ক্লাস অডিয়েন্সের সেন্সিবল সিনেমা

হালদা নির্মাতা তৌকির আহমেদের পঞ্চম ছবি। গত বছর মুক্তি পাওয়া তার অজ্ঞাতনামা ছবিটি একটা সারটেইন ক্লাসের দর্শকদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিলো। সে ছবিতে অসাধারণ অভিনয় করে ফজলুর রহমান বাবু ব্যাপক রকম প্রশংসিত হয়েছিলো।

হালদায়ও ফজলুর রহমান বাবু আছেন। সাথে প্রধান চরিত্রে আছেন তিশা, জাহিদ হাসান, মোশাররফ করিমের মত অভিনেতারা। ফলে ছবিটি নিয়ে স্বভাবতই সবার একটা প্রত্যাশা ছিলো বা আছে। হালদা সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে কতটুকু সক্ষম হয়েছে বা হবে চলুন জানি সে বিষয়ে।

বিষয়, গল্প ও চিত্রনাট্য

সিনেমা বিষয়ক ইউটিউব চ্যানেল থিয়েটার থ্রেড-এর এক সাক্ষাৎকারে তৌকির আহমেদ বলেছেন ছবিতে তিনি নদী এবং নারীর গল্প বলেছেন। ছবিতে আমরা দেখি হালদা নামের একটি নদী এবং সেই নদী পাড়ের এক নারীর জীবন ও সংগ্রাম এক সাথে যেন মিশে গেছে।

হালদা চট্রগ্রামের একটি নদী যেটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহলের নানা অসৎ কর্মকাণ্ডের ফলে নদীটি ঝুঁকির মুখে পড়ে। এর ফলে হালদা পাড়ের সাধারণ মানুষদের জীবনও পড়ে ঝুঁকির মুখে। দরিদ্র জেলে মনু মিয়া (ফজলুর রহমান বাবু)-এর মেয়ে, প্রকৃতিতে বেড়ে ওঠা প্রকৃতিপ্রেমী চঞ্চলা হাসু (তিশা) হালদার মতই কুনজরে পরে স্বার্থান্বেষী মহলের সেই দুষ্টের শিরোমনি নাদের অর্থাৎ জাহিদ হাসানের।

হালদা কিংবা হালদা পাড়ের মেয়ে হাসু কি পারবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নাকি তারা জীবন যুদ্ধে হেরে যাবে!

তৌকির আহমেদ নদী এবং নারীর জীবন ও সংগ্রামকে এক সুতোয় গেঁথে যে গল্প বলেছেন তা বিষয় বস্তুর দিক থেকে হয়তো নতুন কিন্তু তার গল্প কিংবা চরিত্রে নতুনত্ব খুব একটা নেই। নদীর গল্পটা বাদ দিলে ছবির মূল যে গল্প অর্থাৎ হাসূর গল্প আসলে দর্শকদের তেমন নতুন কিছু দিতে পারেনি। এ ধরনের গল্প আমরা ইতিমধ্যে অনেক দেখিছি। আবার গল্প বলার ঢং-এ ও তেমন চমকপ্রদ কিছু নেই। তৌকিরের নিজস্ব স্টাইলে অত্যন্ত সহজ ভাবে গল্প উপস্থাপন করা হয়েছে। গল্প বলার এই যে সহজ ধরন এটা আসলে দোষের কিছু না যদি গল্প অত্যন্ত চমকপ্রদ বা স্পর্শকাতর কিছু ঘটনা বা চরিত্রের সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হয়। হালদা সেই জায়গাটায় বেশ দুর্বল ছিলো। নিঃসন্দেহে কন্সেপ্টটির সামাজিক এবং মানবিক মূল্য রয়েছে কিন্তু গল্পে নতুনত্বের অভাব সেই সামাজিক এবং মানবিক দিকটাকে ততোটা শক্তিশালী ভাবে উপস্থাপন করতে পারেনি।

আমি বলবনা যে হালদার গল্প কিংবা চিত্রনাট্য খারাপ হয়েছে। তবে গল্প বা চিত্রনাট্যে নতুনত্ব তেমন ছিলো না। আর এটাই হালদার সবচেয়ে বড় মাইনাস পয়েন্ট।

