এশিয়া কাপের মঞ্চে আবির্ভাব

১৯৮২ সালের আইসিসি ট্রফির পর দেশের মাটিতে প্রথম কোন টুর্নামেন্ট আয়োজন করার সাফল্য অর্জন করে বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে। সাউথ ইস্ট এশিয়ান টুর্নামেন্ট নামে। এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ জাতীয় দল, হংকং, সিঙ্গাপুর এবং বিসিবি অনূর্ধ্ব-২৫ দল অংশ নেয়।

বাংলাদেশ ফাইনালে হংকংকে ৩ উইকেটে হারিয়ে প্রথম কোন আন্তর্জাতিক ট্রফি অর্জন করে। এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমেই অভিষেক হয় তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে সুদর্শন ক্রিকেটার আতহার আলী খানের। এই টুর্নামেন্টে শুরুতে মালেয়শিয়ার অংশ নেয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহুর্তে তারা না আসায় বিসিবি অনূর্ধ্ব-২৫ দলকে যোগ করা হয়। এই দলের নাম হয় বাংলাদেশ টাইগার্স।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দলের বাংলাদেশ সফরের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে থাকে বাংলাদেশ ক্রিকেট। ১৯৮৫ সালে নিউজিল্যান্ডের একটি দল বাংলাদেশ সফরে আসে। সফরে তারা দুটি লিমিটেড ওভারের ম্যাচ খেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিসিবি অনূর্ধ্ব-২৫ দলের সাথে। মার্চ মাসে শ্রীলংকা দল ঢাকায় আসে একটি তিন দিনের ম্যাচ খেলার জন্য, শ্রীলঙ্কা প্রথম ইনিংসে ৪২৯/৯ রান তুলে ইনিংস ঘোষনা করলে গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ১৩৯ রানে অল আউট হয়ে ফলো অনে পড়ে, দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাড়ায় বাংলাদেশ, ৬ উইকেটে ১৫২ রান তুলে ম্যাচ ড্র করে। প্রথমবারের মতো শ্রীলঙ্কারর সাথে ম্যাচ ড্র।

১৯৮৪-৮৫ সালের জাতীয় ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেমি ফাইনালে ঢাকা বিভাগের বিপক্ষে আতহার আলী খান (১৫৫) এবং তারিকুজ্জামান মনির (৩০৮) তৎকালীন রেকর্ড ৪৪৭ রানের জুটি গড়েন। তারিকুজ্জামান মুনিরের ৩০৮ দেশের মাটিতে প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরি। যদিও সেসময় এসব ম্যাচের প্রথম শ্রেনীর মর্যাদা না থাকায় রেকর্ড বুকে ইনিংসটা থাকবেনা।

১৯৮৫-৮৬ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ‘বেঙ্গল’ দল বাংলাদেশ সফরে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিসিবি একাদশের সাথে চারটা ম্যাচ খেলে তারা। সাউথ ইস্ট এশিয়ান টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন হবার সুবাদে ১৯৮৬ সালের এশিয়া কাপে খেলার সুযোগ পায় বাংলাদেশ।

১৯৮৬ এশিয়া কাপ

এশিয়া কাপের দ্বিতীয় আসর ছিলো এটা। ভারত অংশ না নেয়ার কারণে মাত্র তিন দলের টুর্নামেন্ট ছিলো ’৮৬ এশিয়া কাপ। ৩১ মার্চ বাংলাদেশ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে নামে পাকিস্তানের বিপক্ষে, মৌরাতোয়ার তাইরোন ফার্নান্দো স্টেডিয়ামে। বাংলাদেশ ৯৩ রানে অল আউট হয়ে ৭ উইকেটে হেরে যায়। পরের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার সাথে ১৩১ রান করে ৮ উইকেটে (মিনহাজুল আবেদীন ৪০), তবে ম্যাচ হারে ৭ উইকেটে।

১৯৮৬ আইসিসি ট্রফি

১৯৮৭ বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন নিয়ে ‘৮৬ আইসিসি ট্রফিতে অংশ নেয় বাংলাদেশ। কিন্তু গ্রুপ পর্বের ৬ ম্যাচের ৪ ম্যাচেই হেরে বিদায় নিতে হয় প্রথম পর্বেই। কেনিয়া এবং আর্জেন্টিনারা সাথে জিতলেও বাংলাদেশ হেরে যায় জিম্বাবুয়ে, ডেনমার্ক, ইস্ট আফ্রিকা এবং মালেয়শিয়ার কাছে।

