এ অর্জনটা পৃথিবীর আর কোনো অধিনায়কের নেই

তাকে ভাল না বাসলেও ঘৃণা করতে পারবেননা। প্রত্যেকেরই কিছু অনুসারী-সমর্থক থাকে। সাথে সাথে কিছু হেটার্সও থাকে। সে হিসেবে সেলিব্রেটি বা বিখ্যাত ব্যক্তিদেরতো ফ্যানদের সাথে সাথে হেটার্সও অভাব নেই। কিন্তু এমন একজন বিখ্যাত আছেন যাকে ভালবাসতে না পাড়লেও ঘৃণা করা যায়না। তার নাম কৌশিক – মাশরাফি বিন মুর্তজা।

বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক দলে খেলার সময় আক্রমণাত্নক এবং গতিময় বোলিং নজর কাড়ে তৎকালীন অস্থায়ী বোলিং কোচ সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফাস্ট বোলার অ্যান্ডি রবার্টসের। তাঁর পরামর্শে মাশরাফিকে বাংলাদেশ-এ দলে নেওয়া হয়।

মাশরাফি জাতীয় দলে খেলার সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যান। ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় মাশরাফির। একবার এক সাক্ষাৎকারে মাশরাফি তুলে ধরেছিলেন তার অভিষেক অনুভুতির কথা। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জাতীয় দলে প্রথম সুযোগ পাই ২০০১ সালে। কিন্তু বাংলাদেশ কী, বাংলাদেশের হয়ে খেলাটা কী, সেসব বুঝি আরও পরে। ২০০৩ বিশ্বকাপে যখন আমি বলটা প্রথম ধরি, বল করতে পারছিলাম না। কাঁদছিলাম। সেই অনুভূতি বলে বোঝানো যাবে না। বিশ্বকাপ হচ্ছে। বিশ্বকাপে আমি দেশের হয়ে বল করছি। অবিশ্বাস্য লাগছিল নিজের কাছেই। অথচ তার আগে দুই বছর জাতীয় দলে খেলেছি। আমি কিসের ভেতর আছি, সেই অনুভূতি এল দুই বছর পর! দক্ষিণ আফ্রিকায় দাঁড়িয়েও বুঝতে পারছিলাম বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে, আমার দিকে তাকিয়ে। সেই রোমাঞ্চ ভোলার নয়। উত্তেজনায় প্রথম বলটা ওয়াইডই করে বসেছিলাম বোধ হয়।’

মুগ্ধ হয়ে শোনা যায় কথাগুলো কোন ক্লান্তি ছারা। একজন দেশপ্রেমিক যেখানেই থাকুক, যেভাবেই থাকুক ভিতরে দেশের মায়া হাতড়ায় তাকে সর্বক্ষণ।

এ নেতার ক্রিকেটিয় অর্জন নিয়ে বললে অনেক কিছুই বলা যায়। রেকর্ড, স্কোর হয়তো বিভিন্ন সাইট থেকে সহজেই জেনে নেওয়া যাবে। তাই ক্রিকেটের অর্জন নিয়ে কিছু বলতে চাইনা। তার এমন একটা অর্জনের সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই যা পৃথিবীর আর কোনো অধিনায়কের নেই।

১১ বার ইনজুরিতে পরেও দলে ফিরে বাঘের মত খেলে যাওয়ার শক্তিটা কোথায় জানেন? দৈনিক প্রথম আলোর একটা সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘টেলিভিশনে বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস বা একুশে ফেব্রুয়ারির যেসব অনুষ্ঠান দেখায়, আমি সব দেখি। এগুলো তো অনেক পরে তৈরি করা জিনিস, তার পরও ওই সময়ের কথা মনে হলে আমার খারাপ লাগে। তাঁরা দেশের জন্য কী করে গেছেন আর আমরা কী করছি? তাঁদের জন্যই তো আমরা আজ অন্যের জুতা পরিষ্কার করছি না। ম্যাচ জিতলে সবাই বলে আমরা নাকি বীর। আসল বীর তো তাঁরা! বারবার ইনজুরি থেকে ফিরে আসার প্রেরণাও পাই সেসব বীর মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকেই। এমনও ম্যাচ গেছে আমি হয়তো চোটের কারণে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলাম না। দুই-তিনটা বল করেই বুঝতে পারছিলাম সমস্যা হচ্ছে। তখন তাঁদের স্মরণ করেছি। নিজেকে বলেছি, ‘হাতে-পায়ে গুলি লাগার পরও তাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন কীভাবে? তোর তো একটা মাত্র লিগামেন্ট নেই! দৌড়া…। দেশের পতাকা হাতে দেশের জন্য দৌড়ানোর গর্ব আর কিছুতেই নেই। পায়ে আরও হাজারটা অস্ত্রোপচার হোক, এই দৌড় থামাতে চাই না আমি।’

এই মানুষটার মধ্যে দেশের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মত এক শক্তিশালী ক্ষমতা আছে। এই মানুষটাকে ঠেকাবে এমন শক্তি পৃথিবীতে নেই। মাশরাফি যখন হোচট খেয়ে পড়ে, তখন বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে, কপালে ভাঁজ পরে। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রার্থনা করে তার জন্য। এইযে তার হোচট খাওয়াতে বুকের মধ্যে যে মোচড় দিয়ে উঠে-এটা তারই অর্জন।

যে মানুষটার অসুস্থতায় লক্ষ কোটি মানুষ প্রার্থনা করে তাকে ঠেকিয়ে রাখার ক্ষমতা এই পৃথিবীর কারো নাই। দেশের মাটিতে গত বছর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যচগুলোতেও যখন বার বার হোচট খেয়ে পড়ছিল আমরা যারা বাইরে খেলা দেখছিলাম তাদের ভেতর হাহাকার শুরু হয়ে গেছিল। চিন্তা হচ্ছিল খুব। এই মানুষটাকে ভালবাসি খুব। আর এই ভালবাসা পাওয়ার অর্জনটা তারই। তার সকল অর্জনের স্রেষ্ঠ অর্জন এটাই। এ অর্জনটা পৃথিবীর আর কোনো অধিনায়কের নেই।

আজ এই মানুষটার জন্মদিন। ১৯৮৩ সালের এইদিনে তিনি জন্মেছিলেন নড়াইলে। এ মানুষটার জন্য দোয়া রইলো। সৃষ্টিকর্তা তাকে সুস্থতা দান করুন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।