অভিনয়

ছবির প্রধান চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন তিশা, জাহিদ হাসান, মোশাররফ করিম, ফজলুর রহমান বাবু, রুনা খান এবং এরা প্রত্যেকেই অনেক বড় মাপের শিল্পী। হাসু চরিত্রে তিশা দারুণ। বলাই বাহুল্য এই মূহুর্তে বাংলাদেশের সেরা অভিনেত্রী তিশা। অন্তত আমার চোখে তার বিকল্প নেই।

তিশা যদি বাংলাদেশের সেরা অভিনেত্রী হয় তো ফজলুর রহমান বাবু আমার চোখের এই মূহুর্তে বাংলাদেশের সেরা অভিনেতা। এ ছবিতে তার চরিত্রের গুরুপ্ত তত বেশি না। তবে একজন জেলে চরিত্রে সে যতটুকু স্পেস পেয়েছে খুবই ন্যাচারাল অভিনয় করে গেছে। জাহিদ হাসান ভিলেন চরিত্রে উপভোগ্য। আর মোশাররফ করিম এবং রুনা খান চরিত্রানুযায়ী ভাল করেছে।

ডিরেকশন এবং টেকনিক্যাল দিক

তৌকির আহমেদ পরিচালক হিসেবে বরাবরই ক্লাসি। তাঁর বিশেষত্ব হচ্ছে তিনি বাংলার গল্প বলেন, বাংলাদেশের ছবি বানান এবং সম্পূর্ন সহজ-সরল একটা উপস্থাপন তাঁর ছবিতে আমরা বরাবরই পাই। হালদাও ব্যাতিক্রম না। যদিও হালদার গল্প একটু বেশিই ওল্ড স্কুল ড্রামা টাইপ। কিন্তু তৌকির আহমেদ নির্মাতা হিসেবে বরাবরের মতই নিজের কাজটা সততা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে থেকে সফল ভাবেই সম্পন্ন করেছেন।

ছবির সিনেমাটোগ্রাফী খুব রিয়েলিষ্টিক এবং কিছু কিছু শট অতি মনোরম। সমুদ্র-নদী-বৃষ্টি, প্রকৃতির এই তিন সৌন্দর্য ক্যামেরার চোখে ভাল ভাবেই আটকা পড়েছে। এডিটিংও শার্প। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সিম্পল তবে নোনা জল গানটি অনেক অনেক বেশী ভাল ছিলো।

ডায়লগ চট্রগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় হলেও বুঝতে সমস্যা হয়নি। উচ্চারণ এমন ভাবে করা হয়েছে যেন সবাই বুঝতে পারে। ডায়লগ ক্রিটিক্যাল দিক থেকে বিচার করলে সিম্পল ছিলো।

সবমিলিয়ে, হালদা ক্লাস অডিয়েন্স এর জন্য তৈরী একটি সেন্সিবল কন্সেপ্টের ছবি। গল্পটা আমার কাছে তেমন নতুন কিছু লাগেনি তবে যে উদ্দেশ্য নিয়ে ছবিটি বানানো হয়েছে অর্থাৎ যে সামাজিক বার্তা ছবিটি দিতে চেয়েছে সেই দিক বিবেচনায় ছবিটি অবশ্যই ভাল একটি ছবি।

নদী এবং নারী প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর এবং প্রয়োজনীয় সৃষ্টি। এদের উপর অত্যাচার করলে শেষ পর্যন্ত অত্যাচারকারীকেই চরম ফলাফল ভোগ করতে হবে। এই অতি সুন্দর এবং খুব বেশী প্রয়োজনীয় ম্যাসেজটির প্রতি পূর্ন সমর্থন জানিয়ে ছবিটিকে আমার পক্ষ থেকে থাম্বস্‌ আপ।

আর এটি বাদ দিলে শুধু মাত্র একটি বিনোদন মূলক ছবি হিসেবে দেখলে আমার কাছে এটি ডিসেন্ট লেগেছে। খুব অসাধারণ কিছু না হলেও খারাপ না। যারা সেন্সিবল ছবি দেখতে পছন্দ করেন তারা অবশ্যই ছবিটিকে দেখুন এবং সাপোর্ট করুন। আর যারা ছবিতে হিরোইজম, ডায়লগবাজি, নাচ-গান এসব মাসালা কন্টেন্ট পছন্দ করেন তারা এ ছবিতে তেমন কিছুই পাবেন না। সূতারং এই বিষয়টা জেনে এবং মেনেই তাদের ছবিঘরে যাওয়া উচিত।

আমি ছবিটিকে দিচ্ছি ৩.৫ অর্থাৎ ৭০% মার্কস বা গ্রেড ‘এ’।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।