কমিটমেন্ট || ছোটগল্প

রাত্রিকে ছেলেপক্ষ দেখতে এসেছে। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। ছেলে খুব নামকরা সিরিয়াল কিলার। মাত্র সাতাশ বছর বয়সেই পয়ত্রিশটা মার্ডার করে ফেলেছে৷ নাম মঈনুল ইসলাম। আন্ডারওয়াল্ডে অবশ্য কিলার মঈন নামে বেশি পরিচিত। এরকম একটা সম্বন্ধ যে আসবে সেটা রাত্রি বা তার ফ্যামিলি কখনোই ভাবতে পারেনি৷ আশেপাশের সবাই বলাবলি করছে রাত্রির সাত জনমের ভাগ্য যে মঈনরা নিজে থেকে এই সম্বন্ধ পাঠিয়েছে৷ যেখানে রাত্রির চৌদ্দগোষ্ঠির মধ্যে সাধারণ কোনো খুনি জামায়ই নেই, সেখানে সিরিয়াল কিলার তো বলা চলে স্বয়ং আকাশের চাঁদ৷ রাত্রির কাজিন বোনদের জামাইরা বেশিরভাগ ছিচকে চোর আর পকেটমার৷ দুই একজন আছে ছিনতাইকারী।

অবশ্য রাত্রী তাদের সবার থেকে বেশি সুন্দরী৷ সেই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই সবাই বলতো অন্তত ডাকাত ছেলের সাথে ওর বিয়ে দেয়াই যাবে৷ কিন্তু শেষপর্যন্ত একদম সিরিয়াল কিলার। কেউ ভাবতেও পারেনি কখনো। রাত্রিদের ফ্যামিলিতে তাই খুশির জোয়ার৷ রাত্রির বাবার ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিলো সিরিয়াল কিলার হওয়ার৷ কিন্তু ভাগ্যের পরিক্রমায় আর দশজনের মতো বাসে ট্রেনে পকেট মেরেই সংসার চালাতে হয়েছে৷ শেষ বয়সে এসে একটা মলম পার্টিতে সুযোগ পেয়েছে বটে কিন্তু পার্টি হিসাবে সেটা খুব একটা সুবিধার না। আয় উন্নতি নাই তেমন বলা চলে৷

তার উপর এখন পর্যন্ত দু’বার পুলিশের হাতে ধরা খেয়েছে আর একবার পাবলিকের কাছে গনধোলায়। এখন জামাই যদি সিরিয়াল কিলার হয় তাহলে আন্ডারওয়ার্ল্ডে কত সম্মান বাড়বে তার এটা ভেবেই রাত্রির বাবার গর্বে বুক ফুলে ওঠে৷ তবে এই সম্বন্ধ আসার পেছনে রাত্রির মায়ের দিকের হাত আছে বলে অনেকের ধারণা। রাত্রির নানা বেশ নামকরা মানুষ। সেই বৃটিশ আমলে ইট দিয়ে মাথা থেতলে একজনকে খুন করেছিলেন। সেকালে একটা খুনের দাম ছিলো৷ তখনকার একটা খুন এখন দশটা খুনের সমান।

আজকে বাসায় অনেক মেহমান। রাত্রির নানা মামা খালারাও এসেছে। রাত্রির নানা গেস্টরুমে বসে ছেলের সাথে গল্প করছে। জানালা দিয়ে উকি মারার চেষ্টা করলো রাত্রি। ছেলের মুখের একপাশে দেখা যাচ্ছে৷ কপাল থেকে কাটা একটা দাগ নেমে এসেছে। ইস কি নিষ্ঠুর চেহারা। দেখেই প্রেমে পড়ে গেল ও। মনে মনে ভাবলো, ‘এই ছেলে ওকে পছন্দ করলে এতিমখানায় একশো টাকা দান করে দেবে।’

এমন সময় রাত্রির আম্মু পেছন থেকে এসে ওর কাধে হাত রাখলো। হালকা চমকালো রাত্রি৷ আম্মু মুচকি হাসলো।

‘এখান দিয়ে উকিঝুকি না মেরে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে মদের বোতলগুলো ট্রেতে করে নিয়ে যা ঐঘরে। ছেলেপক্ষ অপেক্ষা করছে।’

