কোথায় থামবেন স্টিভি?

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘যে মূলা বাড়ে, তার প্রথম দুটো পাতা দেখলেই বোঝা যায়’! অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রবাদটা সঠিক বলে প্রমানিত হয়েছে, কিন্তু কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ ছিলেন বা আছেন, যারা এই প্রবাদের গুরুঅর্থের বিপরীতে গিয়ে প্রবাদকে ভুল প্রমানিত করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান ক্যাপ্টেন স্টিভেন স্মিথ ওই বিরল শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে একজন।

ক্রিকেটে ইন্টারেস্ট আছে, কিন্তু স্মিথকে জানেন না এমন ক্রিকেটপ্রেমী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাই, নতুন করে স্মিথের জন্ম ঠিকুজি লিখব না। খুব সংক্ষেপে একটা ধারনা দেবার চেষ্টা করছি। ১৯৮৯ সালে অস্ট্রেলিয়ান বাবা এবং ইংলিশ মায়ের কোল আলোকিত করে জন্মগ্রহন করেন স্মিথ। পুরো নাম স্টিভেন পিটার ডেভারাক্স স্মিথ। ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন একজন লেগ স্পিন বোলিং অলরাউন্ডার হিসাবে, যে কিনা ৮/৯ নং পজিশনে ব্যাট করে। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে টেস্ট ক্রিকেটের বর্তমান সেরা ব্যাটসম্যান বাই অ্যা ফার ডিসট্যান্স।

শিরোনামে লেখা বাক্যটি ছিল, কোথায় থামবেন স্টিভি? যখন কোন ক্রিকেটারের বিষয়ে এমন প্রশ্ন উঠে আসে, তখন বুঝতে হবে সেই ক্রিকেটারটি হয় খুব বাজে সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন অথবা খুব অতিমানবীয় কোন কীর্তির হাতছানি তার সামনে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপ্টেন স্মিথির জন্য বাক্যের দ্বিতীয় অংশটা সত্য। একজন লেগ স্পিনার হিসাবে ক্যারিয়ার শুরু করা স্মিথ ইতোমধ্যেই খেলে ফেলেছেন ৫৯টি টেস্ট, কিন্তু নিয়েছেন মাত্র ১৭ উইকেট! তাহলে এখানে অতিমানবীয় কোন ব্যাপার কোথায়? অতিমানবীয় ব্যাপারটা আসলে মুদ্রার অপর পাশে। এই ৫৯ টেস্টে স্মিথি প্রায় ৬৩ গড়ে করে ফেলেছেন ৫৭৯৬ রান! গড়টা ব্র্র্যাডম্যানিয় নয়, তবে আধুনিক ক্রিকেটে এটা অতি অবশ্যই আশ্চর্যের।

ক্যারিয়ারের শুরুতে অস্বাভাবিক গড়ে রান করে যাওয়া ক্রিকেটার এই নিকটবর্তী সময়েও অনেক দেখেছে ক্রিকেটপ্রেমীরা। বাংলাদেশের মমিনুল হক, অস্ট্রেলিয়ার ভোজেস, এরা এমনকি ৭০+ গড়ের মালিক ছিলেন ক্যরিয়ারের শুরুতে! কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এদের গড় নেমে এসেছে তাদের প্রকৃত ক্যালিবারে। ঠিক এখানেই স্মিথ আলাদা, শুরু করেছিলেন একজন গড়পড়তা ব্যাটসম্যানের মত, কিন্তু প্রতিটা সিরিজ শেষেই গড় বাড়িয়ে চলেছেন। চলতি অ্যাশেজে এখন পর্যন্ত স্মিথের গড় ১৪২! গড়ের গ্রাফটা যেভাবে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে, সেটার সুত্র ধরে স্মিথ ঠিক কোথায় গিয়ে থামবেন সেটা নিয়ে আলোচনার অবকাশ থেকে যায় বৈকি।

ক্যাপ্টেনসি নাকি ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে ব্যাঘাত ঘটায়। এই প্রচলিত ধারণাটাকে ব্র্যাডম্যান পরবর্তী যুগে নতুন করে ভেঙ্গে চলেছেন স্মিথ। অ্যাজ অ্যা ক্যাপ্টেন, স্মিথের গড় ৭৪! ব্র্যাডম্যানের পর ক্যাপ্টেন হিসাবে এই পরিমান গড়ে কেউ রান বানায়নি ওই বাইশ গজে। স্মিথের কাছাকাছি আছেন সময়ের আরেক সেরা ব্যাটসম্যান ভারতীয় ক্যাপ্টেন বিরাট কোহলি। কোহলি ক্যাপ্টেন হিসাবে রান তুলছেন ৬৭ গড়ে।

