কতটা জরুরী ছিল সাকিবের বিশ্রাম?

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে সফলতম ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান দলের মূল ব্যাটসম্যান, দলের মূল বোলার। যে কোন কারণেই তাঁকে দলে না পাওয়া তাই বাংলাদেশ দলের জন্য বিশাল ক্ষতির। শেষ টেস্ট সিরিজেও তাঁর পারফরম্যান্স ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল।

অস্ট্রেলিয়া দলের সাথে তাঁর টেস্ট অভিষেকেই ১০ উইকেট এবং হাফ সেঞ্চুরির বিরল রেকর্ড গড়েন। ম্যান অব দ্যা ম্যাচও হয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় টেস্টেও ভালো ফর্মে ছিলেন তিনি। এত অসাধারণ ফর্ম থাকার পরও হুট করেই দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের আগে ছুটি চেয়েছেন সাকিব যা বোর্ড মঞ্জুরও করে।

তবে দল যে সামনের সিরিজে সাকিব কে মিস করবে সেই ব্যাপারে সন্দেহ নেই কারও। এই কারণে অনেকে দুঃখ পেয়েছেন, কেউ কেউ সাকিবের সিদ্ধান্ত মেনেও নিতে পারছেন না। আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে সাকিব কে নিয়ে।

চলুন, একটু দেখে নেই যুক্তি কি বলে? আসলেই কি প্রয়োজন ছিল সাকিবের এই ছুটির?

২০০৬ সালে সাকিবের টেস্ট অভিষেক হয়। তাঁর অভিষেকের পর বাংলাদেশ খেলেছে ৫৮টি টেস্ট যার মধ্যে সাকিব ছিলেন না কেবল ৮টি টেস্টে। বাংলাদেশ ক্রিকেট প্রেমীদের বরাবরই অভিযোগ অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ টেস্ট খেলার সুযোগ পায় কম। তাই সাকিবের এই সিদ্ধান্ত কিছুটা বিস্ময়কর বটে।

কিন্তু তাঁর এই সিদ্ধান্ত শুধু টেস্ট দিয়ে বিবেচনা করলে হবে না। তিন ফরম্যাটেই ব্যাটে ও বলে বাংলাদেশের মূল ভরসা সাকিব। সব ফরম্যাট মিলিয়ে বাংলাদেশের সব খেলোয়াড় থেকে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন সাকিব। তাই ক্লান্তি ছুঁয়েছে তাঁকে। আর শুধু আন্তর্জাতিক খেলায়ই নয়, টি-টুয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটেও তাঁর চাহিদা অপরিসীম। বিশ্বজুড়ে ৬টি টুর্নামেন্টের ৮টি ফ্র্যাঞ্চাইজি তে প্রতিনিধিত্ব করেন এই অলরাউন্ডার। এবং একজন জেনুইন অলরাউন্ডার বলে অন্য যেকোন খেলোয়াড়ের তুলনায় তাঁর উপর ধকলটাও যায় দ্বিগুণ।

অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের সঙ্গে তুলনায় সাকিবের অবস্থান কোথায়?

সাকিবের টেস্ট অভিষেকের পর থেকে আজ পর্যন্ত ৭৫০ দিনেরও বেশি সক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক ও প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ছিলেন সাকিব। এখনও তিন ফরম্যাটেই খেলছেন এমন অলরাউন্ডারের মধ্যে কেবল শ্রীলঙ্কার ম্যাথুস এবং ইংল্যান্ডের মঈন আলীই সাকিবের চাইতে বেশি দিন খেলেছেন। যদি কেবল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিবেচনা করা হয় তবে কেবল ম্যাথুসই সাকিবের চাইতে এগিয়ে থাকবেন এই প্রেক্ষিতে।

অনেক ক্রিকেটার যেমন মহেন্দ্র সিং ধোনি, কুমার সাঙ্গাকারা, এবি ডি ভিলিয়ার্স, জেমস অ্যান্ডারসন, অ্যালিস্টার কুক প্রমুখ অনেকেই সাকিবের চাইতে বেশি সময় আন্তর্জাতিক খেলার মাঠে কাটিয়েছেন তবে তারা সকলেই হয়তো কোন না কোন ফরম্যাট থেকে অবসর নিয়েছেন আর সাঙ্গাকারা তো ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে নিয়েছেন।

শুধু অলরাউন্ডার বিবেচনা না করে যদি তিন ফরম্যাট খেলা যেকোন খেলোয়াড় কে বিবেচনা করা হয় তবে হাশিম আমলা, বিরাট কোহলি এবং ডেভিড ওয়ার্নার সাকিবের চাইতে বেশি ম্যাচ খেলেছেন। শীঘ্রই প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকা ডিভিলিয়ার্সও সাকিবের চাইতে ৫০দিনের বেশি খেলেছেন প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট।

সাকিবই কি বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিশ্রম করা খেলোয়াড়?

