কঠোর পরিশ্রমই তারকার জন্ম দেয়: অনিল কাপুর

‘মুবারাকান’ সিনেমায় অনবদ্য ছিলেন অনিল কাপুর। পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই এভাবেই নিজের জাঁত চিনিয়েছেন এই চিরসবুজ অভিনেতা। ষাটে পা দিয়েও, এখনো নিজেকে প্রতি মুহূর্তেই নতুন করে আবিস্কার করছেন, বিভিন্ন মাধ্যমে সমানভাবে কাজ করার মাধ্যমে নিজের সাফল্যের ঝুলিকে সমৃদ্ধ করে তুলছেন। পর্দায় স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি আর মোহনীয় অভিনয় দিয়ে প্রায় চার দশক জুড়ে দর্শক হৃদয়ে স্থান করে আছেন তিনি। কাজের প্রতি প্রবল উদ্যম আর নিষ্ঠাই তাকে এতদূর নিয়ে এসেছে।নিজের কাজ নিয়ে কখনো আত্মতুষ্টিতে ভোগেন না তিনি।

সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত ‘মুবারাকান’ সিনেমাসহ আরও অনেক বিষয়ে কথা হল তাঁর সঙ্গে। মুবারাকান নিয়ে কথার শুরুতেই জানালেন, ছবিটির সাথে তিনিই প্রথম যুক্ত হয়েছিলেন, ‘মজার বিষয় হচ্ছে, আমরা ছবিটির শুটিং মাত্র ৬ মাসেই শেষ করেছি। তাই বলা যায়, আমরা একটি ‘গরম-গরম’ ছবি দর্শকদের উপহার দিয়েছি’, নিজের স্বকীয় ভঙ্গিতেই বললেন তিনি।

এখনো সিনেমায় তাঁর প্রানবন্ত উপস্থিতির রহস্যটি বেশ উৎসাহের সাথেই জানিয়ে বললেন, ‘এটা আমার কাজের জন্য ভালবাসা, আর সৃষ্টিকর্তাও সহায় ছিলেন। ভালো কাজের প্রশংসা আর কখনো-কখনো কাছের মানুষদের একটু পিঠ চাপড়ে দেয়াও অনেক আত্মবিশ্বাস যোগায়।’

১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘হামারে তুমহারে’ দিয়ে বলিউডে আগমন তাঁর। অনিল কাপুর বলেন, ‘আমি ১৯৭৭ সাল থেকে কাজ করছি, আর এখন ২০১৭। প্রতি বছরই কিছু না কিছু ইতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। এমনকি বিয়ে, সন্তানের বাবা হওয়াসহ প্রতিটি ইতিবাচক বিষয়ই আমাকে নতুন উদ্দীপনার সাথে কাজ করতেসাহায্য করেছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষদের সাথে উঠা-বসা করা, ভ্রমন করা আর প্রাপ্ত সুযোগগুলোর সৎব্যবহার করার মাধ্যমেই মানুষ পরিনত হয়, আমিও ব্যতিক্রম নই।’

তাঁর বর্ণাঢ্য কারিয়ারের অনেক অর্জনের মাঝে অন্যতম হচ্ছে টিভি সিরিজ ‘২৪’। যেটাকে তিনি ‘পুনরুজ্জীবনের মন্ত্র’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। গর্বের সাথেই বললেন, ‘ভারতে ছোটপর্দায় ফিকশন নিয়ে এই মাপের কাজ এর আগে হয়নি। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দারুন একটি কাজ হয়েছিলো।’ ছোটপর্দার বিশাল জগতের সাথে অনিল কাপুরের পরিচয় হয়েছিলো ‘২৪’-এর মাধ্যমে আর একইসাথে এক ঝাঁক নতুন প্রতিভার সাথেও কাজ করেছিলেন তিনি। অনেক অনেক অ্যাওয়ার্ডের সাথে বিশ্বজোড়া পরিচিতিও পেয়েছিলেন সফল টিভি সিরিজটির বদৌলতে।

সিনেমায় সবসময় নিজের সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করেন অনিল কাপুর। মিষ্টার ইন্ডিয়া, তেজাব, রাম লক্ষন, পারিন্দা, ১৯৪২: অ্যা লাভ ষ্টোরি, ভিরাসাত, নায়ক থেকে লামহে পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি কাজেই শ্রেষ্ঠত্বের ছাপ দেখা যায়। এমনকি ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দিল ধারাকনে দো’ চলচ্চিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের স্বীকৃতি স্বরূপ ফিল্মফেয়ার সেরা সহ-অভিনেতার পুরস্কার জেতেন তিনি।

তবে কারিয়ারের এই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে সবচেয়ে বেশী ত্যাগ স্বীকারকরতে হয়েছে তাঁর পরিবারকে, অবলীলায় বলে গেলেন তিনি, ‘যখন আমি একটি চরিত্রের জন্য প্রস্তুতি নিই, আমি অস্থির আর খিটখিটে হয়ে উঠি, আর আমার পরিবার সহজেই বিষয়টি বুঝতে পারে। আমি চরিত্রের চলন-বলন, পোশাক-আশাক নিয়ে অনবরত কথা বলতে থাকি। এগুলো নিজেকে প্রানবন্ত রাখতে সাহায্য করে।’

