কাঞ্চন-জসিমরা কী কেবলই ট্রলের পাত্র!

বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যাঁরা একচেটিয়াভাবে রাজ করে গিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে খুব সম্ভবত জসিম আর ইলিয়াস কাঞ্চনকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি হাসি ঠাট্টা করা হয়, ট্রল করা হয়। আর পার্শ্বচরিত্রের কথা আসলে বাপ্পারাজ।

আমরা জাতি হিসেবে এতটাই নীচ মানসিকতার যে মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে কটুক্তি, ঠাট্টা-তামাশা করতেও বিবেকে আর বাধেনা। বাধবে কি! এই জসিম, ইলিয়াস কাঞ্চন, বাপ্পারাজেরা কিন্তু গোটা পরিবার নিয়ে একসঙ্গে বসে দেখার মত মুভিতে অভিনয় করতো, যেখানে নির্মল আনন্দ আর সাধ্যানুযায়ী বার্তা থাকতো। সমাজের অন্যায়, নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরা হতো এবং অবশ্যই শ্লীলতা বজায় রেখে। কোনও অশ্লীলতা কিংবা অপ্রীতিকর কিছু কখনও চোখে পড়েনি।

জসিম-কাঞ্চনদের আমলে সবাই শুক্রবার বিকেলে একসঙ্গে বসে মুভি দেখতো। বাবা, মা, ভাই, বোন, কাজের বুয়া, বুয়ার নাতি-নাতনী সবাই একসঙ্গে বসে নির্মল আনন্দ উপভোগ করতো, কখনও কারো মাঝে বিব্রতভাবের উদয় হয়নি। সবাই মুভি দেখতে দেখতে একসঙ্গে হাসতো, কখনও বা আবার কাঁদো কাঁদো চোখে পেটমোটা টিভিটার পর্দার দিকে একসঙ্গে তাকিয়ে থাকতো।

যুগের পরিবর্তন বলেও তো একটা কথা রয়েছে, নাকি? ৮০’র দশকে এলাকার সবচেয়ে ধনী আর ক্ষমতাধর লোকটিও সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করতে করতে লুঙ্গি পরে রিকশায় চেপে বাজার করতে বের হতো। রিকশায় নিজের পাশে বসাতো ঘরের মালী কিংবা ড্রাইভারকে। বাজার সেরে সকাল সকাল গোসল করে পরিপাটি হয়ে সিঁথি করে চুল আঁচড়ে তৈরি হতো অফিসে যাওয়ার জন্য।

বিয়ে-জন্মদিনের আসরে ‘তোমাকে চাই আমি আরও কাছে’ কিংবা ‘চুরি করেছো আমার মনটা, হায়রে হায় মিস লংকা’ টাইপের গানগুলাই হালকা মেজাজে সাউন্ড সিস্টেমে বাজানো হতো। আর কালেভাদ্রে মাইকেল জ্যাকসন-বিটলস-এলভিসের হিটগুলা। এইগুলাই ছিলো ভদ্রতা, স্মার্টনেস, ক্যুলনেস। ডিজে-ফিজের যুগ তখনও আসেনি। অশ্লীলতার ধোঁয়া তখনও ছড়াতে শুরু করেনি।

এখনের পাছার রেখা বের করে হাঁটা অত্যাধুনিক তরুণ সমাজ যদি ওই আমলের চলচ্চিত্রকে বর্তমান সময়ের হলিউডি চলচ্চিত্রের সঙ্গে একই পাল্লায় রেখে ওজন করতে চায়, তবে তারা নির্বোধ বৈ কি আর কিছুনা।

সমস্যাটা হলো, আমরা সবসময় মুরুব্বীদের চাইতে দুই কদম এগিয়ে। আমাদের মুরুব্বীরাও তরুণকালে এমনই ছিলেন। কারণ ইঁচড়েপাকাদের ভ্রান্ত ধারনা হলো, অ্যানসেস্টরদের চাইতে দুই স্টেপ না এগিয়ে থাকলে নিজেকে ক্যুল প্রমাণ করা যায়না। বেশি বুঝতে গিয়ে আমরা বেশি গিলে ফেলি আর গিলতে গিলতে তখন নিজের ঘরের খাবারকেই অখাদ্য মনে হয়। হবেনা? প্রতিদিন বিভিন্ন বিয়ে বাড়িতে এন্ট্রি মেরে আসলে নিজের ঘরের ভর্তা ভাত তো পানসে লাগবেই।

জসিম-ইলিয়াস কাঞ্চন কী জিনিস, তা শুধুমাত্র তারাই বুঝবে যারা বাংলা চলচ্চিত্রের উত্থান-পতন নিয়ে স্টাডি করেছে, যারা আশি-নব্বইয়ের দশকে মনোযোগ দিয়ে মুভিগুলো দেখে উপভোগ করতে শিখে এসেছে। বাংলা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রকে অন্য এক লেভেলে নিয়ে যাওয়া দুই মহাতারকার নাম হলো জসিম আর ইলিয়াস কাঞ্চন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।