কিং খান কেন ‘ফ্লপ খান’?

শাহরুখ খান – বর্তমান সময়ের অন্যতম ‘সমালোচিত’ অভিনেতা। সাম্প্রতিক ‘জাব হ্যারি মেট সেজাল’ ফ্লপ হওয়ার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় রীতিমত তুলোধুনোর স্বীকার হচ্ছেন। একের পর হিট মুভি উপহার দিয়ে ‘বক্স অফিস কিং’ উপাধি পাওয়া ‘কিং খান’ এখন হয়ে গেছেন ‘ফ্লপ খান’, ২০১৪ সালে রিলিজ পাওয়া ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’-এর পরে লাস্ট তিন বছরে যার আর কোন হিট মুভি নেই।

এই তিন বছরে মুক্তি পাওয়া ৫টা মুভির ২টা ফ্লপ আর আর বাকিগুলা কোনরকমে সেমি হিট। যে শাহরুখ খানের ২০০১-এ রিলিজ পাওয়া কাভি খুশি কাভি গাম থেকে ২০১৫-এর হ্যাপি নিউ ইয়ার পর্যন্ত ১৫ বছরে লিড রোলে রিলিজ পাওয়া ২২ টি মুভির মধ্যে ফ্লপ ছিল মাত্র তিনটি, বেশিরভাগই ব্লকবাস্টার/সুপারহিট, সেই শাহরুখ খানের শেষ ৩ বছরের মুভিগুলার এই হাল কেন?

যেখানে অন্য খানদের মুভি অনায়াসে ২০০ কোটি পার করে ফেলে, সেখানে শাহরুখের মুভি এখন খুব কষ্টে ১০০ কোটির ঘরে যায়। কেন? আসুন দেখি অনুসন্ধান করে কিছু বের করা যায় কিনা।

১.

শাহরুখের লুক। বয়স ৫১ হয়ে গেছে, স্বাভাবিকভাবেই চেহারায় একটা বয়স্কভাব চলে আসছে। জাব হ্যারি মেট সেজাল তো রীতিমত অনেক ক্লান্ত লেগেছে দেখতে শাহরুখকে। অন্যদিকে সালমানকে এখনও ৩০ বছর বয়সি দেখায় স্ক্রিনে, আর আমির তার লুক নিয়ে এত বেশী এক্সপেরিমেন্ট করেন যে বুঝাই যায় না বয়স। অক্ষয়ও বয়স ধরে রেখেছেন।

খেয়াল করলে দেখা যাবে হ্যাপি নিউ ইয়ার থেকে পরের মুভিগুলায় শাহরুখ হালকা চাপদাড়ি রেখে তার চেহারার বয়স্কভাব লুকানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু আসলে এই দাড়িওয়ালা লুকে সফল হচ্ছেন না। কারন বলিউড এখনো লুককে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। অমিতাভও তার নায়কজীবনের শেষ মুভিগুলোয় দাড়ি রেখে বয়স ঢাকার চেষ্টা করেছিলেন, সফল হননি। পরে ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি রেখে নায়ক ভুমিকা ছেড়ে সাইড এক্টর হয়ে যান এবং সফলতা পান। শাহরুখেরও কি সেই দিন চলে এসেছে?

২.

শাহরুখ খান সফল হয়েছিলেন রোমান্টিক হিরো হিসেবে, তার ব্লকবাস্টার/সুপারহিট হওয়া বেশরিভাগ মুভিই রোমান্টিক। কিন্তু এখন যেহেতু এখন আর রোমান্স করার মত বয়স নেই, তাই ‘দিলওয়ালে’ বা ‘জাব হ্যারি মেট সেজাল’ টাইপের রোমান্টিক মুভিতে তাকে মানায় না আর।

সালমান যেমন আগেই রোমান্টিক জোনার ছেড়ে অ্যাকশন বা ‘ভাইজান’ ইমেজসমৃদ্ধ মুভিতে চলে গেছে, আমির-অক্ষয় কনটেন্টনির্ভর মুভিতে ‘অ্যাক্টর’ হিসেবে অভিনয় করছে, ‘হিরো’ না। শাহরুখ ‘ফ্যান’ বা ‘রাইস’ টাইপের নন-রোমান্টিক বা লেস-রোমান্টিক মুভি করলেও দূর্বল কন্টেন্টের কারনে মার খেয়ে যাচ্ছে। মোদ্দাকথা ওকে রোমান্টিক লাভার বয় জোনার থেকে বের হতে হবে এইটাই বাস্তবতা।

৩.