তাঁর তিন সন্তান অভিনেত্রী সোনম কাপুর, অভিনেতা হর্ষবর্ধন কাপুর এবং প্রযোজক ও উদ্যোক্তা রিয়া কাপুরের ক্যারিয়ার নিয়েও বেশ উচ্ছসিত তিনি। তবে তাদের নিজস্ব পরিচিতি  নিজেদেরকেই গড়ে তুলতে হবে বলে মনে করেন তিনি, ‘তাদের নিজেদের লড়াই তাদেরকেই লড়তে হবে। এটা বেশ কঠিন পথ। অন্যদের চেয়ে তাদের নিয়ে সবার প্রত্যাশার পারদটাও উচু, তাই তাদেরকে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশী পরিশ্রম করতে হবে। শুধু ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রী হলেই হবেনা, নিজেদের ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। আর আমি মনে করি তারা সঠিক পথেই আছে।’

সোনমের ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁর বিশ্বাস সোনম অভিনয় ও ফ্যাশনের ব্যাপারে সমানভাবে নিবেদিত। অনিল কাপুরের মতে, ফ্যাশন একটি সৃজনশীল ক্ষেত্র, যা ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান গড়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সোনম নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। খুবসুরাত, রানঝানা, ভাগ মিলখা ভাগ, নীরজা-র মতো সিনেমাগুলোর মাধ্যমে সে অভিনয়ে অনেক পরিণত হয়েছে। মানুষ তার অভিনয়, ফ্যাশন, সততা আর অকপটতার জন্য তাকে ভালবাসে।’

তাঁর মতে, সোনম শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ। তিনি আর. বালকি’র পরবর্তী ছবি ‘প্যাডম্যান’ ও সঞ্জয় দত্তের বায়পিকে রণবীর কাপুরের বিপরীতে সোনমকে দেখার জন্যে মুখিয়ে আছেন।

অনিল কাপুরের মতে, তাঁর একমাত্র পুত্র অভিনেতা হর্ষবর্ধন কাপুর বয়সের তুলনায় বেশ পরিণত। বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানের পরবর্তী ছবি ‘ভবেশ যোশী’-তে অভিনয় করছেন হর্ষবর্ধন। শীঘ্রই মুক্তি পাবে ছবিটি। পুত্রের জন্যে প্রশংসাই ঝরল পিতার কণ্ঠে, ‘মিরজা-তে দারুণ অভিনয় করেছিল হর্ষ, আশা করি, ‘ভবেশ যোশী’-তেও সে তার প্রতিভার ছাপ রাখতে পারবে। বিক্রম একজন অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাতা।’

অপর কন্যা প্রযোজক রিয়া কাপুরের আসন্ন ছবি ‘ভিড়ে দি ওয়েডিং’ নিয়েও বেশ উৎফুল্ল মনে হল তাঁকে। সোনম ও কারিনা কাপুর ছবিটির মূল ভূমিকায় অভিনয় করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ছবিটির গল্পে নতুনত্ব আছে। তিনি বলেন, ‘গল্পটি চারজন তরুণীকে নিয়ে।কাস্ট, গান সহ সবকিছুই সুন্দরভাবে রুপায়িত হচ্ছে।’ তাঁর চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে, যখন তিনি বলেন, ‘বাবা হিসেবে আমি আমার সন্তানদের নিয়ে গর্বিত।’

তিনি স্ত্রী সুনিতাকে পরিবারের দেখভাল ও সবসময় পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ জানান। বললেন, ‘সন্তানদের সুন্দরভাবে গড়ে তোলার পুরোটা কৃতিত্বই সুনিতার প্রাপ্য। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল সুনিতাকে বিয়ে করা। ও পরিবারের সবার সহায়ক শক্তি, সব কৃতিত্বই ওর।’

অতঃপর আলোচনা মোড় নেয় বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যমগুলোর দিকে। এগুলোর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা নিয়ে তাঁর অভিমত জানতে চাইলে তিনি এগুলোর গুরুত্বকে একেবারে অস্বীকার করেননি। তবে তাঁর মতে, সামাজিক মাধ্যমগুলোর দ্বারা অর্জিত ঠুনকো জনপ্রিয়তা প্রকৃত প্রতিভার সামনে টিকে থাকতে অক্ষম। তিনি বলেন, ‘ক্রিস্টোফার নোলান এখনো টেলিভিশন বা অন্যান্য তথাকথিত আধুনিক মাধ্যমগুলোতে বিশ্বাস করেননা। তিনি এখনো ফিল্মে শুট করেন আর বড় পর্দায় পূর্ণ আস্থা রাখেন। তিনি ‘যুগের চাহিদা’-র নামে কোনো অযৌক্তিক আধুনিকতার আশ্রয় নেননি। তবুও, বর্তমানে তিনি পৃথিবীর শীর্ষ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন।’

স্বজনপ্রিয়তা নিয়ে কথা বলতে খুব একটা আগ্রহী নন তিনি। তবুও বললেন, ‘বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশীই কথা চালাচালি হচ্ছে।’ তাঁর মতে, ৪০ বছর আগে, তিনি নিজে অভিনেতা হওয়ার জন্য যতটা পরিশ্রম করেছিলেন, এখনো অভিনেতা/অভিনেত্রীদের নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে ততটাই পরিশ্রম করতে হয়। আর তিনি বিশ্বাস করেন, কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়েই আসল তারকাদের জন্ম হয়।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘তাড়াহুড়ো না করে ধীরে-সুস্থে কাজ করার মাধ্যমেই ইন্ডাস্ট্রিতে সফল হওয়া যায়। সময়ের বড় তারকারা সবাই অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে করে তাদের আজকের অবস্থায় পৌঁছেছেন। নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমেই ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকতে হয়।’

আগামী ২৪ ডিসেম্বর জীবনের ৬০ তম বসন্তকে বিদায় বলে ৬১ তে পা রাখবেন এই চির সবুজ তারকা। তিনি নিজেও বললেন, ‘আমি আমার ৬১ তম জন্মদিনের জন্য মুখিয়ে আছি!’

ফিল্মফেয়ার অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।