রাত্রি শাড়ি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লিপিস্টিক লাগাচ্ছিলো। এমন সময় ফোনে একটা মেসেজ আসলো টুং করে। না দেখেই বুঝলো শরীফ পাঠিয়েছে৷ গত একসপ্তায় সর্বোচ্চ এসএমএস পাঠানোর গিনেজ রেকর্ডটা শরীফ নিঃসন্দেহে নিজের করে নিয়েছে৷ আর সবগুলো মেসেজের ভাষা প্রায় একই। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না, প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেওনা, ভীষণ মিস করছি, এইসব। দুই বছরের প্রেম ছিলো ওদের।

বিভিন্ন দুই নাম্বারী ধান্দা আছে শরীফের। রাত্রির সাথে পরিচয় হয় ফোনে। দুই বছর আগে এক রাতে জ্বিনের বাদশা সেজে রাত্রির নাম্বারে কল দিয়েছিলো ও। রাত্রি রেগে গিয়ে বলেছিলো, ‘আপনার লজ্জা করেনা এইসব ছোটোখাটো ধান্দা করতে? নিজের পরিচয় গোপন রেখে ফোনে ক্রাইম করে কাপুরুষরা। আসল পুরুষ মানুষের ঘরে গিয়ে জোর করে টাকাপয়সা নিয়ে আসে৷ জ্বিনের বাদশার নাটক করে না।’

শরীফ উত্তর দিয়েছিলো, ‘আম্মিজান বলতো, কোনো ধান্দা ছোট হয়না আর ধান্দা থেকে বড় কোনো ধর্ম হয়না।’

রাত্রি অবাক হয়েছিলো, ‘এইটা শাহরুখ খানের ডায়ালগ না? আপনি শাহরুখ ফ্যান?’

– হুম ভীষন।

– ওয়াও, আমিও।

সেই থেকে কথা বলার শুরু। তারপর কথা বলতে বলতে কখন যে প্রেম হয়ে গেছে ওরা টেরই পায়নি। তার দুইবছর বাদে সিরিয়াল কিলারের সাথে বিয়ের কথা আসতেই আক্ষরিক অর্থে রাত্রি শরীফকে ছ্যাকা দিয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যৎ জীবনের অফুরন্ত টাকা আর ক্ষমতার লোভ সামলাতে পারেনি রাত্রি। ছেড়ে দিয়েছে জ্বীনের বাদশা খ্যাত শরীফকে৷ আন্ডারওয়াল্ডে এইসব জ্বীনের বাদশাদের একদমই মূল্য নেই। এই সেক্টরে মঈন ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার হলে শরীফ সামান্য পিয়ন মাত্র। আবার মেসেজ আসলো শরীফের।

‘কি হইছে তোমার বলবা তো। তুমি আমাকে ইগনোর কেন করছো? তুমি কি আমার থেকে ভালো কাউকে পেয়ে গেছ?’

রাত্রি রিপ্লাই দিলো, ‘হ্যা তুমি ঠিকই ধরেছ৷ সামনে আমার বিয়ে৷ দয়া করে আমাকে আর বিরক্ত করার চেষ্টা কইরো না।’

তারপর ফোন অফ করে দিলো। বিয়ের আগেই নতুম একটা সিম কিনতে হবে, ভাবলো ও।

রাত্রি মদের ট্রে হাতে মাথা নীচু করে রুমে ঢুকলো। মঈন একঝলক ওর মুখের দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিলো৷ লজ্জা পেয়েছে বেচারা। রাত্রিও ভদ্রতার খাতিরে সরাসরি মঈনের দিকে তাকাতে পারছে না। এতো মানুষ বসা তারা কি ভাববে! ভাববে যে, নতুন বউ একদম নির্লজ্জ। এদিকে মঈনকে ভালোভাবে দেখার খুব ইচ্ছা হচ্ছে ওর। মঈনেরও যে ওকে দেখার ইচ্ছা হচ্ছে সেটাও বুঝছে রাত্রি৷ ঝামেলা দূর করে দিলো রাত্রির নানা। বললো, ‘ছেলে আর মেয়ে তাইলে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলুক। আজকাল এই জিনিস গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সময় তো আমরা বাসর রাতের আগে বউয়ের মুখটাও দেখতে পারতাম না। হাহাহা। রাত্রি মা যাও তো, জামাই বাবাজীকে ছাদ থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে এসো।’