এই, প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই হ্যা। তিনি বাংলাদেশের একমাত্র অলরাউন্ডার যিনি দশ বছর ধরে সকল ফরম্যাটেই বিরতিহীন ভাবে নিজের সেরাটুকু দিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়াও আন্তর্জাতিক ম্যাচ ব্যাতীত বিশ্বব্যাপী ফ্র্যাঞ্চাইজ টুর্নামেন্ট গুলোতে তাঁর সরব উপস্থিতি দেখা যা যা দলের বাকি ২ জন সিনিয়র খেলোয়াড়  – তামিম বা মুশফিকের ক্ষেত্রে দেখা যায়না। মুশফিক, যিনি ব্যাটিং এর সাথে কিপিংও করেন, তার কর্মভারই কেবল সাকিবের কাছাকাছি আসে। সাকিবের অভিষেকের পর হতে তিনি প্রায় ৭২০ দিন খেলার মাঠে কাটিয়েছেন।

সাকিবের সাম্প্রতিক ব্যস্ততা কতটুকু?

২০১৫ সাল থেকে, সাকিব পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিযোগিতার সাতটি ফ্র্যাঞ্চাইজিতে খেলেছেন। বিশ্বের সেরা পাঁচজন অলরাউন্ডারের মাঝে তাঁর ব্যস্ততাই সবচাইতে বেশি। এই সময়কালে বাংলাদেশের খেলা ১৪টি টেস্টের প্রতিটিতে ছিলেন সাকিব যদিও তা মঈন আলীর খেলা ৩৭ টেস্টের এক তৃতীয়াংশ মাত্র। সেই সময়ের অভিষিক্ত দের মাঝে সাকিব এবং মুশফিকই কেবল এখনও তিন ফরম্যাটেই খেলা বিরল শ্রেণীর ক্রিকেটার।

ক্লাস অব ২০০৬

  • অ্যালিস্টেয়ার কুক: ২০১৪ সালের পর থেকে ওয়ানডে খেলেন না।
  • স্টুয়ার্ট ব্রড: ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে ওয়ানডে খেলেন না।
  • রস টেলর: ২০১৬ সালের মার্চ থেকে টি-টোয়েন্টি খেলেন না, ওয়ানডেতেও অনিয়মিত।
  • মুশফিকুর রহিম: তিন ফরম্যাটেই খেলেন।
  • চামারা কাপুগেদারা: ২০০৯ সালে সর্বশেষ টেস্ট খেলেছেন।
  • উপুল থারাঙ্গা: টেস্ট থেকে ছয় মাসের বিরতি নিয়েছেন।

তবে এসব তুলনা করে তাঁর ক্লান্তির কথা বোঝাটা দায়। অন্যান্য যেকোন দল থেকে বাংলাদেশ দলের মূল খেলোয়াড় হিসেবে সাকিবের উপর প্রত্যাশার চাপটা তার সমসাময়িক অন্য যেকোন দলের খেলোয়াড়দের চাইতে একটু বেশিই। শুধু ক্রিকেটপ্রেমীদেরই নয়, বরং দলের কোচ ও অধিনায়কের ভরসার মধ্যমণি এই সাকিবই। অস্ট্রেলিয়ার সাথে শেষ সিরিজের প্রথম টেস্টে দুই ইনিংস মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার খেলা ১৪৬ ওভারের মধ্যে সাকিব একাই করেছে ৫৪ ওভার বোলিং। সাথে  ‍দুই ইনিংস মিলিয়ে ব্যাটিং এ ছিলে ১৪৪ বল।

বাংলাদেশের ইতিহাস তৈরির এই ম্যাচে তো অধিনায়ক না হয়েও অধিনায়কত্বও করতে দেখা গেল তাঁকে। বাংলাদেশের সব ম্যাচেই কমবেশি এমন দৃশ্য দেখা যায় যেখানে দলের ব্যাটিং ও বোলিং এমনকি ফিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও মূল ভারটা সাকিবকেই নিতে হচ্ছে। তাই, এতসব ভার নিয়ে সাকিব ক্লান্ত হতেই পারেন। আর ক্লান্ত সাকিবকে জোর করে খেলিয়ে ২-৩ বছর আগেই তাঁকে হারানোর চাইতে একটি সিরিজে তাঁকে মিস করে আরও ২-৩ বছর বেশি তাঁকে দলে পাওয়াটাই বোধহয় লাভজনক হবে আমাদের জন্য। আশা করি তাঁর অনুপস্থিতি বাংলাদেশ দলের বাকি ক্রিকেটাররা ভালোভাবেই সামলে নেবেন।

ইএসপিএন ক্রিকইনফো অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।