এ কী করলেন অনিমেষ আইচ! (দেখুন সিনেমা হলে)

যারা ভয়ংকর সুন্দর দেখে বা না দেখেই সামাজিক মাধ্যমে ছবিটির নেতিবাচক সমালোচনা করছেন তাদের সিনেমাপ্রীতি, সিনেজ্ঞানবোধ নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। আমি কোনো রিভিউ লিখছিনা।মনের মধ্যে আকুপাকু করা কিছু কথা লিখছি মাত্র।

সমালোচনা দুই ধরনের – ১.গঠনমূলক আর ২.পচনমূলক!

একেবারে সাধারন দর্শক সিনেমাটা দেখে ভাল না লাগার কথা জানাতেই পারেন। কিন্তু কথা হল কিছু চলচ্চিত্র সাংবাদিক,মিডিয়াকর্মী তারা কি করে এই সিনেমাটা নিয়ে নেতিবাচক রিভিউ দেয় তা আমার-আমাদের মাথায় ঢোকে না। দর্শকদের আটকাতে পেরেছেন? দর্শক ঠিকই হলে গিয়ে টিকেট কেটে ছবি দেখেছেন, দেখছেন এবং সামনে দেখবেন।যারা নিজেকে পণ্ডিত প্রমান করতে, নিজেকে জাহির করতে ছবি সমন্ধে নেতিমূলক রিভিউ দিলেন এই উনাদের মধ্যেই কেউ কেউ প্রিমিয়ার শোতে গিয়েছিলেন কিন্তু মাগনা টিকেট পেয়ে! অবশ্য বাঙ্গালিরা যে মাগনা (বিনা দাওয়াতে) দাওয়াত খাওয়ার পরেও খিলান দিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে জায়গায় বসে তরকারির বদনাম করে সেকথাও তো সবার জানা।

যেকোন সিনেমা রিলিজের অন্তত সাত দিন কোন রিভিউ লেখা অনুচিত। সেটা হোক ‘ভয়ংকর সুন্দর’ হোক ‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা’। দুটোই বাংলা ছবি। আমাদের ছবি। কি-বোর্ড চেপে দুলাইন লিখলেই চলচ্চিত্র সমালোচক হওয়া যায় কি? অবশ্য আজকাল সমালোচনার কথা কি আর বলবো! সাকিব আল হাসান গৃহকর্মীকে পাশে বসে খাওয়ায়নি কেন?(আসলে সে মেয়েটা এক টেবিলে বসেই খেয়েছে) এ নিয়েও অসুস্থ সমালোচনা!

নাচ-গান-মারপিটে ভরপুর,কমেডি সিনেমা দেখতে আমরা অভ্যস্ত।কিন্তু এর বাইরেও পৃথিবীতে হাজারো জেনারের, ধারার ছবি হয়। বিচিত্র, ভিন্নস্বাদের গল্পের সিনেমা হয়, হচ্ছে, হবে। ছবির শেষে পুলিশের সংলাপ- ‘হ্যান্ডস আপ, আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না’, ‘মা আমি পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছি’ – ‘আজ যদি তোর বাবা বেঁচে থাকতেন’ লম্বা প্রশস্ত ফাঁকা রাস্তা থাকা সত্বেও জায়গার অভাবে নায়ক-নায়িকার ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়া, চোখাচোখি,ওড়না ঠিক করা-একই জিনিষ আর কতকাল দেখবেন?

বিচিত্র গল্পের সাথে ধীরে ধীরে দর্শকদেরতো অভ্যস্ত করতে হবে। ফর্মুলা ছবির বাইরের ছবির সাথে এখনো সাধারন দর্শক পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি।

