপ সময় চললে আমি দোষটা নিজের ঘাড়ে নিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। সত্যি বলতে কি, আপনি কোনো কিছুই নিশ্চিত বলে ধরে নিতে পারেন না। আপনি সদ্য অভিষিক্তই হোন কিংবা সিনিয়র, দলে জায়গা ধরে রাখতে হলে আপনাকে কঠোর পরিশ্রম এবং পারফর্ম করতে হবেই।

দল থেকে বাদ পরার পরে নানা নাটকীয়তার পরে ওয়ানডে সিরিজে আবার জায়গা ফিরে পেলেন দলে, এতো কিছুর কি দরকার ছিলো?

– এ ব্যাপারে কিছুই বলতে চাইনা। কিন্তু একটা কথা বলতে চাই যে, আমি কাউকেই দোষারোপ করতে চাই না, দল থেকে বাদ পরাটাকে নিজের ব্যর্থতা হিসেবেই দেখেছি। আমি মনে করি এটা ভাগ্যে লেখা ছিলো না (শততম টেস্ট)। তবে এটা আমাকে মানসিকভাবে শক্ত হতে সাহায্য করেছে কারণ এটা মেনে নেয়া এতোটা সহজও ছিলোনা। খেলায় ফিরতে বেশি সময় নিইনি, তবে পুরো ঘটনাটায় আমি কাউকে দোষারোপ করতে নারাজ।

সেবার শ্রীলঙ্কা থেকে ফেরার পর মিডিয়াকে এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। সেটা কি তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া, আবেগ প্রকাশে অনিচ্ছা থেকে ছিলো?

– যেভাবে বলছেন ব্যাপারটা ঠিক টা না। আসলে আমি নিজের খেলায় মনোযোগ দিতে চাচ্ছিলাম, আর আপনি যখন পারফর্ম করবেন তখন মিডিয়ায় কথা বলার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করিনা। একজন খেলোয়াড় হিসেবে মিডিয়ায় কথা বলার চেয়ে ব্যাট-বলকে কথা বলানোটাকেই আমি প্রাধান্য দিই সবসময়।

ক্যাপ্টেন মুশফিকের আত্মীয় হিসেবে দলে থাকা, সামরথ্য-প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে হলেও তো মিডিয়ার প্রতি আপনার ক্ষোভ থাকার কথা!

– সত্যি বলতে কি, সে সময়ে যা ঘটছিলো টা খুব কষ্ট দিতো, যা একটু লজ্জার ব্যাপারও ছিলো বটে! দলটাকে কেউ কিনে নেয়নি যে যার যা খুশি করে যাবে। জানি আমরা পেশাদার ক্রিকেটার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেলিব্রিটিও। খ্যাতির সাথে সাথে ফ্রিতে কিছু বিড়ম্বনাও চলে আসে কিন্তু আমাদেরও ব্যাক্তিগত জীবন আছে। আমি কারো দিকে আঙ্গুল তুলছিনা কিন্তু যে কোনো উপসংহারে আসার আগে এপাশে থাকলে আপনার কেমন লাগতো অন্তত এটা ভাবা উচিত।

দলের ব্যাটিং লাইনআপে ফিক্সড কোনো জায়গা পেলে নিজস্ব একটা পরিচয় সৃষ্টি করতে পারতেন বলে মনে করেন? ক্যারিয়ারের একটা বড় সময় জুড়ে আপনাকে শুধু দলে ভারসাম্য আনার কাজটাই করে যেতে দেখা গেছে…

– দেখেন, টপ অর্ডারে ব্যাট করছি মাত্র বছর তিনেক হয়। ২০০৭ এর দিকে যখন ক্যারিয়ার শুরু করি তখন ব্যাট করতাম ৭-৮ এ, দরকার পড়লে আট নয় ওভার হাত ঘোরাতে হতো। এটাকে মেনে নিয়েছিলাম, জানতাম প্রয়োজনের সময় পারফর্ম করতে হবে কারণ এ সুযোগ বারবার আসেনা।

এক অর্থে মিনি অলরাউন্ডার ছিলাম, যে কিনা মাঝে মাঝে পারফর্ম করতো আর বাকি সময় ফ্লপ। কিন্তু  ব্যাটিং অর্ডারে উন্নতি হবার পরে দৃশ্যপটটা পাল্টে গেছে। আগে যে সুযোগটা কালেভদ্রে মিলতো সেটা এখন বড় আকারে সামনে আসছে বারবার। কিন্তু একই সময়ে পারফর্ম করে দলে নিজের জায়গা পাকা করার চাপটাও আছে।

ক্যারিয়ারের অষ্টম বছরে এসে টপ অর্ডারে ব্যাট করার সুযোগ মিললো। আপনার টেম্পারামেন্ট আর টেকনিকের কথা মাথায় রাখলে সুযোগটা কি একটু দেরিতে এলো বলে মনে হয় না? ঘরোয়া ক্রিকেটে সবসময় উপরে খেলেছেন এবং সবসময়ই সফল ছিলেন বলা চলে!

