কোচের সঙ্গে আমার দূরত্বের খবর ছাপানো বোকামী: মাশরাফি

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলে মাশরাফি বিন মুর্তজা ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম ভার্সনে নিজের ক্যারিয়ারের যবনিকা টেনেছেন বছরের শুরুতে।

তাঁর এ আচমকা অবসরে ভক্তরা একদিনের ক্রিকেট থেকেও তাঁর অবসর নিয়ে নেওয়ার প্রমাদ গুনছিলেন। এসবকে স্তিমিত করতেই অধিনায়ক ম্যাশ বলেন, ‘অবসর তখনই নেবো যখন দেখবো খেলাটাকে আর উপভোগ করছি না।’

বাংলাদেশের দলপতি কোচ চান্দিকা হাতুরুসিংহের সাথে তাঁর সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের অগ্রগতি সম্পরকেও নিজের মতামত ব্যক্ত করেন ক্রিকবাজের বাংলাদেশ প্রতিনিধি আতিফ আজমকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে। অনুবাদ করেছেন নেয়ামত উল্লাহ।

– শ্রীলঙ্কা সফরে যখন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণ করলেন, তখন গুঞ্জন উঠেছিলো আপনার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণ নিয়েও। গত সপ্তাহে বিসিবি সভাপতি বললেন বোর্ডের এমন কোনো পরিকল্পনাই নেই। আপনার মতামত?

মাশরাফি: প্রথমেই বলে রাখি আপনার এটা বিবেচনায় রাখা উচিত কারা এমন অনুমান করছে এবং কি কারণে করছে। আমি জানি কেন এমনটা করা হচ্ছে, কিন্তু আমার কাছে এসব কোনো ব্যাপারই না যেহেতু আমি জানি আমি কখন অবসর নেবো। দ্বিতীয়ত, আমি শতভাগ নিশ্চিত, যদি আমি খেলাটাকে উপভোগ না করি, আমি কিছু সংকেত পাবো, এবং তখনই আমি নিজেকে খেলাটা থেকে সরিয়ে নেবো। যেমন ধরুন, যদি আমি বুঝে যাই যে ফিটনেস ক্যাম্পটা আমার জন্য বোঝা যাচ্ছে, তখনি ধরে নেবো আমার সময় ফুরিয়ে আসছে।

সত্যি বলতে কি, আজ পর্যন্ত এমন কিছু আমি অনুভব করিনি। ১৭-১৮ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে যাচ্ছি মাথা উঁচু করেই। সময় শেষ এটা বুঝে যাওয়ার পরেও এক দেড় বছরের মতো খেলা চালিয়ে গিয়ে নিজের সম্মান নষ্ট করতে চাইনা। এটুকু বলতে পারি, কখন আমাকে থামতে হবে এটা বুঝার মতো জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা আমার আছে।

– তারপরও, বোর্ড সভাপতির কথা তো কিছুটা হলেও আপনাকে নিশ্চিন্ত করছে…

মাশরাফি: দেখুন, আমি আগে খেলোয়াড় তারপরে অন্যকিছু। সেই অভিষেকের দিন থেকে আমি দলে জায়গা করে নেয়ার জন্যে সংগ্রাম করছি, ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটা পর্যন্ত চাইবো আমি যেন আমার পারফরমেন্সের বেসিসে দলে জায়গা করে নিতে পারি। অন্য কোন কিছুর খাতিরে নয়।

– আপনি অবসর নেবার ক্ষেত্রে কিছু সংকেত পাবার কথা বললেন। টি টোয়েন্টি থেকে যখন অবসর নিলেন তখন কি এমন কিছু অনুভব করেছিলেন? মানে, সবকিছু এতো তাড়াতাড়ি ঘটে গেলো…

মাশরাফি: অবশ্যই, সিদ্ধান্তটা নিতে আমার বড়জোর ত্রিশ সেকেন্ডের মত সময় লেগেছে, আর একবার যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি ওখান থেকে আর পিছনে ফিরে তাকানোর চেষ্টাও করিনি। প্র্যাকটিসে গেলাম, মনে হলো টি-টোয়েন্টিটাকে উপভোগ করছিনা আর তখনি সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছি।

– কি মনে করেন, একদিনের ক্রিকেটকেও এভাবেই বিদায় জানাবেন?

মাশরাফি: কে জানে! তবে একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত অন্যেরা বোঝার আগেই আমি বুঝে যাবো যখন আমার সময় শেষ হবে।

– ফিটনেস ক্যাম্প কেমন চলছে?

মাশরাফি: ভালোই চলছে। তিন সপ্তাহের ক্যাম্প, আশাকরি সবাইই নিজেদের ফিটনেস ঝালিয়ে নেবে এখান থেকে। তারপরও আমার মনে হচ্ছে ছয় সপ্তাহের হলে আরেকটু ভালো হতো।

– অধিনায়কত্বে ফেরত আসি। অধিনায়কত্বে আপনার আগের অভিজ্ঞতা খুব সুখকর ছিলো না। এবার যখন অধিনায়কত্ব পেলেন এ রোলে নিজেকে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিলো না?

