কেমন হবে ডুব?

আর মাত্র কয়েক ঘন্টা। তারপরই প্রেক্ষাগৃহে ঝড় তুলবে মোস্তফা সারয়ার ফারুকীর বহুল প্রত্যাশিত সিনেমা ‘ডুব’। ছবিটি নিয়ে বেশ ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল সংশ্লিষ্ট সবাইকে। মাঝে দিয়ে একবার নিষিদ্ধও করা হয়েছিল। ছবির গল্পের সঙ্গে নাকি নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জীবনীর মিল রয়েছে, এবং তার পরিবারকে হেয় করা হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে সেন্সর বোর্ডকে চিঠি দিয়েছিলেন অভিনেত্রী ও নির্মাতা মেহের আফরোজ শাওন। এরপর থেকেই মূলত ছবিটি নিয়ে চারদিকে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। যাই হোক, সব কল্পানা-জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পর্দা ওঠতে যাচ্ছে ‘ডুব’–এর।

‘ডুব’ কি সত্যিই হুমায়ূন আহমেদের বায়োপিক, নাকি হুমায়ূন আহমেদের জীবনের বিশেষ একটা অধ্যায়ের ছায়া অবলম্বনে নির্মাণ করা চলচ্চিত্র—এইটা নিয়ে আপাতত বিতর্কে না-ইবা গেলাম।

এখন কথা হচ্ছে, কোন দু:খে আপনি ‘ডুব’–এ ডুব দিতে যাবেন? চলুন দেখে নেওয়া যাক ‘ডুব’–এর কিছু আকর্ষণীয় বিষয়, যা আপনাকে সিনেমাহলে গিয়ে ডুব দিতে সাহায্য করবে।

১.

মুক্তির আগেই বিদেশের মাটিতে সিনেমাটি বেশ প্রশংসিত হয়েছে। ভিনদেশি চলচ্চিত্র সমালোচকরা ভূয়সী প্রসংশা করেছেন ছবিটির পরিচালক এবং অভিনয়শিল্পীদের। ‘২০তম সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ ও ‘৩৯তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎ​সব’–এর মত ফেস্টিভালে প্রশংসা পেয়েছে। এমন কি পজিটিভ রিভিউ পেয়েছে ‘হলিউড রিপোর্টারে’র কাছ থেকেও। বিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক দেবোরাহ ইয়াং বলেছেন—‘ডুব’ একটি পরিচ্ছন্ন ও সুনির্মিত চলচ্চিত্র।

‘হলিউড রিপোর্টারে’ তিনি ডুব সিনেমার সার-সংক্ষেপ লিখেন এভাবে— ‘প্রচলিত গণ্ডির বাইরে এসে, একজন নামকরা চলচ্চিত্রকার তার বহুদিনের স্ত্রী ও কিশোর ছেলেমেয়েদের ছেড়ে দিয়ে, জীবনসঙ্গী করে নেন নিজ কন্যার বান্ধবীকে। এটি কোনও হত্যার কাহিনী নয়। এটি বরং মানুষের অহংকার ও আত্মমর্যাদার কাহিনী, যা ঢাকা শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের অবস্থান প্রবলভাবে নাড়িয়ে দেয়, এবং প্রতিটি সদস্যের মন ভরিয়ে দেয় কষ্ট-যন্ত্রনা আর অনুতাপে।’

নির্মাতা ফারুকী সম্পর্কে তিনি লিখেন—‘চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এ সিনেমায় পরম যত্নের সঙ্গে বেশ কিছু জটিল বিষয় তুলে ধরেছেন দর্শকের সামনে, যা এই ছবিকে করে তুলেছে বেশ প্রাণবন্ত ও বাস্তবধর্মী।’

২.

ট্রেলারেও এমনটা আভাস পাওয়া যায়। শুরুতে ব্যাকগ্রাউন্ড ভয়েসে শোনা যায়—‘তিনি ছিলেন কৌতূহলী একজন মানুষ। এ কৌতূহলই হয়ত তাকে নিয়ে গিয়েছিল প্রেমের জটিল উদ্যানে। তিনি তাঁর মেয়েকে কাঁদিয়েছেন। কখনো নতুন প্রেমের আক্ষেপের কারণ হয়েছেন। কখনো অন্যের আশাভঙ্গের বেদনার কারণ হয়েছেন। কখনো নিজেই নিজেকে নিয়ে খেলা করে ভালোবাসার দেবালয় ছেড়ে এসেছেন অবলীলায়। কিন্তু, ভালবাসা কখনোই তাঁকে ছেড়ে যায় নি। মৃত্যুতে ভালবাসার নতুন চারা ডানা মেলেছে।’

সত্যিই তিনি কৌতূহলী ছিলেন। তিনি মানুষকে ভালবাসা কী, এবং কাকে বলে, তা শেখাতেন। অথচ, তিনি নিজেই একসময় ভালবাসার জন্য হাহাকার করে ঘুরে বেড়িয়েছেন। হারিয়ে গেছেন হতাশার রাজ্যে, ডুব দিয়েছেন দ্বিধার রাজ্যে। পরিবার থেকে নির্জনে চলে গেছেন। ঠিক সেই–সংকটময় সময়ে একজন তরুণী হারিয়ে যাওয়া ‘তাকে’ উদ্ধার করেন। নতুন করে ভালবাসা কাকে বলে, তা শেখান। নতুন করে বাঁচতে শেখান। কিন্তু মেয়ের সমবয়সী কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করলে সমাজের জাতটা যে চলে যায়!