কোহলির এই অর্জনকে যদি এই যুগের হিসাবে সুপার হিউম্যানিক আখ্যা দেয়া হয়, স্মিথের অর্জনকে একটা জুতসই বিশেষনে বিশেষায়িত করতে শব্দের হাহাকার লেগে যাবার কথা। বোর্ডার, চ্যাপেলরা অস্ট্রেলিয়ার সোনালী সময়েও ক্যাপ্টেন হিসাবে ৬০ গড়ের ব্যারিয়ার পার করতে পারেননি। এমনকি পাফ বা পান্টারও আটকে ছিলেন ৫১ গড়ে। সেই হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার পড়ন্ত বিকেলে অনেকটা একা হাতেই টেস্ট ধ্বজা উঁচিয়ে ধরা স্মিথের গড়টা হাইলি ইউনিক। অধিনায়ক হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরি পান্টারের, ১৯টি সেঞ্চুরি করতে তার লেগেছে ৭৭ ম্যাচ, বিপরীতে স্মিথ ২৯ ম্যাচেই করে ফেলেছেন ১৪টি সেঞ্চুরি।

তার ব্যাটিং টেকনিক এতটাই আনঅর্থোডক্স, কোন কোচই তার ছাত্রকে এটা ফলো করতে দেবে না। কিন্তু সেই টেস্ট ম্যাচের অনুপযুক্ত একটা টেকনিককে নিজের সুবিধামত একটা শিল্পে পরিনত করেছেন তিনি। বোলার বল করবার আগেই শাফল করছেন, রোটারি মুভমেন্টে ব্যাট নামিয়ে আনছেন, বাকি কাজটা করে দিচ্ছে শক্তিশালী বটম হ্যান্ড! হ্যান্ড আই কোর্ডিনেশনের জলজ্যান্ত উদাহরন! কিন্তু এখানে একটি পার্থক্য আছে, বল মিটিংয়ের সময় তার ব্যাট সবসময় ফুল ফেস প্রেজেন্ট করে। ইউনিক বাট নট দ্যাট এজি ইউ থিঙ্ক। নিজের ব্যাটিং নিয়ে সে এতটাই সিরিয়াস যে, নিজের ফিয়ান্সেকে দিয়ে বাড়ির আঙিনায় বোলিং মেশিন অপারেটরের কাজ করিয়েছেন। প্রেম করার সময়টাও ক্রিকেটে কাজে লাগানোর এমন অদ্ভুত উদাহরন দ্বিতীয়টি আছে কিনা সেটা আমার জানা নেই।

যেভাবে এগোচ্ছেন টেস্ট ক্রিকেটে, তাতে ইতোমধ্যেই তুলনা এসেছে অনেকের সাথে। সার্বিক বিবেচনায় বর্তমান সময়ে কোহলি ছাড়া তেমন কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, কিন্তু স্মিথের বর্তমান অর্জনই অতীতের অনেক গ্রেটের সাথে তুলনা করার যোগ্য। পান্টার অথবা পাফের লেভেলে পৌঁছাতে হয়ত পাড়ি দিতে হবে অনেকটা পথ, কিন্তু বর্তমান অর্জনের হিসাবে অনেক আগেই পেছনে পড়ে গেছেন তারা। বয়স মাত্র ২৮, খেলবেন হয়ত আরও মিনিমাম আট বছর। এই আট বছরে হয়ত অসংখ্যবার উত্থান পতন হবে ফর্মের, হয়ত এক্সট্রিম প্রেশার আসবে বারবার, হয়ত ৬২ গড়টা নিচে নেমে আসবে চোখ সহনীয় পর্যায়ে। স্মিথ নিজেও জানেন এই টার্মগুলো, কিন্তু এই ‘হয়ত’ শব্দটাতে আপত্তি জানানোর অসংখ্য কারন তার হাতেও রয়েছে।

চাপে ভালো খেলেন, নিজের ব্যাটিং নিয়ে সিরিয়াস, ইউনিক টেকনিক, সাফল্য ক্ষুধা এবং সেই সাথে চিরায়ত ঘাড় উঁচু অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপ্টেনের তকমা! কি মনে হয়, স্মিথের ক্যারিয়ারের গ্রাফ নিম্নমুখী হবে ভবিষ্যতে? গত তিন বছরে স্মিথকে যেভাবে দেখেছি, তাতে করে এই ভবিষ্যৎবাণী করার দুঃসাহস আমার অন্তত নেই। হি ওয়াজ বর্ন টু বি অ্যা চ্যাম্পিয়ন অ্যান্ড নাউ হি ইজ অলরেডি অ্যা চ্যাম্পিয়ন। এখন দেখার বিষয়, তিনি চ্যাম্পিয়নের চ্যাম্পিয়ন হতে পারেন কিনা! ঘুড়ির লাটাই স্মিথের হাতেই আছে, কতটুকু সুতা তিনি ছাড়েন সেটা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।