মাশরাফি: সত্যি বলতে কি, আগের দুবারের কথা মাথায় রেখে এবার আমি এটা নিতে ইচ্ছুক ছিলাম না। আগের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই আমি সাধারণ খেলোয়াড় হিসেবে পারফর্ম করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করি। আমার বাবা আমার পুনরায় অধিনায়কত্ব নেবার পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছেন। তিনি বলেন যে ‘তুমি তোমার ভাগ্যের সাথে এভাবে যুদ্ধ করে যেতে পারো না।’

– নিজেকে তৃতীয়বারের মতো অধিনায়ক হিসেবে দেখবেন এটা কল্পনা করেছিলেন কখনো?

মাশরাফি: অতি অবশ্যই না। এটা কল্পনাতীত ছিলো। যেমনটা বলছিলাম, আগের দুবারের অভিজ্ঞতা আমার মনে খুব বড় প্রভাব ফেলে গিয়েছে। এমনটা না যে আমি খারাপ খেলছিলাম কিংবা আমার নেতৃত্বে দল ভালো করছিলো না, ইনজুরিই ছিটকে দিলো! তখন পর্যন্ত লক্ষ্য ছিলো ২০১৫ পর্যন্ত খেলে যাওয়া, পরেরটা দেখা যাবে। তখনই হঠাত করে ২০১৪ এ আমাকে অধিনায়কত্ব দেয়া হলো, এরপর তো জানেনই। সে সময়ে বাবা বলেছিলেন, আগেরবার তোমার নেতৃত্বগুণ দেখাতে পারনি, এটা তোমার আরেকটা সুযোগ, যা তোমার লুফে নেওয়া উচিত। ভাগ্যিস তার পরামর্শ কানে তুলেছিলাম!

– কখনো কি মনে হয়েছে অধিনায়কত্বের জন্য নিজের বোলিংয়ের ক্ষতি হয়েছে?

মাশরাফি: না। আমি ব্যাপারটাকে এমনভাবে দেখিনা। অধিনায়ক হিসেবে আমাকে সিদ্ধান্ত নিতেই হয়, কিন্তু দলে আমার প্রথম রোল কিন্তু একজন বোলার হিসেবেই। নিজেকে তখনই বোলিংয়ে আনি যখন পরিস্থিতি দাবি করে। আমি জানি যখন বল হাতে থাকে তখন আমাকে একটা ভালো শুরু এনে দিতে হবে, চাই সেটা ব্রেক্তহ্রু এনে দিয়েই হোক কিংবা রান আটকে রেখে। এবং তখন পরিপূর্ণ মনোযোগ সেখানেই থাকে।

– কোচ হাতুরুসিংহের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন? কারণ বিভিন্ন সময়েই বাইরে থেকে মনে হয় সুরটা হয়তো কোথাও না কোথাও কেটে যাচ্ছে!

মাশরাফি: আমি বিশ্বাস করি আমরা একে অপরকে খুব ভালোভাবে চিনি, জানি। যখন একটা বড় সময় ধরে আপনি কারো সাথে কাজ করবেন কখনো কখনো সুর কেটে যাওয়ার ব্যাপারটা মনে হতেই পারে, আমাদের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই। আমাদের সমাজে এটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। যখন ছোটখাটো কিছু ভুল হয় তখন লোকজনকে বলতে শুনি আমদের মাঝে নাকি ভালো বোঝাপড়া নেই। যে কারো পক্ষে এ মন্তব্য করা সহজ। তাদেরকে এসব থেকে বিরত রাখা অসম্ভব কারণ তারা প্রকৃত সত্যটা জানে না। কারো সাথে যদি আপনি অনেকটা পথ পাড়ি দেন তখন ছোটখাটো চড়াই উতরাই থাকবেই।

এমন সময় আসবেই যখন আপনি একমত হতে পারবেন না এবং আপনার নিজস্ব মতামত তুলে ধরবেন। গুরুত্বপুর্ণ ব্যাপারটা হচ্ছে আপনাদের মধ্যে বিশ্বাস, শ্রদ্ধাটা আছে কি না। যদি পারস্পরিক বোঝাপড়াটা না থাকে তাহলে ভালো ফলাফল করা অসম্ভব। যদি ফলাফল আপনার পক্ষে আসে তাহলে আমি মনে করিনা আর কথা বলার প্রয়োজন আছে। কখনো আমি একভাবে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছি, তিনি সেটাকে অনুমোদন দিয়েছেন। পরে সেটা ব্যাকফায়ার করার পরেও তিনি আমাকে কিছু বলেন নি। কখনো এমন হয়েছে তিনি বলেছেন ‘কাজটা এভাবে করা উচিত।’ আমিও মনে করলাম ‘আচ্ছা এভাবে নাহয় একবার করেই দেখি’ সেটা ক্লিক করুক কিংবা না করুক আমরা একে অপরকে কখনো দোষারোপ করিনি কখনোই। এ ব্যাপারটাই আমাদের সাফল্যের নিউক্লিয়াস। আমাদের মাঝে দূরত্বের খবর ছাপানোটা বোকামি বলেই আমি মনে করি।

– তো আপনি বলছেন কোনো সমস্যাই নেই?

