কাল হো না হো’র অজানা ইতিবৃত্ত

শাহরুখ খানের সেরা সিনেমাগুলোর তালিকা করতে বসলে অনেকেই ‘কাল হো না হো’ কে শুরুর দিকেই রাখবেন। শাহরুখ-সাইফ-প্রীতি জিনতা অভিনীত রোমান্টিক ড্রামা ঘরানার এই সিনেমা কাঁদিয়েছে অজস্র সিনেমাপ্রেমীকে।

২০০৩ সালের ২৮ নভেম্বর, আজকের এই দিনে মুক্তি পেয়েছিল ‘কাল হো না হো’। বক্স অফিসে দারুণ সাফল্যের পাশাপাশি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানগুলোতেও ‘কাল হো না হো’র পারফরম্যান্স ছিল তাক লাগানো। কিন্ত অনেকেই জানেন না, প্রীতি জিনতা বা সাইফ আলী খান – এদের কেউই তাদের চরিত্রগুলোর জন্যে প্রথম পছন্দ ছিলেন না। এমনকি সিনেমার নাম শুরুতে ‘কাল হো না হো’ই ছিল না। চলুন জেনে নেয়া যাক সিনেমাটা সম্পর্কে কিছু অদ্ভুত আর অজানা তথ্য।

১.

‘কাল হো না হো’- নামটা বেশ কাব্যিক, অর্থবহও। শুরুতে কিন্ত এই নাম রাখা হয়নি। করণ জোহর প্রথমে এর নাম দিয়েছিলেন ‘কাভি আলভিদা না কেহনা’। পরে এই নাম বদলে রাখা হয় ‘কাল হো না হো’। তবে বাতিল নামটাও করণ ব্যবহার করেছিলেন তার পরের সিনেমার টাইটেল হিসেবে, সেখানেও ছিলেন শাহরুখ-প্রীতি।

২.

‘ন্যায়না’ চরিত্রের জন্যে প্রীতি জিনতা প্রযোজকের প্রথম পছন্দ ছিলেন না শুরুতে। কারিনাকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল এই চরিত্রে, কিন্ত পারিশ্রমিক বেশী চাওয়ায় কারিনার সঙ্গে ব্যাটে-বলে হয়নি, তার বদলে নিউইয়র্কের বিমানে চড়েন প্রীতি জিনতা। এর আগে কাজলের কথাও ভেবেছিলেন করন, কিন্ত কাজল তখন প্রেগনেন্ট, তাই এই পরিকল্পনা বাদ দিতে হয়। তবে কাজলকে ঠিকই একটা গানে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে হাজির করেছিলেন করন জোহর, এসেছিলেন আরেক বং বিউটি রানী মূখার্জীও।

৩.

একই অবস্থা সাইফ আলী খানের ‘রোহিত’ চরিত্রের বেলাতেও। এই রোলে সালমান খানকে কাস্ট করার কথা ভাবা হয়েছিল শুরুতে। করন জোহরের ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ সিনেমায় শাহরুখের কাছে প্রেমিকাকে হারিয়েছিলেন ভাইজান, এবার সুযোগ ছিল কিং খানকে টেক্কা দেয়ার। কিন্ত রাজী হননি সালমান। সাইফের আগে ‘রোহিত’ চরিত্রের জন্যে অভিষেক বচ্চন আর বিবেক ওবেরয়ের কাছেও গিয়েছিলেন নির্মাতারা, কিন্ত শেষমেশ জুতোয় অয়া গলিয়েছেন সাইফই।

৪.

জয়া বচ্চনের ‘জেনি’ চরিত্রে প্রথমে প্রস্তাব পেয়েছিলেন নীতু সিং। অনেকদিন সিনেমা থেকে দূরে থাকার পরে ‘কাল হো না হো’ দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে কামব্যাক করবেন তিনি, এমনটাই গুজব ছিল। কিন্ত তিনিও হতাশ করেন করন জোহরকে।

৫.

করন জোহরের বাবা যশ জোহরের প্রযোজিত শেষ সিনেমা ছিল এটা। ‘কাল হো না হো’ মুক্তির কিছুদিন পরেই মারা যাব তিনি।

৬.