– জাতীয় দলে আমার রোল ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে খানিকটা আলাদা এবং দলের জন্য খেলে যাওয়াই আমার প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য চাই সেটা ঘরোয়া ক্রিকেটই হোক কিংবা জাতীয় দলে। আগে বোলিং অলরাউন্ডার ছিলাম কিন্তু এখন আমার ধ্যানজ্ঞান কেবলই ব্যাটিং। একারণে দিনে দিনে বোলিঙয়ের জন্য জায়গাটা ছোট হয়ে আসছে। তবে দলের দরকারে আমি এখনো বোলিং করতে রাজি আছি।

সবসময়ই দলে আপনার রোল ছিলো দলকে সংকটের মুহূর্তে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। রোলটা একটু চ্যালেঞ্জিং না?

– আমি এটাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা উপহার বলতে পারি এবং এ মুহূর্তগুলোকে আমি সুযোগ হিসেবে দেখতে ভালোবাসি। একজন মুসলিম হিসেবে ভাগ্যে বিশ্বাস রাখতে হয় আমাকে। এমন সময়গুলোতে নিজের সেরাটা দিতে চেষ্টা করি, জানিনা কতটুকু সফল হতে পেরেছি।

টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের কাছে হারটা মানসিকভাবে কতোটা ধাক্কা দিয়েছিলো? সেদিনও সুযোগ এসেছিলো, এবং ভালো অবস্থানে থাকার পরেও মুঠোগলে বেরিয়ে গেলো…

– সম্ভবত সেটা পরের কয়েক ম্যাচে মানসিক বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। না হেরে কেউ কখনো কিছু শিখতে পারেনি, ওই হারটাও আমাকে শিক্ষা দিয়েছে। খেলা শেষের আগে কখনো শেষ হয় না। হাতছোঁয়া দূরত্বে দাঁড়িয়ে কখনো তুষ্ট হতে নেই কারণ আপনি জানেন না পেছন থেকে কেউ এসে জয়টা আপনার হাত থেকে ছিনিয়ে নেবে কি না।

এটা খুবই বড় একটা মানসিক ধাক্কা ছিলো। দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা ম্যাচটা খুবই কাছে থেকে হেরেছি কিন্তু আবারো বলছি, এটা আমাদের জন্য শিক্ষা ছিল যেটা ভবিষ্যতে কাজে দেবে।

এ ম্যাচের মতো অন্য কোনো ম্যাচ আছে যা আপনাকে এখনো কষ্ট দেয়?

– এ ম্যাচটা মনে সবসময়ই দাগ কাটবে তবে এর কাছাকাছি বলতে গেলে আরেকটা ম্যাচের কথা বলবো। এশিয়া কাপ ফাইনাল। শেষ দুটো বলে স্ট্রাইকে ছিলামনা বটে, কিন্তু আমি যে দুটো বল খেলেছিলাম সে দুটোও ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারিনি সেদিন।

আপনার জীবনে খালেদ মাহমুদের ভূমিকা?

– বলাটা কঠিন। বাল্যকাল থেকেই আমি তাঁর ভক্ত ছিলাম, এবং তিনি আমাকে আজকের রিয়াদ হতে সাহায্য করেছেন। আমার খেলোয়াড়ি জীবনে তাঁর ভূমিকা ভাষায় প্রকাশ করাটা অসম্ভব। খেলাটার প্রতি তিনি দারুণ নিবেদিত ছিলেন, তাঁর এ ব্যাপারটা ভালো লাগে। এবং আমি এটা অনুসরণ করার চেষ্টা করি।

শেষ তিন বছরে ব্যাটসম্যান হিসেবে আপনার মাঝে কি পরিবর্তন এসেছে?

