কথোপকথন || ছোটগল্প

– কি ব্যপার অনিন্দ্য, আজ রাতে ঘুম হয়নি বোধয়! এত সকালে ফোন দিয়েছো যে?

– এত সকালে ফোন দিয়েছি বলে অবাক হয়েছো?

– নাহ, অবাক হইনি! আমার অবাক হওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে বহু বছর আগেই! একটা সময় তোমার সবকিছুতেই অবাক হতাম! এই যেমন, তুমি তাকালে অবাক হতাম! ভালোবাসি বললে অবাক হতাম! তোমার স্পর্শ পেলে অবাক হতাম! তোমার হাসিতে অবাক হতাম!

– আর কি কি কারণে অবাক হতে?

– তোমার সবকিছুতেই অবাক হতাম! শেষবার তোমার চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে দেখতে অবাক হয়েছিলাম! এই যে একটা কাছের মানুষ হয়ে তুমি দূরে চলে গেলে, এর চেয়ে বেশি অবাক আর কিছুতে হইনি!

– খুব অভিমান হয় নাহ?

– অভিমান! না না অভিমান একদম হয়না! অভিমান তো হয় ব্যক্তিগত মানুষের উপর! যে মানুষ দূরে চলে যায়, সে তো আর ব্যক্তিগত থাকে না! তুমি দূরের মানুষ; তোমার সাথে অভিমানটা ঠিক জমবে না!

– দূরে সরিয়ে দিয়েছো এত দ্রুত?

– দূরে যেতে চেয়েছিলে বলেই তো, কাছে রাখিনি!

– আমি যদি বলি, আমি আমার পুরাতন ঘরে ফিরতে চাই আবার! বিশ্বাস করবে?

– ভুল শব্দে শূন্যস্থান পূরন হয় ঠিকই, মার্কস পাওয়া যায়না! তুমি আমার জীবনে ভুল শব্দের মতোই! জেনে শুনে তোমাকে আর আশ্রয় দেওয়া যাবে না!

– ঘৃণা করো?

– নাহ! একবার যার প্রতি ভালোবাসা হয়ে যায়, তার প্রতি ঘৃণা আসেনা! তুমি এখনো ভালোবাসার জায়গায়ই আছো, তবুও তোমার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে জীবনে! আমি আজকাল একা বাঁচতে শিখে গেছি!

– একা একা বাঁচা যায়, কমল?

– যায় তো! একবার একা বাঁচতে শিখে গেলে, তোমার কখনো সঙ্গীর প্রয়োজনবোধ হবেনা! একা মানুষের কখনো ঠকে যাওয়ার ভয় থাকেনা! একা মানুষ আর কখনো একা হয়না! একা হয় তারা, যাদের একটা কাছের মানুষ আছে! আমার এখন আর কোন কাছের মানুষ নেই, আমার একাকিত্বেরও কোন ভয়ও নেই!

– খুব ম্যাচিউর হয়ে গেছো!

– সময় মানুষকে ম্যাচিউর করে তোলে! ম্যাচিউর হওয়ার জন্য প্রতিটা মানুষের জীবনে একজন প্রতারকের প্রবেশ করা জরুরী! জীবনটা যে হাহা হিহি করে কাটিয়ে দেওয়ার বিষয় না, এটা ম্যাচিউর হওয়ার আগে পর্যন্ত বুঝা যায়না!

তা, তোমার স্ত্রী বাড়ি নেই বোধয়?

– হুম, ঠিকই ধরেছো! দুদিন হলো ও ওর বাবার বাড়িতে গেছে!

– বুঝেছিলাম!

– কি করে বুঝলে?

– পুরুষ মানুষ পুরাতনকে স্মরন করে তখন, যখন তার বর্তমান কাছে থাকে না! একা থাকলে তারা তাদের নিজেকে অনুসন্ধান করতে শুরু করে! অপরাধবোধের জায়গা গুলোতে হাত বুলাতে চায়!

– আমি তোমাকে সবসময়ই মনে করি, কমল!

– থাক অনিন্দ্য! এসব শুনতে ইচ্ছে হয়না আর! তোমাকে তো আমার চেয়ে ভালো আর কেউ চিনে না!

