কালো

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

কালো মেয়ে চিরকালই অবহেলিত এই সমাজে। পাত্রপাত্রীর বিজ্ঞাপনে বিয়েতে চালাতে কালো মেয়েকে উজ্জ্বল শ্যামবর্না লিখতে হয়। সর্বত্র তাঁকে হীন করা হয়। অথচ দেবী কালী তো কালো।

আদি যুগে পুরাণে কিন্তু ছিল উলোট পুরাণ।

বরং মহাভারতে দুই কৃষ্ণাজ্ঞী কন্যা সবচেয়ে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। এঁরা দুজনেই নিজের গায়ের রং কালো নিয়ে মনকষ্টে ভুগতেন না।বরং সমাজে নিজের অধিকার নারীর অধিকার স্থাপন করেছেন।

মহাভারতে প্রধান দুই নারী চরিত্র এই দুই নারী। যারা না থাকলে মহাভারত হতনা।

প্রথম জন সত্যবতী। যার গায়ের রং কালো। যিনি না এলে মহাভারত লেখা হতনা। চেদিরাজ উপরিচরের বীর্যে মৎস্যরূপী অদ্রিকার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন সত্যবতী।

সত্যবতী অত্যন্ত সুন্দরী হলেও গায়ে ছিল মাছের গন্ধ। মৎস্যগন্ধা তাই তাঁর আরেক নাম। প্রথম থেকেই সে সাবলম্বী নিজের অর্থ নিজে উপার্জন করতেন। যমুনা নদীতে জেলেদের পারাপার করতেন। যৌবনে উপনীত হলে নদীর পারাপারে দেখা হয় পরাশর মুণির। যিনি সত্যবতীর রূপে কামাগ্নি তে জ্বলতে থাকেন নৌকায়। সত্যবতী বলেন তিনি আজম্ম কুমারী থাকতে চান তাই মিলনে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। এখানে বোঝা যায় নারী পুরুষের ব্যবহারের সামগ্রী নয়। কালো নারী হয়েও নিজের ইচ্ছে বুঝিয়ে দেন।

মুণি বলেন তাঁদের মিলনে শিশুপুত্র হলেও সত্যবতী আবার অক্ষতযোনি প্রাপ্তা হবেন। সত্যবতী রাজী হন। পরাশর মুণি নৌকা কুয়াশায় ঘিরে ফেলেন মন্ত্রবলে, কুয়াশাবৃতা সত্যবতী বলেন তাঁর গায়ে মাছের গন্ধ দূর হয় যেন এই মিলনে। মুণি তাই করেন। সত্যবতীর সুগন্ধী গাত্রঘ্রাণ প্রাপ্তির কারনে গন্ধবতী নামে খ্যাত হন। আবার এক যোজন দূর থেকে তাঁর গায়ের গন্ধ পাওয়া যেতে বলে, আরেক নাম ছিল যোজনগন্ধা। এই মিলনে গর্ভবতী সত্যবতী পরবর্তীকালে যমুনার একটি দ্বীপে পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন হয় এঁর নাম। ইনিই ব্যসদেব। ব্যসদেব না জন্মগ্রহন করলে মহাভারত লেখাই হতনা।

আবার কুমারীভাবে সত্যবতী নৌকা পার করতে গিয়ে তাঁর গাত্রগন্ধে রাজা শান্তনুকে কামাতুর করেন। শান্তনু বিবাহ প্রস্তাব দেন। কিন্তু সত্যবতী ও তাঁর পিতার শর্ত ছিল সত্যবতী শান্তনুর গর্ভজাত সন্তানই হবে হস্তিনাপুরের রাজা। কিন্তু ভীষ্ম শান্তনুর প্রথম স্ত্রী গঙ্গার সন্তান হওয়ায় তাঁর পূর্বদাবী রাজা হবার। ভীষ্ম কথা দেন তিনি আজম্ম অকৃতদার থাকবেন। এবং পুত্র, পিতা ও বিমাতার বিবাহ দেন। এখানেও দেখা যায় কালো নারী নিজের সন্তানের অধিকার বুঝে নিচ্ছে বিবাহ পূর্বেই। বিবাহের চেয়েও নিজের অর্থবল সম্মানবল বুঝে নিচ্ছে সে।

দুই দ্রৌপদী। যার অপর নামই কৃষ্ণা। বীরাঙ্গনাদ্রৌপদী পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা । দ্রুপদের কন্যা বলে নাম দ্রৌপদী।
যার গাত্রবর্ন কালো।

‘ কুমারী চাপি পাঞ্চালী বেদীমধ্যাৎ সমুত্থিতা ।
সুভগা দর্শনীয়াঙ্গী স্বসিতায়তলোচনা ।।
শ্যামা পদ্মপলাশাক্ষী নীলকুঞ্চিতমূর্ধজা ।
তাম্রতুঙ্গনখী সুভ্রূশ্চারুপীনপয়োধরা ।। ’

দ্রৌপদী বর নির্বাচনের সময় পিতা ভ্রাতার উপরে কথা বলে কর্ণের পরিবর্তে তাঁর প্রেম অর্জুনকে বরমাল্য নিবেদন করেন। কালো কন্যা হয়েও বিবাহ মঞ্চে নিজের পছন্দের বর সে নিজে চয়ণ করেন। যা এখনকার পাত্রপাত্রী বিজ্ঞাপণে অসম্ভব হয়ে আসছে। মহাভারতে সত্যবতী বিবাহের পর যত উন্নত হন, দ্রৌপদী তত লাঞ্ছিতা হন। স্বামীদের ভাগের স্ত্রী পতিতা স্বরুপ থেকে বস্ত্রহরণ। কিন্তু সেই একমাত্র ভগবান কৃষ্ণকে বন্ধু বানান। কুরুক্ষেত্র অবধি তাঁর লড়াই তেজ যুগে যুগে মানুষের কাছে স্মরণীয়।

এই দুই প্রধানা নারী যারা কালো গায়ের রংকে কোনো গুরত্বই দেননি।

আর আমাদের বাঙালিদের চোখে যে দুজন বঙ্গললনা দুই নারী রূপে জনপ্রিয় ব্লকবাস্টার হন আজও সমান জনপ্রিয়া। সত্যবতী দেবশ্রী রায় এবং দ্রৌপদী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। বলিউড সিরিয়ালে সমগ্র ভারতের রাস্তা ফাঁকা করে টিভির সামনে বসাতে আর কোনো বঙ্গতনয়া যা পারেনি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।