ক্লাব ফুটবলে আনুগত্য ও নেইমার

ফুটবল বিশ্বে ‘লয়্যালিটি’ বা আনুগত্য নামে একটা টার্ম প্রচলিত আছে। আক্ষরিক অর্থে শব্দটার অর্থ হচ্ছে আনুগত্য। একজন খেলোয়াড় তার ক্লাবের প্রতি কতটা অনুগত এই বিষয়টা বোঝানোর জন্যেই মূলত শব্দটা ব্যবহার করা হয়।

আমাদের নিজ চোখে দেখা সবচেয়ে ‘অনুগত’ খেলোয়াড় সম্ভবত পাওলো মালদিনি। লোকটা ১৯৭৮ সালে এসি মিলানের যুব দলে খেলা শুরু করে সিনিয়র দলে সুযোগ পায় ১৯৮৫ সালে। এসি মিলানের হয়ে ২৬ টি বছর কাটিয়ে ৪১ বছর বয়সে অবসর নেন।

অনুগত খেলোয়াড়ের তালিকায় মালদিনির সাথে তীব্র প্রতিদ্বন্ধিতা করবে ফ্রান্সেসকো টট্টি। এই মানুষটিও সিনিয়র ক্যারিয়ারে ১৯৯২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত রোমা কে সার্ভিস দিয়ে গিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই খেলোয়াড়গুলো কেন তাদের ক্লাবের প্রতি এতটা লয়্যাল? আর বাকি যেসকল খেলোয়াড় যাযাবরের মতো ক্লাব থেকে ক্লাবে ঘুরে বেড়ায় তাদের কি টাকার প্রতি টান বেশি অথবা কম অনুগত?

এর উত্তরগুলো আলোচনা করার আগে একই টপিকসের ভিন্ন এরিয়ার কিছু উদাহরণ দেখি।

ধরুন আপনি পড়াশোনা শেষ করে একটা কোম্পানিতে এক্সিকিউটিভ পোষ্টে চাকুরিতে জয়েন্ট করলেন। আপনার প্রাথমিক বেতন ২৫০০০ টাকা। ২ বছর চাকরী করার আপনার বেতন সেই কোম্পানিতে দাড়ালো ৩৫০০০ টাকায়। পোষ্ট হলো সিনিয়র এক্সিউটিভ। আপনি এই কোম্পানিতে যথেষ্ট সুখী।

কিন্তু আপনি সুখী হতে চাইলেও এই ব্যাবসায়িক পৃথিবী আপনাকে সহজে সুখী হতে দিবে না। অন্য আরেকটা কোম্পানি আপনাকে অফার করলো ৭০০০০ টাকা, পোষ্ট দিতে চাইলো ম্যানেজার। সিনিয়র এক্সিকিউটিভ পোষ্টের পর এসিস্ট্যন্ট ম্যানেজার, ডেপুটি ম্যানেজার পোষ্ট, তারপর ম্যানেজার।

আপনি যে কোম্পানিতে চাকুরি করছেন সেখানে ম্যানেজার হতে অন্তত আরো ৫/৬ বছর সময় লাগবে। ৭০০০০ টাকা বেতন হতেও অন্তত আরো ৫ বছর সময় লাগবে। তার মানে বর্তমান অবস্থান থেকে ৫ বছর এগিয়ে যেতে চাইলে আপনাকে প্রতিষ্ঠান পাল্টাতে হবে, সিদ্ধান্ত আপনার।

তবে চাকুরি পাল্টালেও যে আপনি সফল হবেন সেটার নিশ্চয়তা নেই। বর্তমানে যে প্রতিষ্ঠানে আছেন সেখানে দুই বছরে নিজের একটা অবস্থান তৈরী হয়েছে। অন্য কোম্পানিতে গিয়ে নতুন করে আবার এই অবস্থান তৈরী করতে হবে। কাজটা সহজ নয়; নতুন পরিবেশ, নতুন কলিগ, নতুন চ্যালেঞ্জ। সফল হতে গেলেও কষ্ট করতে হবে।

