ওয়েক আপ বিসিবি! ওয়েক আপ!

বিষয়টা হচ্ছে ক্রিকেটের কোচ ও ক্যাপ্টেন নিয়ে। ক্রিকেটে কোচের ধারণা আর ফুটবলের কোচের ধারণা যদি আপনি এক করে ফেলেন, তাহলে সমস্যা হবে। ক্রিকেট-কোচ আর ফুটবল-কোচ, ‘কোচ’ শব্দটা এক হলেও কাজ একই না। তাঁরা একই ভূমিকায় কাজ করেন না। ফুটবলে যে কাজটা কোচ করেন, ক্রিকেটে সেই কাজটা ক্যাপ্টেনকে করতে হয়। ক্রিকেটে কোচ বড় জোড় একজন মেন্টর, পরামর্শক বা কাউন্সিলর।

ক্রিকেটকে বলা হয় ‘ক্যাপ্টেন’স গেইম’। ক্রিকেটের মতো আর কোনো খেলায় অধিনায়কের এত বিস্তৃত ভূমিকা হয়তো থাকে না। তাই ক্রিকেট খেলাটা অনেকটাই আপনার ছেড়ে দিতে হবে অধিনায়কের উপর। তাঁর উপর সঁপে দিতে হবে, দলের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের পূর্ণ ভার। এই ক্ষেত্রে যদি কেউ অধিনায়কের দায়িত্বটাকে খর্ব করতে চান বা অধিনায়কের চেয়ে কোচকে বেশী অগ্রাধিকার দিতে চান তাহলে সংঘাত অনিবার্য।

ক্যাপ্টেন আর কোচের মধ্যে আরো একটা ব্যাপার নিয়েও ঝামেলা বাঁধে, সেটা হচ্ছে ব্যক্তিত্ব। কোনো কারণে, কেউ কারো ব্যক্তিত্বকে যথাযথ সম্মান দিতে না চাইলে, সেই ক্ষেত্রেও সংঘাত অনিবার্য।

এখন কয়েকটি সফল কোচ-ক্যাপ্টেন জুটির দিকে লক্ষ্য করুন। সৌরভ গাঙ্গুলি-জন রাইট, রিকি পন্টিং-জন বুকানন, গ্যারি কারেস্টেন-এমএস ধোনী, টম মুডি-মাহেলা জয়াবর্ধনে, হ্যানসি ক্রনিয়ে-বব উলমার, অর্জুনা রানাতুঙ্গা-ডেভ হোয়াইটমোর, গ্রায়েম স্মিথ-মিকি আর্থার ইত্যাদি।

এখানে আমার পর্যবেক্ষন হচ্ছে, প্রত্যেকটা জুটির ক্ষেত্রে অধিনায়কই ছিলেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। কোচ কাজ করেছেন নিভৃতে, অন্তরালে। অস্ট্রেলিয়ায় তো শুধু পন্টিং কেন, সব ক্যাপ্টেনের ক্ষেত্রেই ওরা উদার। অধিনায়কের কর্তৃত্বের ব্যাপারে সবচেয়ে সজাগ ভূমিকা সম্ভবত ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ায় রাখে। তো ভারতেও কারেস্টেন ছিলেন চুপচাপ প্রকৃতির। তিনি অবশ্য স্বভাবগতভাবেই তা-ই। সেখানে তিনি শুধু পরামর্শক বা মেন্টরের কাজ করে গেছেন। লাইমলাইট, পাওয়ার সেসব ক্যাপ্টেনের জন্য ছেড়ে দিয়ে তাঁর যতটুকু কাজ ঠিক ততটুকুই করেছেন। একই ব্যাপার ছিল জন রাইটের ক্ষেত্রেও। সৌরভ গাঙ্গুলির ছিল সেখানে একচ্ছত্র ক্ষমতা। রানাতুঙ্গাও একই রকম কর্তৃত্ব ভোগ করেছেন।

টম মুডিও কর্তৃত্ব নিয়ে মাহেলার সাথে ঝামেলায় যাননি। স্মিথকেও কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি, আর্থার নীরবে তাঁর কাজ নিয়েই ছিলেন সন্তুষ্ট। তবে ক্রনিয়ে ও উলমারের ব্যাপার নিয়ে আমি ঠিক নিশ্চিত না। উলমার ও ক্রনিয়ে দুজনই শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব, এবং দুজনই কর্তৃত্বের ব্যাপারটাতেও সম্ভবত সবচেয়ে সজাগ ছিলেন। ক্রনিয়ে আমার খুব পছন্দের ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব হলেও, উলমার-ক্রনিয়ে সময়টাতে ছোটো ছিলাম। পুঁথিগত বিদ্যাও তাদের ব্যাপারে তেমন একটা নেই, তাই তাদের সফল জুটির রহস্য সম্পর্কে আমি ঠিক নিশ্চিত নই। যদিও এই ব্যাপারে নিশ্চিত যে, কর্তৃত্ব ছিল ক্রনিয়ের হাতেই। এখন উলমার সেটাতে কিভাবে সায় দিয়েছিলেন বা মেনে নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে কোনো ক্ল্যাশ ছিল কি-না, ঠিক জানি না।

আচ্ছা এদ্দুর তো গেল। এখন আবার চ্যাপেল-সৌরভ জুটিতে দেখুন, চ্যাপেল চাইলেন নিয়ন্ত্রণ, সৌরভ তা মানলেন না। ব্যস, বেঁধে গেল ঝামেলা! চ্যাপেল নিয়ন্ত্রণ পেলেন, দ্রাবিড় যামানায়। কিন্তু তাতে হলো কী? সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটিং লাইন আপ নিয়েও, ২০০৭ বিশ্বকাপে গিয়ে ভারতের অর্জন কেবল বারমুডার বিপক্ষে একটা জয়!