রাত্রি আর মঈন ছাদে পাশাপাশি বসে আছে। চুপচাপ। লজ্জায় কেউই কথা বলতে পারছে না। অনেক্ষণ পর ইতস্তত করে মঈন নিরবতা ভাঙলো। আমতা আমতা করে বললো, ‘রাত্রি শুনো, তোমাকে কিছু কথা বলি। আমি খুব সাধারণ একজন সিরিয়াল কিলার। ছোটবেলা থেকে যে স্বপ্ন দেখেছি সেই স্বপ্ন পূরণ করতেই এই পেশায় এসেছি। হয়তো গ্যাংস্টার আর মাদক ব্যাবসায়ীদের মতো কোটিকোটি টাকা আমার নেই, কিন্তু এইটুকু বলতে পারি আমার কাছে ভালোবাসার কমতি কখনোই হবে না। সপ্তাহে আমি একটা মাত্র খুন করি। প্রতিটায় এক লক্ষ টাকা পাই। ঐ একদিন বাদে বাকি ছয়দিন আমি তোমাকেই সময় দিবো। আমরা একসাথে মুভি দেখবো, ঘুরতে যাবো, সেক্স করবো, রেস্টুরেন্টে খাওয়াদাওয়া করবো। ইনজয়েবল একটা জীবন কেটে যাবে আমাদের। এর বেশি আর কিছু বলার নেই৷ তোমার কোনো প্রশ্ন থাকলে করতে পারো।’

রাত্রি প্রশ্ন করলো, ‘তোমার হবি কি?’

মঈন মুচকি হাসলো, ‘শখ বলো অথবা জব, আমার ঐ খুন করাটাই সব৷ কথায় আছে না, তোমার শখ যদি তোমার পেশা হয়ে যায় তাহলে কাজ করার সময়ও মনে হবে তুমি ছুটি কাটাচ্ছো। আমার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা এরকম৷ সবাই বলে এজন্যই আমি এই ফিল্ডে সফলতা অর্জন করেছি আর সবার চাইতে দ্রুত। তাছাড়া সফল হওয়ার আরো একটা কারণ অবশ্য আছে।’

– কি কারণ সেটা?

– সেটা হলো আমি আমার কাজের প্রতি শতভাগ কমিটেড৷ এখন অব্দি যে কয়টা কাজ পেয়েছি সবগুলো ঠিকভাবে খুন করতে পেরেছি। একটাও মিস করিনি। অনেক কিলার আছে মাঝে মাঝে ভিক্টিমকে দেখে ইমোশনাল হয়ে পড়ে। অমুকের ছোট ছোট দুইটা বাচ্চা, সে মারা গেলে বাচ্চাদের দেখার কেউ নেই। আমি পারবো না তাকে মারতে। এইধরনের সমস্যায় যা হয় তা হলো মার্কেটে ঐ কিলারের রিভিউতে পয়েন্ট কমে যায়৷ নেগেটিভ রিভিউ পড়ে। আমার ক্ষেত্রে এরকম কোনো প্রবলেম নেই। ক্লায়েন্টরা শতভাগ নিশ্চিত থাকে আমি কাজটা করবোই৷ তুমি বিশ্বাস করবা না একবার আমি অর্ডার পেয়ে তিন বছরের একটা বাচ্চাকে খুন করেছিলাম। আরেকবার মেরেছিলাম এক গর্ভবতী মহিলাকে। কিচ্ছু করার ছিলো না। আমি শুধু আমার কাজ করেছি। আর কাজের মধ্যে ইমোশন আনার কোনো সুযোগ নেই।

বলতে বলতে মঈনের গলা ধরে এলো। বললো, ‘আমার অনেক খারাপ লাগে ভাবলেই।’

রাত্রি মঈনের কাধে হাত রাখলো। মঈন তাকালো ওর দিকে। চোখে চোখ রাখলো রাত্রি। শান্ত গলায় বললো, ‘তুমি তোমার কাজের প্রতি এতোটা ডেডেকেটেড দেখে ভীষণ ভালো লাগছে। আই এম প্রাউড অফ ইউ মিস্টার হাজবেন্ড।’

মঈন ঠোট এগিয়ে দিলো, ‘উইল ইউ ম্যারি মি রাত্রি?’