এই পরিস্থিতিটা যারা চাকুরি করছেন তারা সবাই ফেস করেন। কেউ কেউ চাকুরি পরিবর্তন করেন, কেউ কেউ নিজের জায়গাতেই থাকেন। যারা চাকুরি পরিবর্তন করেন তাদের সবাই লাভবান হয় এমনটাও না তবে লাভবান হতে হলে আপনাকে অবশ্যই চাকুরি পরিবর্তন করতে হবে।

এক্ষেত্রে যে বিষয়টা এসে পড়ে সেটা হচ্ছে রিস্ক ফ্যাক্টর। আপনি কতটুকু রিস্ক নিয়ে তার বিনিময়ে কতটুকু অর্জন করতে পেরেছেন।

যারা কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ডের তাদের জানার কথা রিস্ক টেকিং অ্যাবিলিটি অনুযায়ী মানুষকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় –

১. রিস্ক নিউট্রাল

২. রিস্ক অ্যাভার্স

৩. রিস্ক সিকিং

যারা রিস্ক নিউট্রালে তারা কোন রিস্কের দিকে নজর কম দিয়ে রিটার্নের দিকেই লক্ষ রাখে। রিটার্নের সম্ভাবনা ৫০% কিন্তু রিস্ক ৫০%; এর চেয়ে রিটার্নের সম্ভাবনা ৮০% হলে তাতে রিস্ক ৯০% হলেও সেটা প্রেফার করে। রিস্ক অ্যাভার্স হচ্ছে যারা রিস্ক নিতে একেবারেই ইচ্ছুক নন। এই ধরণের মানুষ রিটার্ন একেবারেই কম হলেও রিস্ক নেওয়াটাকে প্রেফার করে না। আর রিস্ক সিকিং হচ্ছে যারা কিনা যে কোন বিষয়েই রিস্ক নিতে চায়। রিটার্ন নিয়ে এদের তেমন কোন চিন্তা নেই। সামান্য রিটার্নের সম্ভাবনা দেখলেই রিস্ক নিয়ে মাথা ঘামাবে না। ফুটবল বিশ্বেও স্বাভাবিক ভাবেই তিন ক্যাটাগরির মানুষ থাকে।

৩.

ফুটবলটাও অনেকটা চাকরীর মতো। আমি কিংবা আপনি ফ্যান হিসেবে বিবেচনা করলেও প্রফেশনাল খেলোয়াড়েরা ক্যারিয়ার হিসেবেই বিবেচনা করে। কাজেই তাদের ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্ত নিজের মতো করে নেবার অধিকার সবারই আছে।

টট্টি কেন ক্লাব পরিবর্তন করেননি?

একটা ক্লাবে কোন খেলোয়াড়কে রাখতে চাইলে দুই পক্ষেরই সমন্বয় থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। সেই সমন্বয়টা টাকা পয়সা সংক্রান্ত হতে পারে কিংবা অন্য কোন কারণেও হতে পারে। টট্টি হয়তো তার ক্যারিয়ার নিয়ে সুখে ছিলেন। তার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার টার্গেট হয়তো ছিল না। আমেরিকার মতো বড় দেশের একটা প্রদেশের মেয়রের চেয়ে বার্মার মতো ছোট দেশের প্রেসিডেন্টের সুবিধাও অনেক কম। কিন্তু এরপরেও অনেকে বার্মার প্রেসিডেন্ট হওয়াটাকেই প্রেফার করবে। টট্টি হয়তো তার ক্লাবে রাজা হয়ে থাকাটাকেই প্রেফার করেছেন।

ক্লাব পাল্টালেই সবাই ভালো করে না। শেভচেঙ্কো চেলসিতে আসার আগে দূর্দান্ত ছিলেন। চেলসিতে সুপার ফ্লপ। লিভারপুলে থাকা অবস্থায় দূর্দান্ত তোরেস চেলসিতে গিয়ে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলে ১১০ ম্যাচে করেন মাত্র ২০ টি গোল। বেকহ্যামও সুপার স্টার হিসেবে ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড থেকে রিয়াল মাদ্রিদে এসে প্রথম দিকে ফ্লপ ছিলেন।

টট্টিও আরেক ক্লাবে গেলে ফ্লপ হতেই পারতেন। আবার সফলও হতে পারতেন। টট্টি হয়তো এই রিস্ক নেবার সাহস টুকুই নিতে পারেন নি। আমি টট্টিকে ডিস-লয়্যাল বলছি না তবে সঠিক প্রমাণ ছাড়া লয়্যাল বলতেও আগ্রহী নই।
এই কথাটা যে কোন খেলোয়াড়ের জন্যেই প্রযোজ্য। এখানে টট্টিকে উদাহরণ হিসেবে দেখালাম।

৪.