১৯৮৮ সালে দ্বিতীয় সাউথ ইস্ট এশিয়ান টুর্নামেন্টের আয়োজন করে হংকং, এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের আবিষ্কার ছিলো আতহার আলি খান। গ্রুপ পর্বে হংকং এর বিপক্ষে করেন ৯২* এবং সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ৬৯*, ফাইনালে হংকং এর বিপক্ষে করেন ৬৪ রান। তিন ম্যাচেই ম্যান অব দা ম্যাচ এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন আতহার। টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ ফলে ১৯৮৮ সালের এশিয়া কাপে খেলার সুযোগ হয়, একই সাথে টুর্নামেন্টের আয়োজক হয় বাংলাদেশ।

১৯৮৮ এশিয়া কাপ

১৯৮৩ সালে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ধীরে ধীরে বড় পর্যায়ের ক্রিকেটে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়াতে এসিসির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ‘এ’ দল বাংলাদেশ সফরে আসা শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৮ সালের এশিয়া কাপ আয়োজন করা হয় বাংলাদেশে। প্রথমবারের মতো বড় কোন আসর। এই আসরেই দেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে খেলে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের দুটি ম্যাচ হয়েছিলো, বাকি সব ম্যাচ বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে আয়োজন করা হয়।

২৭, অক্টোবর ১৯৮৮ চট্টগ্রামে ঘরের মাঠে প্রথম ওয়ানডের খেলে বাংলাদেশ। এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই বাংলাদেশ হারে বাজেভাবে। আতহার আলী খান দলের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেন (১১, ২২, ৩০ তিন ম্যাচে)। এশিয়া কাপে বাংলাদেশ ভালো না করলেও মূল উদ্দেশ্য সফল ছিলো। গ্যালারী উপচে পড়া মানুষের ভীড় এসিসি, আইসিসি এবং বিসিবিকে নিশ্চিত করে দিয়েছিলো এই দেশে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ আছে। ক্রিকেটই একদিন এইদেশে রাজত্ব করবে।

ফুটবল প্রধান বাংলাদেশে এটা ছিলো বিরাট কিছু, এমনকি ’৮৮ সালের বন্যার পরেও মানুষের খেলা নিয়ে উন্মাদনা অবাক করেছিলো সবাইকে। বুঝিয়ে দিয়েছিলো প্রচন্ড প্রতিকূল অবস্থাকেও এই জাতি জয় করতে পারে ক্রিকেটকে আকড়ে ধরে। এই টুর্নামেন্টের শেষে বন্যাদূর্গত মানুষের জন্য একটা চ্যারিটি ম্যাচ আয়োজন করা হয়।

১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সফরে আসে ভারতের হায়াদ্রাবাদ ব্লুজ এবং ডেনমার্ক জাতীয় দল, তারা বিসিবি একাদশ এবং ঢাকার স্থানীয় ক্লাবগুলার সাথে একদিনের ম্যাচ খেলে।

১৯৯০ আইসিসি ট্রফি

আইসিসি ট্রফির এই আসরে বাংলাদেশ আগের বারের তুলনায় ভালো সাফল্য অর্জন করে এবং তৎকালীন সেরা সহযোগী দেশ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেমিফাইনালে হেরে যায় (জিম্বাবুয়ের তখন টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির দারপ্রান্তে দাড়ানো শক্তিশালী দল)। প্রথম রাউন্ডে বাংলাদেশের গ্রুপে ছিলো কেনিয়া, বারমুডা এবং ফিজি। কেনিয়া এবং বারমুডা তখন শক্তিশালী সহযোগী দেশ। বাংলাদেশ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ বনাম কেনিয়াঃ কেনিয়া ১৮৯/৭, বাংলাদেশ ১৯০/৭ (তিন উইকেটের জয়)

বাংলাদেশ বনাম বারমুডাঃ বাংলাদেশ ১৭৫, বারমুডা ১৩৯ (৩৬ রানে জয়ী)

বাংলাদেশ বনাম ফিজিঃ ফিজি ১৮৯, বাংলাদেশ ১৯৩/৭ (বাংলাদেশ ৩ উইকেটে জয়ী)

বাংলাদেশ দ্বিতীয় রাউন্ডে উন্নীত হয় এবং বাংলাদেশের গ্রুপে পড়ে কানাডা, ডেনমার্ক এবং নেদারল্যান্ড।

দ্বিতীয় পর্বে বাংলাদেশ নেদারল্যান্ডের সাথে ১৪১ রানে হেরে যায় (নেদারল্যান্ড ৩০৯/৭, বাংলাদেশ ১৪৮)। কিন্তু জয় পায় ডেনমার্ক এবং কানাডার সাথে। নুরুল আবেদীনের ৮৫ আর আকরাম খানের ৫০ রানে ডেনমার্কের দেয়া ২৩৪ রানের টার্গেট ছুঁয়ে ফেলে বাংলাদেশ। কানাডার সাথে আগে ব্যাট করে বাংলাদেশ নুরুল আবেদীনের ১০৫ আর ফারুক আহমেদের ৫৬ রানে ২৬৫/৬ রান করে বাংলাদের, জবাবে কানাডা ১৪৮ রানে অল আউট হয়। গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে সেমিফাইনালে উঠে বাংলাদেশ।