যাই হোক, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ভাঙা-গড়ার আখ্যানকে কেন্দ্র করেই মূলত সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে। সম্পর্কের টানাপড়েনকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এমন ভাঙা-গড়ার আখ্যান দেখতে হলে আপনাকে অবশ্যই সিনেমাহলে যেতে হবে।

৩.

কলকাতার ‘এসকে মুভিজ’ ও বাংলাদেশের ‘জাজ মাল্টিমিডিয়া’র এই সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন একঝাঁক পরীক্ষিত অভিনেতা। চলুন, তাদের সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেই।

ইরফান খান—এই সিনেমার মূল চরিত্র জাবেদ হাসানের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। তার স্কুল শিক্ষিকা স্ত্রী মায়া’র ভূমিকায় আছেন অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী। ভারতীয় সিনেমার এই কিংবদন্তিকে নিয়ে নতুন করে কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘লাঞ্চবক্স’ ‘পিকু’ কিংবা হলিউডের সাড়া জাগানো চলচ্চিত্র ‘লাইফ অফ পাই’ ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’ ‘ইনফার্নো’ যারা দেখেছেন, তারা ভালভাবেই তাকে চিনবেন। সিনেমার জাবেদ হাসান চরিত্রটিকে যে তিনি পুরোপুরিভাবে নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন, তা ট্রেলারেই স্পষ্ট।

সিনেমার অন্যতম একটি শক্তিশালী চরিত্র হচ্ছে নির্মাতা জাবেদ হাসানের মেয়ে সাবেরি। নুসরাত ইমরোজ তিশা এই সাবেরি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিশার অভিনয় নিয়েও নতুন করে কিছু বলার নেই। বাস্তবসম্মত ও আবেগপ্রবণ এই চরিত্রটি সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলতে যা যা করা দরকার, আশা করা যায় তার সবকিছুই করেছেন তিনি, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

মেয়ে সাবেরির সহপাঠি নিতুর ভূমিকায় থাকছেন ভারতীয় অভিনেত্রী পার্ণো মিত্র। তার স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ও নি:সন্দেহে মন ছুঁয়ে যাবে। ছবিতে দেখা যাবে, চারদিকে গুজব ছড়াচ্ছে যে—নির্মাতা জাবেদ হাসান তার সিনেমার অভিনেত্রী এবং মেয়ের সহপাঠি নিতুর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন।

৪.

মোস্তফা সারয়ার ফারুকী—ঢাকাই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মেধাবী পরিচালকদের একজন। তার নিজস্ব একটা ঘরানা আছে, স্টাইল আছে। স্মার্ট ফিল্মমেকার হিসেবেও আলাদা ডাকনাম আছে। ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ ‘টেলিভিশন’ ও ‘পিঁপড়াবিদ্যা’র মত চলচ্চিত্র তার হাত ধরেই এসেছে। অনেকে তাকে তারেক মাসুদের যোগ্য উত্তরসূরিও মনে করেন। ডুব এর ট্রেলার দেখে বোঝা গেল, এই সিনেমার মধ্য দিয়ে ফারুকী তার আগের কাজগুলোকে নি:সন্দেহে ছাড়িয়ে গেছেন।

এই সিনেমার অন্যতম সেরা দিক সিনেমাটোগ্রাফি ও আবহ সঙ্গীত। যা ট্রেলার দেখেই বোঝা গেল। দুর্দান্ত লোকেশন ও ক্যামেরার মুভমেন্টে চোখ আটকে যায়। মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর মত একজন দক্ষ ও ক্রিয়েটিভ পরিচালকের সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখা যেতেই পারে, এবং এটাও বলে দেওয়া যায় যে সিনেমাটি খারাপ হবে না, বরং মান সম্মতই হবে।

বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা মোটেও সন্তোষজনক নয়, একের পর এক সিনেমাহল বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর আসছে। এমন সংকটময় মুহূর্তে ‘আয়নাবাজি’ ও ‘ঢাকা অ্যাটাক’র পর এই কন্টেন্টধর্মী চলচ্চিত্রটি কিছুটা হলেও আশার প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করবে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।