নেইমার কেন ক্লাব পরিবর্তন করতে চাচ্ছেন? কেন এত রিউমার? যদি সত্যি সত্যি ক্লাব ছাড়েন তাহলে কি উনি ক্লাবের প্রতি অনুগত থাকবেন না?

নেইমার কেন ক্লাব পরিবর্তন করতে চাচ্ছেন সেটার সবচেয়ে সঠিক উত্তর একমাত্র নেইমারই দিতে পারবেন। আমরা কেবল অনুমানই করতে পারি। আমার নিজের কাছে যা মনে হয় সেরকম কয়েকটা সম্ভাবনা আমি বলছি।

অনেকের মতেই নেইমার ব্যালন ডি অরের জন্য ক্লাব পরিবর্তন করতে চাচ্ছেন। এই বিষয়টা আমার কাছে সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়। এটা একটা ফ্যক্টর হতে পারে তবে মুল ফ্যক্টর অবশ্যই না। বার্সালোনাতে থাকলে মেসির ছায়ায় থেকে নেইমারের পক্ষে ব্যালন পাওয়াটা কঠিন হবে। ব্যালন পাওয়ার জন্য দলগত সফলতার সাথে সাথে শুধু নেইমারকে ভালো খেললেই চলবে না, এর সাথে মেসিকেও খারাপ খেলতে হবে।

‘দিনহো থাকা অবস্থায় মেসি ব্যালনের শর্ট লিষ্টে এসেছিলেন’ – এই কথাটাকে যারা উদাহরণ হিসেবে তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে তখন দিনহো তার নিজের মান অনুযায়ী বেশ খারাপ খেলেছিল। মেসি যেমন সিরিয়াস কিংবা নিয়ম মেনে চলে তাতে তার ইদানিং খারাপ খেলার তেমন কোন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সবচেয়ে বড় কথা আগামী বছর ব্যলন ডি অরে মূল ফ্যক্টর হয়ে দাঁড়াবে বিশ্বকাপ। এই অবস্থায় ক্লাব পাল্টালে নিজের খেলায় আরো পরিবর্তন আসতে পারে যা কিনা জাতীয় দলেও ইফেক্ট ফেলতে পারে। কাজেই শুধু ব্যালনের জন্য নেইমারের অন্তত এই বছর বার্সা ছেড়ে পিএসজি-তে যাবার কথা না।

একটা ক্লাবে কোন খেলোয়াড়কে রাখতে চাইলে দুই পক্ষেরই সমন্বয় থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। মেসি কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো যে চুক্তির আগে কিছুটা সময় নেয় সেটাকে আমি মোটেও বাজে ভাবে দেখি না। এটাই প্রফেশনালিজম। আপনি আপনার নিজের মূল্য সঠিক ভাবে আদায় করতে না পারলে তার জন্য আপনাকে বোকা বলাটা মোটেও ভুল কিছু হবে না।

আজ যদি মেসি কিংবা রোনালদো পরপর ৩ সিজন খারাপ খেলে তাহলেই ক্লাব গুলো তাদের রুপ পালটে ফেলবে। বার্সালোনার রিভালদো কিংবা দিনহোকে একটা উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারেন। এটা ক্লাব গুলোর দোষও নয়। ক্লাব ম্যানেজম্যান্টের দায়িত্ব হচ্ছে ক্লাবের জন্য যেটা বেষ্ট হয় সেই সিদ্ধান্ত নেয়া। ব্যক্তির চেয়ে দল সবসময়েই বড়। যদি কখনো মনে হয় যে রন চলে গেলে রিয়ালের ভালো হবে কিংবা মেসি চলে গেলে বার্সালোনার ভালো হবে তাহলে ক্লাব সেই সিদ্ধান্তই নিবে। যত দেরিতে সিদ্ধান্ত নিবে তত ক্লাবের ক্ষতি হবে।

ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় নেইমারের যতটা মূল্য বার্সা ঠিক ততটা পে করে না। পত্রিকার সূত্র অনুযায়ী পিএসজি নেইমারকে বার্সালোনার চেয়ে তিনগুণ টাকা দিবে। অন্যান্য সুবিধাও অনেক। তাহলে নেইমার কেন থাকবে? ক্লাব বড়, সামনে সম্ভাবনা আছে, সুবিধাও অনেক, ক্লাবের মূল খেলোয়াড় – এসব ছেড়ে পিক টাইমে বার্সালোনায় থাকাটা বোকামিই।

নেইমার কিংবা অন্য কোন খেলোয়াড়ও তাই নিজের সিদ্ধান্ত নিলে সেটাকে সবার সম্মান জানানো উচিত। ফ্যান হিসেবে আপনার দুঃখ পাওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে এর জন্য একজন খেলোয়াড়কে অনুগত না বলাটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয় না।
মেসির ছায়ায় থাকা অবস্থাতেও কিন্তু বর্তমান বিশ্বের তৃতীয় সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নেইমারকে সবাই মেনে নেয়।

এই নেইমারের পিএসজি তে যাওয়াটা খুবই রিস্কি। হ্যা, এটা হতে পারে যে এই মূহুর্তে পিএসজিতে গেলে নেইমার সময়ের সেরা তিন থেকে ছিটকে যেতে পারে। কিন্তু বড় হতে চাইলে এই টুকু রিস্ক আপনাকে নিতে হবে।

খুব ভালো খেলে ফ্রেঞ্চ লিগ চ্যাম্পিয়ন হলেও নেইমার আলোচনায় খুব কমই আসবে। আলোচনায় আসার একমাত্র উপায় হচ্ছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা। সেটা খুব সহজ কাজ নয়। আবার বার্সালোনা থেকে বের হয়ে অন্য ক্লাব পাওয়াটাও খুব সহজ নয়।

নেইমারকে নিতে পারবে এমন ক্লাব হাতে গোনা কয়েকটাই। এর মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদে তার না যাবার সম্ভাবনাই বেশি। বাকি থাকে বায়ার্ন, ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড আর ম্যানচেষ্টার সিটির মতো দল। ল্যাটিন খেলোয়াড়দের সাথে এদের খেলার স্টাইলটা খুব যায় না। পিএসজি তাই বিকল্প হিসেবে আপাতত বেটার।

নেইমারকে পিএসজি নিলেও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করেই নিচ্ছে। নেইমারকে নেওয়ার উদ্দেশ্য এটা নয় যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এই সিজনেই জিততে হবে। আগামী ৪ সিজনের মাঝে একটা জিততে পারলেও তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য সফল হবে।

বার্সায় থেকে বর্তমান বিশ্বের তৃতীয় সেরা খেলোয়াড় অথবা অন্য ক্লাবে গিয়ে ইতিহাস গড়ার রিস্ক। নেইমার কোনটা নিবে সেটা হয়তো আর কয়েকদিন পরেই বুঝা যবে। তবে যেটাই নিক, একজন ফুটবল সমর্থক হিসেবে চাইবো নেইমার যেন তার খেলার ছন্দটা ধরে রাখতে পারেন।

৫.

সবশেষে একটা কথা বলি। আমার চোখে অন্যতম একজন অনুগত খেলোয়াড় হচ্ছেন জিয়ানলুইজি বুফন। ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকা অবস্থাতেও জুভেন্টাস সিরি বি তে নেমে যাবার পরেও ক্লাবের সাথেই ছিলেন। ক্লাবের দুসময়েও ক্লাবকে ছেড়ে যাননি। তাকে অনুগত বলাটা হয়তো অন্যায় হবে না।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।