– সারা রাত একটুও ঘুমাতে পারিনি! তোমার কথা খুব মনে পরছিলো! তাই এত সকালে ফোন দিলাম! তুমি হয়তো বিরক্ত হচ্ছো!

– নাহ বিরক্ত হইনি! তোমার প্রতি আজকাল আর বিরক্তিও কাজ করেনা! প্রেম, ভালোবাসা, বিরক্তি, রাগ, অভিমান এসব কাছের মানুষের জন্য! তোমাকে তো এখন আর কাছের মানুষ ভাবিনা!

– তোমার জীবনে কি আমার প্রবেশ করার আর কোন অধিকারই নেই!

– স্ত্রী ঘরে নেই বলে আমাকে ফোন দিয়েছো! আবার অধিকার চাইছো!

প্রতারনা করার অভ্যাসটা তোমার যায়নি এখনো! একসময় আমাকে ঠকিয়েছো! এখন তাকে ঠকানোর চেষ্টা করছো!

এত’টা ছোটলোক স্বভাবের কি করে হয়ে গেলে তুমি?

– প্রিয়দর্শিনী, আমার স্ত্রী! তার সাথে আমার ঠিক এডজাস্ট হচ্ছে না! সম্পর্কের দায়বদ্ধতায় একই ছাদের নিচে থাকতে হচ্ছে!

– বহু ঘাটে জল খাওয়া পুরুষ মানুষ তো কোন বন্ধনে থাকতে পারে না!

– অপমান করছো?

– অতটুকু মান সম্মানবোধ তোমার আছে?

– আমাকে কি তোমার অতটাই লেইম মনে হয়?

– তারচেয়েও বেশি মনে হয়! যে পুরুষ তার স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে প্রাক্তনের কাছে ফিরে যাওয়ার আবদার করে, তার পুরুষত্ব নিয়ে আমার সন্দেহ আছে!

– যার সাথে থাকতে আমার ভালো লাগছে না, তার সাথে কি করে রয়ে যাই?

– শোন অনিন্দ্য, ‘উই আর মেড ফর ইচ আদার’ টাইপ মানুষ কখনো থাকে না! মানুষকে মেড ফর ইচ আদার বানিয়ে নিতে হয়!

– তোমাকে ছেড়ে আসাটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল!

– তোমার ছেড়ে যাওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি!

– মানে?

– মানে, তুমি চলে গেছো বলে বেঁচে গেছি! একটা প্রতারক জীবনে রয়ে যাওয়ার চেয়ে চলে যাওয়া মঙ্গলজনক!

বড় বাঁচা বাঁচিয়ে দিয়েছো, অনিন্দ্য!

– আমি কি তবে খালি হাতেই ফিরে যাবো?

– আমি ও তো একদিন খালি হাতেই ফিরে এসেছিলাম! ঘরে ফিরে সে কি জন্মের কান্না কেঁদেছিলাম!

– আমাকে ক্ষমা করো, কমল!

– তার আর প্রয়োজন হবেনা!

– কেন?

– তোমার প্রতি আমার এখন আর কোন অভিযোগ বেঁচে নেই! অভিযোগেরাও একদিন মরে যায়! অভিমানেদেরও একদিন মরে যেতে হয়!

– তবে কি শূন্যতাকে সাথে নিয়েই বাঁচতে হবে?

– যে নতুন মানুষটা আছে জীবনে, তাকে নিয়ে বাঁচো! সে ও তো তোমার কাছে একটু ভালোবাসা প্রত্যাশা করে! তোমার জন্যই হয়তো কপালে টিপ পড়ে রোজ রোজ আয়না দেখে! তোমার ঘরে ফেরার অপেক্ষা করে! তোমার কাছেই একটু যত্ন চায়! যে আছে, তাকে ভালোবাসো!

আমার কাছে ভালোবাসা চাইতে এসো না!

যে ঘর একবার ছেড়ে এসেছি, সেই ঘরে আমি আর কখনোই ফিরবোনা!

ভালো থেকো, অনিন্দ্য! নিজের খেয়াল রেখো!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।