এই সিনেমার ‘প্রীতি ওম্যান’ গানের জন্যে রয় ওরবিসনের কাছে থেকে কপিরাইট কিনেছিলেন করন জোহর। ফারাহ খানের দারুণ কোরিওগ্রাফিতে নিউইয়র্কের বুকে উঠে এসেছিল এক টুকরো ভারত। হিন্দি গানের তালে তালে স্থানীয় নৃত্যশিল্পীদের নাচিয়ে ছেড়েছেন ফারাহ। এই গানটা আবার যশ জোহরের খুব প্রিয় ছিল।

৭.

ফারাহ খানকে এই সিনেমার একটা দৃশ্যে দেখাও গেছে। অনেকেই হয়তো খেয়াল করেননি, বা চোখ এড়িয়ে গেছে। সিনেমায় জেনী’র ‘ক্যাফে নিউ দিল্লী’ রেস্টুরেন্টের একজন কাস্টোমার ছিলেন ফারাহ।

৮.

‘কাল হো না হো’র গল্প লিখেছেন করন জোহর নিজে। সিনেমার পুরো গল্পটা আবর্তিত হয়েছে নিউইয়র্ককে ঘিরে। তবে করন জোহরের গল্পে প্রথমে নিউইয়র্কের নাম ছিল না, তার জায়গায় ছিল টরেন্টো। পরে নানা কারণে লোকেশন পাল্টানো হয়। তবে নিউয়র্কে সিনেমার শুটিঙের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আবার টরেন্টোতেই কিছু দৃশ্যের শুটিং করা হয়।

৯.

সিনেমায় ছোট্ট জিয়া’র পুতুলগুলোর ড্রেস ডিজাইন করেছিলেন খোদ প্রীতি জিনতা। শুটিঙের আগেই সেগুলো সেলাই করেছিলেন প্রীতি। টোলপড়া গালের সুন্দরী মেয়েটা অদ্ভুত গুণে গুণান্বিত বটে! এই সিনেমার কস্টিউম ডিজাইন করেছেন মনীশ মালহোত্রা।

১০.

সিনেমার শুরুতে প্রীতি জিনতাকে জগিং করতে দেখা যায়, সেই দৃশ্যের শুটিং করতে গিয়ে পড়ে আহত হয়েছিলেন নায়িকা। পরে পরিচালক নিখিল আদভানী সেই দৃশ্যে বডি ডাবল ব্যবহার করেছিলেন।

১১.

২৮ কোটি রূপি বাজেটের ‘কাল হো না হো’ দেশ আর দেশের বাইরের বক্স অফিস মিলিয়ে আয় করেছিল ৮৬ কোটি রূপিরও বেশী। ডোমেস্টিক বক্স অফিসে ২০০৩ সালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমা ছিল এটি, দেশের বাইরে ভারতীয় সিনেমাগুলোর মধ্যে সেই বছর ‘কাল হো না হো’র আয়ই ছিল সর্বোচ্চ।

১২.

ফিল্মফেয়ারে সে বছর জয়জয়কার ছিল ‘কাল হো না হো’র। সেরা অভিনেত্রী(প্রীতি), পার্শ্বচরিত্রে সেরা অভিনেতা (সাইফ)- অভিনেত্রী(জয়া), বেস্ট মিউজিক ডিরেক্টর (শঙ্কর-এহসান-লয়) সহ মোট আটটা পুরস্কার ঘরে তুলেছিল ‘কাল হো না হো’। শাহরুখ খান অবশ্য সেরা অভিনেতার পুরস্কার পাননি, ‘কোয়ি মিল গ্যায়া’ সিনেমার জন্যে সেটা পেয়েছিলেন ঋত্বিক রোশান।

শাহরুখ-প্রীতি-সাইফের অভিনয়, সনু নিগমের গান- সবকিছু মিশে আছে আমাদের শৈশব আর কৈশরের সঙ্গে। সিনেমার ট্যাগলাইন ছিল- ‘স্টোরি অফ এ লাইফটাইম…ইন এ হার্টবিট’। সেই হার্টবিটের তালে তালেই সময়ের রথে চড়ে দেখতে দেখতে চৌদ্দ বছর পেরিয়ে গেছে সিনেমার বয়স, কোন ফাঁকে, কিভাবে বুঝতেই পারলাম না।

বিসর্জনে মিশে থাকা ভালোবাসা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কাল হো না হো; শেখায় বাঁচতে, বাঁচাতে, হাসতে। কে জানে, আগামীকালটা যদি আর না আসে? আমাদের জীবনে আগামীকাল আসুক কিংবা না আসুক, আরেকটা ‘কাল হো না হো’ আর আসবে না, সেটা নিশ্চিত।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।