কারণ, এটা উলটো রথে চলা। ক্রিকেট খেলাটাই হচ্ছে ক্যাপ্টেন-নির্ভর। এখানে জোর করে কোচ ঢুকতে পারেন না। কোচ ততটুকুই করবেন, যতটা তাঁর করা উচিৎ। ক্যাপ্টেন তাঁর ক্ষমতার সীমা ভুললেও, কোচ ভুলতে পারেন না। ক্যাপ্টেন একনায়ক হলেও, কখনো রেজাল্ট পক্ষে আসলেও আসতে পারে। এটা নির্ভর করে ক্যাপ্টেনের বিচক্ষণতার উপর। কিন্তু কোচ স্বেচ্ছাচারী হলে সমস্যা। ক্রিকেট খেলাটাকে আপনি জোর করে কোচ’স গেইম বানাতে পারেন না।

আমাদের ক্রিকেটে সবসময় কোচই ছিলেন সর্বেসর্বা। পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কোচের হাতেই ছিল বরাবর। সেটার যৌক্তিক কারণও ছিল, সবে হাঁটতে শেখা একটা ক্রিকেট খেলুড়ে দলের তো তেমন ক্যাপ্টেন থাকে না। তাই হাতে-কলমে শেখানো থেকে মাঠে গিয়ে কি করবে, কারা করবে, কিভাবে করবে, সবই কোচ ঠিক করে দিতেন। স্বাভাবিকভাবে ক্যাপ্টেনও তা-ই মেনে নিতেন। পরিবেশটাও এমন ছিল যে, ক্যাপ্টেনের কাছে সেটাই ছিল স্বাভাবিক। ক্যাপ্টেন বাড়তি কর্তৃত্ব নেয়াটাকে হয়তো বিপদও মনে করতেন। তখনকার ক্রিকেট কালচারের কারণে, সেরকম ব্যক্তিত্ব বা কোয়ালিটি সম্পন্ন ক্রিকেটারও আমাদের ছিল না, তাই কোচ-ক্যাপ্টেন কর্তৃত্ব বা ব্যক্তিত্ব সংঘাতও সেভাবে কখনো হয়নি। কিন্তু ডে বাই ডে যখন আমাদের ক্রিকেট কালচার গ্রো আপ করছে, তখনই এই সমস্যাগুলো পরিলক্ষিত হচ্ছে।

আমার ধারণা, ২০১২-এশিয়া কাপ ছিল, আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটা টুর্নামেন্ট। চার ম্যাচে দুটো জয় দিয়ে ঠিক বোঝানো যাবে না, এই সময়টাতে কতটা ভালো ক্রিকেট খেলেছি আমরা। ব্যাটে-বলে এমন টানা ধারাবাহিকতা খুব কম সময়ই দেখা গেছে। সব প্লেয়াররাও ছিলেন চমৎকার ফর্মে। সেই সময়টাতে কোচ ছিলেন স্টুয়ার্ট ল। তাঁকে নিপাট ভদ্রলোক মনে হয়। কর্তৃত্বের ব্যাপার স্যাপারে ছিলেন না, স্বল্প সময়ে যেটুক কাজ করেছেন তাতে তিনি শুধু নিজের কাজটুকু করেছেন। অন্য কিছুতে মাথা ঘামাননি।

সারকথা কি দাঁড়াল তাহলে? এখন আমাদের মহামান্য কোচ যা করছেন, তা আসলে তাঁর ও দলের পক্ষে কোনো শুভফল বয়ে আনবে না। ক্রিকেটটা চিরকাল ছিল ক্যাপ্টেন’স গেইম, তিনি ধুম করে তা বদলাতে পারবেন না। দল নির্বাচন, ড্রেসিং রুম, মাঠ সব জায়গার কর্তৃত্ব থাকা উচিৎ ক্যাপ্টেনের হাতে। তা তিনি যতই রক্ষণাত্নক হোন। ক্যাপ্টেন রক্ষণাত্নক নাকি আক্রমণাত্নক, দল পরিচালনা করতে পারবেন কি পারবেন না, সেসব ক্যাপ্টেন সিলেকশনের পূর্ব আলোচনা। ক্যাপ্টেন্সি যখন একজনকে দেবেন, তখন তাঁকে কর্তৃত্বও দেবেন।

শত বছর ধরে চলে আসা ক্রিকেটের মৌলিক ধারণাকে এভাবে ধুমড়ে-মুচড়ে দেয়া যায় না। আমাদের টিম ম্যানেজমেন্ট, থিংক ট্যাংক, কোচ ও বিসিবি এই ব্যাপারটা নিয়ে আরো একটু ভাববেন, আশা করি। ওয়েক আপ বিসিবি! ওয়েক আপ টিম ম্যানেজমেন্ট!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।