রাত্রি কোনো কথা না বলে মঈনের ঠোটে ঠোট রাখলো।

মঈন নিজেকে দুই সপ্তাহ ছুটি দিয়েছিলো। হানিমুনের জন্য। ওরা ইউরোপ ট্যুরে এসেছে। এখন আছে প্যারিস। কাল আমস্টারডাম যাবে। পরশু দুই সপ্তাহ পুরো হবে। ফিরতে হবে দেশে৷ শুক্রবার রাতে ফ্লাইট৷ শনিবার থেকে আবার কাজ শুরু করবে মঈন। তিনটা কন্ট্রাক্ট এসেছে এর মধ্যে৷ এই সপ্তায় কাজের চাপ বাড়বে। সেটা রাত্রিকে বুঝিয়ে বলেছে ও। প্রমিজ করেছে সামনের সপ্তাহ থেকে আবার একটার বেশি কাজ নেবে না৷ বাকি সময় রাত্রির জন্য বরাদ্দ। রাত্রি হোটেল রুমে বসে বসে ট্যুরের ছবিগুলো ফেসবুকে আপ্লোড করছিলো। মঈন গিয়ে হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে সোফার উপর ছুড়ে ফেললো।

‘এইটা কি হলো’, কপট রাগ দেখালো রাত্রি। ‘তোমার মতলবটা কি, হু?’

‘কিছু না তো, জাস্ট একটু হার্টের চিকিৎসা করাবো। মঈন লাইট অফ করে দিলো বেডসুইচ টিপে৷ ডাক্তারদের মতে, সপ্তাহে তিনবারের বেশি…!’

‘ইস দিনে তিনবারের বেশি হয়ে যাচ্ছে আর সপ্তাহ৷ দুষ্টু কোথাকার।’

শনিবার সকাল। বাংলাদেশে ফেরার পর প্রথম দিন৷ রাত্রি এখনো ঘুমুচ্ছে। মঈন উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নিয়েছে। নাস্তা বানিয়েছে রাত্রির জন্যও। তারপর টেবিলে ঢেকে রেখে এখন রেডি হচ্ছে। সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরে পিস্তলে সাইলেন্সার লাগানো শুরু করলো। এমন সময় ঘুম ভাঙলো রাত্রির।

– গুড মর্নিং বাবু।

– গুড মর্নিং, ঘুম ভাঙলো?

– হ্যা, তুমি রেডি?

– ইয়াপ, তুমি উঠে নাস্তা করে নাও। টোস্ট, কফি আর ওমলেট চলবে?

– তোমার হাতের সব চলবে। আচ্ছা তুমি এইভাবে শার্ট প্যান্ট পরেই অপারেশনে যাও নাকি?

– আরে নাহ, বেশিরিভাগ সময় বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে যাই৷ তবে আজকের কাজে তেমন কোনো রিক্স নেই, তাই।

– আচ্ছা, তাই বুঝি? রাত্রি এসে মঈনের গলা জড়িয়ে ধরলো৷ কন্ট্রাক্টটা কিসের গো?

– আর বইলো না, এক পাগল প্রেমিকের। প্রেমিকা তাকে ধোকা দিয়েছে দেখে খুনই করে ফেলবে একদম। কতরকম মানুষ যে আছে দেশে৷ হাহাহা।

– ওয়াও, কি কিউট লাভস্টোরি। হাসলো রাত্রিও। আমি কি ভিক্টিমের ছবিটা দেখতে পারি?

– নতুন করে আর কি দেখবা, তুমি তো তাকে রোজই দেখ আয়নায়। পিস্তলে সাইলেন্সার লাগানো শেষ করে যন্ত্রটা উচু করে ধরলো মঈন। তোমাকে ভীষণ মিস করবো বাকি জীবন।

– মা.. মানে, কি বলছো তুমি? তোমার মাথা ঠিক আছে?

সাইলেন্সার লাগানো ছিলো বিধায় খুব আস্তে করে শব্দ হলো৷ মঈনের চোখ থেকে জল গড়ালো দুই ফোঁটা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।