একটা জিনিস খেয়াল করলে দেখবেন শাহরুখের রিসেন্ট মুভিগুলার ক্যারেক্টার সবগুলাই প্রায় একইরকম, এরোগেন্ট টাইপের ছিল। জেএইচএমএস-এ এরোগেন্ট টুরিস্ট গাইড, রাইসে এরোগেন্ট গ্যাংস্টার, ফ্যানে এরোগেন্ট সুপারস্টার+ফ্যান, দিলওয়ালেতে এরোগেন্ট প্রেমিক ইত্যাদি। বলিউড বরাবরই এরোগেন্ট ক্যারেক্টারকে সমাদর করে না। বরং আন্ডারডগ ক্যারেক্টার পছন্দ করে সবাই।

যেমন – ‘ডর’ বা ‘কাভি হা কাভি না’ মুভির সেই আন্ডারডগ প্রেমিক, বাজিগরের আন্ডারডগ রিভেঞ্জটেকার, ডিডিএলজি-এর সেই ইনোসেন্ট প্রেমিক, ‘কাল হো না হো’ এর নিঃস্বার্থ প্রেমিক, বা ‘চাক দে ইন্ডিয়া’এর সেই নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক কোচ। শাহরুখ আগে ভিন্নধর্মী সব রোল করত। তাই শাহরুখ ফ্যানরা আসলে আগের শাহরুখের সাথে বর্তমান শাহরুখকে মেলাতে পারছে না।

৪.

গত ১০-১২ বছরে বলিউডে একটি অনেক পরিবর্তন দেখা যায়। গল্প এবং সিনেমেটোগ্রাফি পরিবর্তিত হয়েছে। বলিউড অভিনেতা এবং পরিচালকদের একটি নতুন জাত পেয়েছে। এটি এমন একটি যুগ যেখানে ইরফান খান এবং নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর মতো অভিনেতারা তাদের নিজস্ব ডানায় ভর করে সুপারস্টার হতে পেরেছেন। এটি একটি যুগ যেখানে নতুন পরিচালকরা সত্যিই ভিন্ন-ভিন্ন জিনিস চেষ্টা করছেন। সালমান একমাত্র সুপারস্টার যিনি এই নতুন যুগে তাঁর পুরাতন ব্যক্তিত্বকে ধরে রেখে নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন।

আমির ও অক্ষয় নিজেদেরকে ভেঙ্গে পুনরায় নতুন রুপে গড়েছে এবং বাজার ধরে রেখেছেন। শাহরুখ নব্বইয়ের দশকে ওভারসিজ বাজার তৈরি করে এবং এখনো বাকিরা সেই বাজারের উপরেই নির্ভরশীল। তবে দাঙ্গাল চীনে নতুন বাজার তৈরি করেছে যেখান থেকে মুভিটি ১২০০ কোটি টাকা তুলে এনেছে! শাহরুখের মুভিগুলা এই নতুন বলিউডের মধ্যে খাপ খাচ্ছে না ঠিকমত।

রোহিত শেঠির মত স্ট্যান্টপ্রেমী পাগলা ডিরেক্টর যিনি অজয়কে সাথে নিয়ে বানিয়েছিল মাসালা স্ট্যান্ট+কমেডি নির্ভর সুপারহিট সব মুভি, যেই রোহিত শাহরুখকে নিয়ে আধা রোমান্টিক আধা স্ট্যান্ট আধা কমেডি আধা মাসালা মার্কা মুভি বানিয়ে ডুবলো। ইমতিয়াজ আলির মত ডিরেক্টর যিনি রোমান্টিক মুভিকে এক নতুন স্তরে নিয়ে গেছেন তিনি শাহরুকের সাথে এসে ভজঘট পাকিয়ে ফেললেন।

আসলে হচ্ছে কি? কি রয়েছে কিং খানের ভাগ্যে? একটি সাম্রাজ্যের পতন? নাকি পুরাতন প্রাসাদ ভেঙ্গে নতুন প্রাসাদ বানিয়ে কিং খান আবার রাজার মতই ফেরত আসবেন? উত্তরের জন্য সময়ের অপেক্ষাই করতে হচ্ছে!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।