কারখানায় দারোয়ানের কাজও করেছি

জীবন এখন অনেক বর্ণিল, চমকপ্রদ। অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি, সফলতার সাথে সাথে জীবনের নিষ্ঠুর রূপটাকেও খুব কাছ থেকে দেখেছি। আজকের অবস্থানটায় পৌছুতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। তবে মনে স্বপ্নপূরণের অদম্য বাসনা সবসময় আমাকে উজ্জীবিত রাখত। উত্তরপ্রদেশের ছোট্ট একটি গ্রাম বুধানায় এক জমিদার পরিবারে আমার জন্ম। কিন্তু জমিদারীর চাকচিক্য কখনো আমার ভাগ্যে জোটেনি। কেননা আমার দাদা নিম্নবর্ণের এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন। আর সেটিই আমাদের পরিবারের জন্য কাল হয়ে দাড়ায়। ধীরে ধীরে পতন শুরু হয় আমাদের পরিবারের, আমার বাবার সময়ে এসে পরিবার পুরোপুরিভাবেই দারিদ্র্যের মুখে পতিত হয়। আর সেটি কখনো কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি।

স্কুল জীবনে আমি কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম যাতে বড় হয়ে প্যাথলজিস্ট হতে পারি। কিন্তু মাথায় অভিনয়ের পোকা ছিল। তখন থিয়েটার করা শুরু করি। থিয়েটার করা আমার একটা নেশা হয়ে দাড়ায়, এতে আয় নিতান্তই কম হলেও নিজের মনের খোরাক পেতাম। এরপর আমি বাড়োরা’য় এক বছর কেমিস্ট হিসেবে কাজ করি। আর সেখানে বন্ধুদের সাথে একদিন মঞ্চনাটক দেখি, আর তখনই নিজের মধ্যে থাকা অভিনয়ের বারুদটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যে করেই হোক অভিনয় চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।  নয়াদিল্লী’র ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামাতে ভর্তির আবেদন করি এবং প্রথমবারেই টিকে যাই। তবে দিল্লিতে আমার নিঃসঙ্গ দিনগুলো  অনেক অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। এনএসডি’তে ভর্তির আগে একটি খেলনার কারখানায় দারোয়ানের কাজও করেছি।

১৯৯৬ সালে এনএসডি থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করে মুম্বাই আসি। কিন্তু বেশ কয়েক বছর কোনো ছোট-খাটো রোলেও কাজ পাইনি। আর তাই অভাবের দিনগুলো ক্রমেই বিষাদময় হয়ে উঠছিল। মুম্বাইতে কোনোমতে থাকার ঠাই পেলেও তিনবেলা ভরপেট খাবার জুটতনা। সকাল, দুপুর, রাত তিনবেলাই এক প্যাকেট পার্লে-জি বিস্কুট আর চা দিয়ে পেট পুরতে হত। ক্ষুধার কারণে একবার রাস্তায় অচেতনও হয়েছিলাম। দূরে কোথাও যেতে হলে বাসে চড়ার সাহস পেতাম না, হেঁটেই চলাচল করতে হত। কিন্তু হাল ছাড়িনি, একটা ভালো সময়ের প্রত্যাশায় স্বপ্ন-সারথী হয়ে দিন কাটাতাম।

ওই সময়টাতে হাতে কোনো কাজ ছিলোনা, পকেটে ফুটো-কড়িও ছিলোনা, জীবনে প্রেম-ভালবাসা কিছুই ছিলোনা। প্রতিটি দিন দুঃস্বপ্নের মতো ছিল। চরম হতাশায় নিমজ্জিত হই, আত্মবিশ্বাস জোগানোর মতোও কাউকে পাশে পাইনি। আর তাই একদিন নিজের ভাগ্যের উপর বিতৃষ্ণ হয়ে জীবনের ইতি ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিই। মুম্বাইয়ের একটি রেলস্টেশনে গিয়ে লোকাল ট্রেনের সামনে দাড়িয়ে সেদিন যখন নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘আমি কি ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে জীবনের সব দুঃখ-কষ্টকে চিরতরে শেষ করে দেব?’ মনের ভেতর থেকে একটি আওয়াজ সেদিন বাঁধা দিয়েছিল।

তারপর আবার দৈনন্দিন জীবনে ফিরে আসি। আবার শুরু হয় সংগ্রাম টিকে থাকার, স্বপ্নপূরণের। স্বপ্নপূরণের পথ অনেক কঠিন, কণ্টকময় হতে পারে কিন্তু তাই বলে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করা যাবেনা। শত প্রতিকূলতার মাঝেও মনের কোণে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট একটা স্বপ্নপূরণের তাড়নাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

_______________

ভারতীয় গণমাধ্যম ‘বিয়িং ইন্ডিয়ান’-এ এভাবেই নিজের জীবনের গল্প বলেন বলিউডের অভিনয় শিল্পী নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।