কঙ্কাবতী কথা

‘এখনো কি সুন্দর দেখতে কি আভিজাত্যপূর্ণ!’ -শর্মিলা ঠাকুর কে এখনও দেখলেই আমাদের মুখে প্রথমেই এই কথাটা আসে।কোন মানুষ যখন নিজেকে যুগান্তর সুন্দর রাখেন – এর পিছনে লুকিয়ে থাকে কোনো এক গল্প নিত্যদিনের অধ্যাবসায় শিক্ষা চর্চা পরিমিতি বোধ সবদিকদিয়ে।

কি এমন সেই ঘটনা যা শর্মিলা ঠাকুর-কে তাঁর জীবন সুসজ্জিত করতে বাধ্য করেছিল। যে ঘটনা আজীবন মনে রেখে শর্মিলা তাঁর জীবন দর্শন পাল্টে ফেললেন?

জানতে ইচ্ছে করছে তো?  তাহলে টাইম মেশিনে করে চলে যেতে হবে আরও অনেক বছর পিছিয়ে।

শর্মিলার প্রকৃত পদবী যেহেতু ঠাকুর তাই তিনি যে গুরুদেব রবি ঠাকুরর উত্তরসূরী, এ তো জানা। একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক রবি ঠাকুরের সঙ্গে শর্মিলা ঠাকুরের সম্পর্ক। আমি যেটুকু যেভাবে জানি লিখছি। কোনো ভুল হলে সঠিক তথ্য জানলে যোগ করবেন।

ঠাকুরবাড়ীর পরিবার বৃক্ষ দেখা যাক।

শর্মিলা ঠাকুর কিন্তু বাবা মা দু’দিক দিয়েই ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে জড়িত। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সন্তান দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতনি ছিলেন লতিকা ঠাকুর। লতিকা বিয়ে করেন অসমের জ্ঞানদাভিরাম বড়ুয়াকে। জ্ঞানদাভিরাম ছিলেন গুয়াহাটির আর্ল ল’ কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ।

জ্ঞানদাভিরাম এবং লতিকার কন্যা হলেন ইরা। তাঁর আবার বিয়ে হল মামাবাড়ির দিকে জ্ঞাতি পরিবারে। ইরার স্বামী হলেন গীতিন্দ্রনাথ ঠাকুর।

এই গীতিন্দ্রনাথ ঠাকুর সমন্ধে এবার আসুন জানি। নাহ না গুলিয়ে যাবেনা। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ভাই ছিলেন গিরীন্দ্রনাথ।

গিরীন্দ্রনাথের সন্তান গুণেন্দ্রনাথ। গুণেন্দ্রনাথের ছেলে গগনেন্দ্রনাথ ( বিখ্যাত গগন ঠাকুর নামেও )। গগনেন্দ্রনাথের পুত্র কনকেন্দ্রনাথ। কনকেন্দ্রনাথের সন্তান হলেন গীতিন্দ্রনাথ।

অর্থাৎ দাদুর বাবার ভাইয়ের নাতির নাতিকে বিয়ে করেছিলেন লতিকা ঠাকুর কন্যা ইরা। গীতিন্দ্রনাথ-ইরার মেয়ে হলেন শর্মিলা।

তার মানে দাঁড়াল‚ শর্মিলা ঠাকুর হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদার মেয়ের নাতনি।

উফ, আজকাল অনু পরিবার কেন্দ্রিক সমাজে এই পরিবার বৃক্ষের শাখা প্রশাখা বোঝা খুব জটিল তবু আমাদের গল্প বলতে দরকার।

আসি আমাদের মূল গল্পে, কি এমন ঘটনা যা পাল্টে দেয় শর্মিলা ঠাকুরের জীবন দর্শন?

তখন রিঙ্কু ওরফে শর্মিলা ছোট্ট মেয়ে স্কুলে পড়ে। ছোটো রিঙ্কুকে তাঁর মা রবি ঠাকুরের ‘গোরা’ বইটি উপহার দেন এবং বলেন ‘দেখো রিঙ্কু এই বই একটা দুর্লভ সম্পদ যার দায়িত্ব আমি তোমায় দিলাম।এই বই তুমি আরও পাবে কিন্তু আমি যা দিলাম সেটা কোথাও পাবেনা।কারন এই বইতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সই করে দিয়েছেন।রবি ঠাকুরের নিজের হাতে লেখা সই দেখো রয়েছে এই বইতে।’

শর্মিলা তো এমন মহারত্ন পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। তখন শর্মিলা খুব অগোছালো ছিলেন সবসময় খামখেয়ালী ভাবেই ঘুরে বেড়াতেন। কোনো বিষয়ে দায়িত্ব নিতেননা। ছোটো মেয়ে এত দায়িত্বশীল না হওয়াই স্বাভাবিক। শর্মিলা সেই বই নিয়ে স্কুলে সহপাঠিনীদের দেখাতে গেলেন যে তাঁর কাছে রবি ঠাকুরের সই করা বই আছে।

সারা ক্লাসকে দেখানো হয়ে গেল রিঙ্কুর। কিন্তু কিছু সময় বাদেই তার টনক নড়ল দেখলো ব্যাগ থেকে বই উধাও। কোনোভাবেই সেই যখের ধন খুঁজে পেলনা রিঙ্কু। বাড়ি ফিরল কাঁচুমাচু মুখ করে।

শর্মিলার মা তো প্রচন্ড রেগে গেলেন। যে তিনি তাঁর মেয়েকে বারংবার বলে দিয়েছিলেন বইটা অতি সাবধানে যত্ন করে সংরক্ষিত রাখতে আর মেয়ে সেই দায়িত্বটা পালন করলনা। ওমন দুস্প্রাপ্য বই যাতে রবি ঠাকুরের নিজ হাতে সই আছে মেয়ে সেটা হারিয়ে এল। যে বইটার সঙ্গে অনেক আবেগ অনুভূতি পারিবারিক স্মৃতি জড়িয়ে।

শর্মিলার মা ইরা দেবী মেয়ের দায়িত্বহীনতায় এতটাই আঘাত পান যে শর্মিলার সঙ্গে ছয় মাস কথা বলা বন্ধ রেখেছিলেন।

মারধোর বকাবকি কিছু করেননি কিন্তু কঠোর মৌনতায় মেয়েকে জীবনে দায়িত্ববোধ নিতে হয় বুঝিয়ে দেন মা ইরা দেবী। এটি খুব শেখার জিনিস, আজকালকার মায়েরা আগেই গায়ে হাত তুলে দেন সন্তানদের যাতে সন্তানরা আরও হিংস্র জেদী হয়ে ওঠে।কিন্তু কঠোর মৌনতা অনেক শিক্ষা দিয়ে দেয়।

সেই থেকে মূল্যবান জিনিস হারানোর যে কষ্ট অনুভব করেছিলেন শর্মিলা আর কখনও জীবনে চলার পথে এতটুকু অসতর্ক হননি। নিজের ক্যারিয়ার সংসার সন্তান সমগ্র জীবনে সব প্রতিবন্ধকতা উত্তরণ করে নিজেকে এত সুন্দর করে রাখেন সবদিকদিয়ে সেই শিশুবেলায় পাওয়া শিক্ষা থেকে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।