মাশরাফি: আমরা যেহেতু একসাথে থাকছি না, সেহেতু আমাদের কোন প্রকারের ব্যক্তিগত সমস্যা থাকারও কোন সম্ভাবনা নেই। আমাদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আমাদের ক্রিকেটটাকে কি করে লাভবান করা যায়। তো এটা বলা যায় যে আমাদের মধ্যকার দূরত্বের সব খবর নির্জলা মিথ্যা।

তাঁর যে ব্যাপারটা আমি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করি টা হলো তাঁর কাঁচের মতো স্বচ্ছ মন। এর ভালো দিকটা হচ্ছে নিজেদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া গড়ে উঠে, আর ব্যাকবাইটিংয়ের শিকার হবার ভয়টা থাকেনা। আমরা একে অপরের সাথে মতামত আদান প্রদান করি। আমরা জানি মানুষ হিসেবে আমরা ভুলের উর্ধ্বে নই, কিন্তু আমরা একে অপরকে দোষারোপ করতে রাজি নই।

– কখন মনে হলো আপনি একটা দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন?

মাশরাফি: এখনও না (হাসি)। পুরো ক্যারিয়ারে কখনো চিন্তাও করিনি। খেলে যাওয়াটা আমার জন্য জরুরি অতিতেও ছিলো এখনো আছে। ক্যাপ্টেন্সির দায়িত্ব যখন ঘাড়ে এসে পড়লো তখনই ক্যাপ্টেন্সি শিখেছি। ক্যাপ্টেন ম্যাটেরিয়াল খেলোয়াড় কিন্তু এখনো দলে অভাব নেই।

– কোন ব্যাপারটা আপনাকে একজন সহজাত নেতা বানায়?

মাশরাফি: আমি সেটা সেভাবে অনুভব করিনি কখনো। আমি আমার মতো থাকতে চাই এবং দায়িত্বটা ঠিকঠাক পালন করে যেতে চাই। হয়তো সাঝঘরে আমি সুখী আবহটা ধরে রাখতে চেষ্টা করি আর তাতেই ভালো ফলাফল আসে। আমি জানি সাঝঘরে নিজেকে অনাহুত অতিথি ভাবার অনুভূতি কেমন। আমি চাইনা আমি অধিনায়ক থাকাকালীন কেউ ড্রেসিংরুমে এমন পরিস্থিতির শিকার হোক কারণ এখানে সবাইই নিজের যোগ্যতাবলে এসেছে।

সিনিয়ররা যদি তাদেরকে খোলামনে বরন করে না নেয় তাহলে নবীনদের পারফর্ম করাটা কঠিন হয়ে যায়।

– আপনি কি মনে করেন যে, বাংলাদেশ দলে সিনিয়ররা অটো চয়েস হয়ে পড়েন? বাংলাদেশের ১০০তম টেস্টে দল থেকে বাদ পরার পরে ওয়ানডে সিরিজে মাহমুউল্লাহর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আপনিই তো সবচেয়ে বেশি কথা বলেছিলেন।

মাশরাফি: দেখুন আপনি অভিজ্ঞতা বাজার থেকে কিনতে পারবেন না। মাহমুদউল্লাহকে ছাড়া হয়তো আমরা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমি ফাইনাল পর্যন্ত যেতে পারতাম না। যতক্ষণ পর্যন্ত সিনিয়ররা নিজেদের দায়িত্ব পালনে উৎসাহী আছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তাদের ওকালতি করতে চেষ্টা করি। হ্যাঁ, অফফর্মে থাকলে সেটা অন্য ব্যাপার।

– ইনজুরইগুলোর জন্য কখনো আফসোস হয়?

মাশরাফি: আগে হতো, কিন্তু এখন মনে হয়, এসব ইনজুরি আমাকে শিখিয়েছে অনেক কিছুই। ইনজুরি থেকে ফেরা এতো সহজ নয়, যখনি আমি ইনজুরি থেকে মাঠে ফিরেছি তখনি আমি চেষ্টা করেছি নিজের সামর্থ্যের চেয়ে কিছুটা বেশি দিতে যাতে করে আমার উপস্থিতি সবাই টের পায়।

– কি মনে করেন, বাংলাদেশ বড় দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার মতো বক্সিং রিংয়ে ঢুকে গেছে? নাকী এখনো বহুপথ বাকি?

মাশরাফি: আমি মনে করিনা আমরা এখনো সে পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছে। দেশের মাটিতে ভালো করাটা করার বিদেশের মাটিতেও ভালো করার অনুপ্রেরণা যোগায়। এবং দেখুন আমরা বিদেশের মাটিতেও ভালো করতে শুরু করে দিয়েছি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।