ভয়ংকর সুন্দর তেমনি মসলাযুক্ত,কমেডি ধারার বাইরের একটি জেনারের ছবি। ছবির এ কেমন গল্প! হ্যা গাল না দিয়ে পরিচালককে বাহবা দেই এজন্য যে, ‘এরকম গল্প নিয়েও ছবি হয়!’ শুধু চান ফান-কমেডিতে ভরপুরওয়ালা সিনেমা। এরকম স্ক্রিপ্ট লেখা কি অনিমেষ আইচের জন্য খুব কঠিন ছিল? মোটেই না।ইচ্ছে করলেই দর্শকদের প্রত্যাশানুযায়ী হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হওয়া গল্প-স্ক্রিপ্ট তিনি বেছে নিতে পারতেন (তাঁর এরকম অনেক কাজ আছে) বরং সেদিকে না গিয়ে পানিকে মূল উপাদান করে চলচ্চিত্র বানিয়ে সাহসীকতার পরিচয় দিয়েছেন।

এরকম বুকেরপাটা কজন পরিচালকের আছে, শুনি? বলা হয়ে থাকে আগামীতে বিশ্বযুদ্ধ হবার অন্যতম কারণ হবে এই পানি। সারাবিশ্বে সুপেয় পানির এতটাই অভাব পড়বে। তখন হয়তো এই বাংলাতেই ‘পানি দে’ নামক চলচ্চিত্র হবে। বিখ্যাত পরিচালক আমজাদ হোসেন যেমন বানিয়ে ছিলেন ‘ভাত দে’।

তবে ভয়ংকর সুন্দরের গল্পের প্রথম অর্ধ মুলগল্পের তুলনায় ‘শুধু শুধু’ লেগেছে। পানির সংকট, দুর্দশা, ভয়াবহতা, ক্লাইমেক্স সাদামাটা।আরও জোরালো হতে পারতো। ‘আমি পড়ে থাকি’ (তাহসান-এলিটার কন্ঠে) গানটা কি না দিলে হত না? অহেতুক লেগেছে।

প্রকৃত শিল্পী তারাই যারা বর্তমান সময়ে বসে ভবিষ্যৎকে দেখতে পান। ভয়ংকর সুন্দর আগামী দশ বছর পরের ছবি। দশ বছর পরের মানে ২০২৭ সাল থেকে লোকজন রীতিমত ইউটিউবে ছবিটা খুঁজে বেড়াবে। লেখাটা বেশ বড় হয়ে যাচ্ছে। শেষ করার আগে বলি, ভয়ংকর সুন্দর হল এমন একটা ছবি যেটা দেখলে যতটুকু পস্তাবেন, না দেখলে তারচেয়ে বেশি পস্তাবেন।

আর একটা কথা। অমুকের মত, তমুকের মত ছবি না বানিয়ে নিজের মত করে ছবি বানানোর জন্য অনিমেষ দা আপনাকে স্যালুট। নিজস্বতা একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরিচয়। এজন্য আবারো স্যালুট। পরবর্তী ছবি আরও ভয়াবহ সুন্দর হোক।

ছবিটির সাথে আমি সংশ্লিষ্ট নই। অনিমেষ আইচ আমাকে ছবিটির ব্যাপারে সুন্দর কথা বলার জন্য টাকা দিয়েছেন অথবা নিজে তাঁর কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের জন্য, তাঁকে খুশি করার জন্য লিখছি এমনটা ভাবারও দরকার নেই। তাঁর কাছে চিত্রনাট্য লেখার কলাকৌশল শিখতে দু’একদিন গিয়েছিলাম। সম্পর্ক এতটুকুই। তবে এই লেখাটা লিখতে গিয়ে ঐ দুদিনের পরিচয়টাও কারন হয়ে দাঁড়ায়নি। নুরুল আলম আতিক, ফারুকী, অমিতাভ, তৌকির, অনিমেষ, সায়মন, ইমন প্রমুখ শ্রদ্ধেয় বড় ভাইয়েরা ভিন্নস্বাদের গল্প বলছেন রেডি দর্শক ছাড়াই।

নিজেরা ভাল ছবির দর্শক তৈরি করেছেন, করছেন। আগামী কয়েক বছরে ভাল ছবির দর্শক অনেক বেড়ে যাবে।আর আমরা যারা ভিন্ন সিনেমা বানানোর চেষ্টায় আছি তারা তখন অলরেডি তৈরি দর্শক পেয়ে যাব! কি সৌভাগ্য আমাদের! সেই কৃতজ্ঞতা স্বরুপ এই লেখাটা। জয়তু বাংলা ছবি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।