কিছুমিছু || রম্য গল্প

মায়ের মুখে শোনা প্রথম গল্প। এই গল্পটা সিরাজগঞ্জের আঞ্চলিক গল্প হিসেবে প্রচলিত। তবে সিরাজগঞ্জের একেক থানায় একেকভাবে গল্পটা প্রচলিত। জানিনা বাংলাদেশের অন্য জেলাগুলোতে এই গল্প প্রচলিত আছে কিনা, থাকলেও কিভাবে বলা হয় তাও জানা নেই।

আগে মানুষ শখ করে ছোট ছেলে-মেয়েকে কোলে কোলে বিয়ে দিতো। এরকমভাবে এক ছেলেকে বিয়ের করানোর পর ছেলের বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন। ছেলেটা দাদীর কাছে মানুষ হয়েছে। বড় হলে পাড়ার সবাই ইয়ার্কি করে বলে, কী রে শ্বশুর বাড়ি যাবি না? জবাবে ছেলে বলে, আমার আবার শ্বশুর বাড়ি!

এভাবে আজ একজন বলে, কাল একজন বলে। এক পর্যায়ে দাদীর কাছে গিয়ে সে বলে, দাদী, আমার নাকি বিয়ে হয়েছে?

দাদী হাসতে হাসতে বলে, হ্যা হয়েছে।

তাহলে আমি একটু শ্বশুর বাড়ি যাবো।

দাদী বলে, ঠিক আছে যাবি।

একদিন দিনক্ষণ দেখে দাদী পাঁচ টাকার নোট দিয়ে বলে, শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার সময় কিছুমিছু নিয়ে যাবি।আর ওবাড়ির সবার সাথে কোকিলের সুরে কথা বলবি।

পথ ধরে বাজারে যাচ্ছে। আর ভাবছে কিছুমিছু বোধ হয় কোন সদাইয়ের নাম। আম, জাম, জিলাপি যেমন। হাটে গিয়ে দোকানদারকে বলে, ভাই কিছুমিছু আছে?

কিছুমিছু কী?

আরেএএ কিছুমিছু?

আরে ভাই কিছুমিছুর নামটা কী? নামতো বলেন না!

নাম কিছুমিছু।

না ভাই আমার দোকানে কিছুমিছু নামক কোন জিনিস নাই। আপনি দূর হন।

এভাবে সারা হাট ঘুরে কিছুমিছু পায় না। হাটের মধ্যে ছিল এক চালাক মানুষ। লোকটা একটা ‘ফ্যান’ (মান কচু) নিয়ে হাটে বসে আছে। ঐ ফ্যানের কেউ দামও জিজ্ঞেস করে না। ফ্যানওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে, ভাই কিছুমিছু আছে?

শুনে ফ্যানওয়ালা চিন্তা করে-এ ব্যাটা একটা বে-আক্কেল ওর কাছেই ফ্যানটা বিক্রি করতে হবে।

জ্বী ভাই কিছুমিছু আছে।

দাম কত?

পাঁচ টাকা।

দাম শুনে চিন্তা করে দাদী টাকাও দিলো পাঁচ টাকা। আবার উনিও দাম চাচ্ছে পাঁচ টাকা। তাহলে এটাই কিছুমিছু।

এরপর কিছুমিছু কাঁধে নিয়ে রওনা হলো শ্বশুরবাড়ির দিকে। শালা ও শালীদের জন্য খাবার নিলাম কেমন স্বাদ তা তো বুঝলাম না। গাছের নিচে বসে ফ্যানের মাথা থেকে কয়েক কামড় খেয়ে নিলো। ফ্যান (মান কচু) খাওয়ার সাথে গাল গলা ধরেছে। এমনভাবে চুলকাচ্ছে যে, গালে থাপড়াচ্ছে আর বলছে, এ গাল থেকে ও গালে। এ গাল থেকে ও গালে। এমনভাবে সুর তুলে বলছে যে শোনা যাচ্ছে, এ ডাল থেকে ও ডালে। এ ডাল থেকে ও ডালে।

ঠিক পাশেই এক শিকারী ঘুঘু শিকার করার জন্য বন্ধুক তাক করে আছে। কিন্তু ঘুঘু স্থির থাকেনা। এ ডাল থেকে ও ডালে যায় শুধু। শিকারীর মেজাজ প্রচণ্ড খারাপ। এমন সময় পাশ থেকে ছেলেটার মুখে, এ ডাল থেকে ও ডালে শুনে সে মনে করছে যে তাকে বোধ হয় ব্যঙ্গ করছে। কী তুই আমাকে ব্যঙ্গ করিস! বন্দুক দিয়ে দিলো দুই বারি। ছেলেটা বলে, তাহলে ভাই আমি এখন কী বলব?

তুই যাবি আর বলবি-আজ বড় শুভদিন। আজ বড় শুভ দিন। বলতে বলতে অনেক পথ এসেছে। এদিকে রাস্তার পাশে একবাড়িতে ধরেছে আগুন। দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। ও যাচ্ছে আর বলছে, আজ বড় শুভদিন। আজ বড় শুভদিন।

এমন বে-আক্কেলের মত কথা শুনে লোকজন ধরে দিলো আচ্ছামত মার। ও তখন বলে, তাহলে আমি কী বলব?

বলবি, আর যেন ধরে না।

যাচ্ছে আর বলছে, আর যেন ধরে না। আর যেন ধরে না।

পথের ধারে সবজি বাগানের লাউ গাছে প্রথম লাউ দেখে মহিলা লাউটা তুলে খুশি মনে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। এমন সময় ছেলেটা বলছে,আর যেন ধরে না, আর যেন ধরে না।

এরকম কু-কথা শুনে মহিলা আচ্ছামত বকা দিলো ছেলেটাকে।বকা খেয়ে ভীষণ মন খারাপ করে ফেলে। সবাই কেন শুধু শুধু তাকে মারে, গালি দেয়? সিদ্ধান্ত নিলো মুখ দিয়ে আর কোন কথাই বলবে না।

ইতিমধ্যে শ্বশুর বাড়ি এসে গেছে।

শ্বশুর এসে বলে, জামাই কেমন আছো? জবাবে কোন কথা বলে না। শাশুড়ি এসে বলে, জামাই কথা বলছেন না কেন? তবুও সে কোন কথা বলে না। শ্বশুরবাড়ির সবার মন খারাপ। এবার শালী এসে যখন কিছু একটা বলবে বলবে ঠিক তখনই তার মনে হলো, আরেএএ দাদীতো বলেছিল শ্বশুরবাড়ির সবার সাথে কোকিলের সুরে কথা বলতে!

শালী এসে যখন বলল, দুলাভাই মন খারাপ কেন?

জবাবে বলে, টু

শালা বলে, দুলাভাই হাত-মুখ ধুয়ে নেন।

জবাবে বলে, টু।

শাশুড়ি বলে, জামাই মুরগী জবাই করবো না গরুর মাংস খাবে?

তবুও বলে, টু…

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।