– মেন্টাল অ্যাপ্রোচটা পাল্টে গেছে, এর পেছনে দুটো কারণ আছে। প্রথমত, শারীরিকভাবে আমি পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ফিট, এবং যখন আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে চাই এটা আমাকে পজিটিভ থাকতে সাহায্য করে। এই কম্বিনেশনটা আমাকে নিকট অতীতে ভালো খেলতে সাহায্য করেছে। ফিটনেস বাড়াতে নিয়মিত কজ করে যাচ্ছি সাথে সাথে স্কিল ডেভেলপমেন্টের কাজও চলছে। প্রতিদিনই আপনার উন্নতি করে যেতে হবে অন্যথায় অন্যরা স্কিল, ফিটনেস দিয়ে দলে আপনার জায়গা নিয়ে নেবে। আমার নিজের ক্যারিয়ারেও আমি এমনটা দেখেছি।

আপনার এ বদলে যাওয়ার পেছেনে কোচ হাতুরুসিংহের কেমন ভূমিকা পালন করেছেন বলে আপনি মনে করেন?

– আমি মনে করি তিনি আমাদেরকে আমাদের শক্তি-সামর্থ্য অনুসারে খেলার স্বাধীনতাটা দিয়েছেন, সেটা শুধু আমকেই না দলের অন্য সদস্যদেরও সাহায্য করেছে। তিনি আমাকে চারে তুলে এনেছেন, আর তাঁর আসার পরে আমার ব্যাটিংয়ের ধরনও খানিকটা পাল্টেছে। শুরুর দিকে ভাবতাম চারে খেললে হয়তো নিজের সামর্থ্যের সেরাটা দিয়ে খেলতে পারবো, কিন্তু এখন আমি বিশ্বাস করি যে, আমি এখানে আরো ভালো করতে পারবো, এবং এ আত্মবিশ্বাস যোগানোর কাজটা করেছেন হাতুরুসিংহে। তিনি সবাইকে তার স্বাভাবিক খেলাটা খেলার লাইসেন্স দেন সেটা যেকোনো বলার কিংবা যেকোনো পরিস্থিতিই হোক। এবং এটা সবার আত্মবিশ্বাসের পারদকে অনেক উঁচুতে ঠেলে দেয়।

আইসিসি টুর্নামেন্টে তিন সেঞ্চুরির পরে বড় ম্যাচের খেলোয়াড় তকমা পেয়ে গেছেন। ব্যাপারটা কীভাবে দেখছেন?

– মানুষজন এভাবে বিচার করলে খারাপ যে লাগে তা কিন্তু নয়। কিন্তু প্রকৃত সত্যটা হচ্ছে, আপনি বড় ম্যাচের খেলোয়াড় কিনা তা একমাত্র ক্যারিয়ার শেষেই বলা যাবে। তার আগ পর্যন্ত আপনাকে পারফর্ম করে যেতেই হবে, যদি সেটা আইসিসি টুর্নামেন্ট হয় তাহলে ভালো লাগার পরিমাণটা বেড়ে যায়। ঐ পর্যন্তই, এরচেয়ে বেশি কিছু নয়।

টি টোয়েন্টিতে আপনার রোল সম্পর্কে কি বলবেন? উপভোগ করছেন?

– আমি এখানে আমার রোল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা রাখি কারণ কোচ আমাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তিনি বললেন, সাতে নেমে তোমাকে ফিনিশারের ভূমিকা পালন করতে হবে। আমি শর্টার ফরম্যাটেও আমার উপযোগ প্রমাণে কঠোর পরিশ্রম করছি। হ্যাঁ, একটু চ্যালেঞ্জিং তো বটেই, আমি সাধারণত একটু সময় নিয়ে খেলতে পছন্দ করি, কিন্তু এখানে সে সময়টা পাওয়া মুশকিল।

টেস্ট নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?

– টেস্টে অনেকবার ভালো শুরুর পরেও বড় ইনিংসে রূপ দিতে পারিনি, এটা আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এখানে ৪০-৫০ রান করা যথেষ্ট নয় কারণ আপনি আউট হলেই দল দারুণ চাপে পড়ে যাচ্ছে। সাদা পোশাকে আবার সুযোগ পেলে এ দুর্বলতাটা কাটিয়ে উঠতে পারবো আশা করি।

অধিনায়কত্ব নিয়ে কোনো আশা আছে কি?

– আমি দলে এখন যা করছি আপাতত তাতেই খুশি আছি, এর বেশি কিছু ভাবছি না। যদি আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কথা বলতেই হয় তা না হয় অন্য আরেকদিন বলা যাবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।