সেমি ফাইনালে ডেভ হটনের ৯১* রানে জিম্বাবুয়ে ২৩১/৭ সংগ্রহ করে, জবাবে বাংলাদেশ অল আউট হয় ১৪৭ রানে (মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ৫৭)। জিম্বাবুয়ে পরে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ১৯৯২ বিশ্বকাপে খেলে এবং ওই বছরেই টেস্ট স্ট্যাটাস পায়।

অস্ট্রালশিয়া কাপ

১৯৮৬-১৯৯৪ পর্যন্ত শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আয়োজন করা হতো অস্ট্রালশিয়া কাপ। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা এক গ্রুপে, অন্য গ্রুপে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং একটি সহযোগী দেশ। ১৯৯০ সালের দ্বিতীয় আসরে মর্যাদাপূর্ন এই আসরে খেলার আমন্ত্রন পায় বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের সাথে স্বাভাবিকভাবেই বড় ব্যবধানে হারে বাংলাদেশ।

প্রথম ম্যাচ

নিউজিল্যান্ডঃ ৩৩৮/৪ (মার্টিন ক্রো ৬৯, জন রাইট ৯৩)

বাংলাদেশঃ ১৭৭/৫ (আজহার ৫৪, আকরাম ৩৩)

এই ম্যাচে বাংলাদেশকে অল আউট করতে না পারায় নিউজিল্যান্ডের বোলিং নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয় কিউই মিডিয়ায়।

দ্বিতীয় ম্যাচ

বাংলাদেশঃ ১৩৪/৮ (আমিনুল ইসলাম বুলবুল ৪১*)

অস্ট্রেলিয়াঃ ১৪০/৩ (নান্নু ৪৩/২)

এশিয়া কাপের বাইরে এটাই ছিলো বাংলাদেশের সর্বোচ্চ টুর্নামেন্ট। দুই ম্যাচে হারলেও আকরাম, বুলবুল, আজহারের ব্যাটিং প্রশংসা পায় মিডিয়ায়। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের আগমনে দুটি ম্যাচেই মাঠে বাংলাদেশের প্রচুর সাপোর্টার ছিলো। সেটাও মিডিয়াতে আলোচিত হয়। অর্থাৎ বড় টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহনের একটা ভিত্তি তৈরী হয়।

১৯৯০-৯১ এশিয়া কাপ

১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতে বসে এই আয়োজন। অংশ নেয় এশিয়ার দুই টেস্ট খেলুড়ে দেশ এবং বাংলাদেশ। পাকিস্তান অংশ নেয়নি। গ্রুপ পর্বের দুই ম্যাচেই বাংলাদেশ পরাজিত হয়।

স্কোর

প্রথম ম্যাচঃ বাংলাদেশ বনাম ভারত

বাংলাদেশঃ ১৭০/৬ (ফারুক আহমেদ ৫৭, আতহার ৪৪)

ভারতঃ ১৭১/১ (নভজিৎ সিং সিধু ১০৪*)

দ্বিতীয় ম্যাচঃ বাংলাদেশ বনাম শ্রীলংকা

শ্রীলংকাঃ ২৪৯/৪ (অরবিন্দ ডি সিলভা ৮৯)

বাংলাদেশঃ ১৭৮/৯ (আতহার ৭৮)

এই ম্যাচে বাংলাদেশের আতহার আলি খান ৭৮ রানের স্ট্রোক ঝলমলে এক ইনিংস খেলেন ৯৫ বলে। ইডেন গার্ডেনের গ্যালারী ভরা দর্শকের সামনে তিনটা বিশাল ছক্কা মারেন আতহার। দূর্দান্ত এই ইনিংসের কারনে প্রথম বাংলাদেশী প্লেয়ার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যান অব দা ম্যাচের পুরস্কার লাভ করেন আতহার আলী খান।

১৯৯১ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ দল চারদিনের ম্যাচ খেলার জন্য বাংলাদেশে আসে। এই সফরেই সৌরভ গাঙ্গুলী প্রথমবার ঢাকা সফর করেন। ১৯৯০ সালের পর থেকেই ধীরে ধীরে ফুটবলকে ছাপিয়ে ক্রিকেট দেশে প্রধান জনপ্রিয় খেলা হিসেবে ছড়িয়ে পড়া শুরু করে। ঢাকাসহ সারা দেশেই স্থানীয় পর্যায়ে ক্রিকেট খেলার প্রসার ঘটতে থাকে।

এই সময়ই বাংলাদেশে ক্রিকেট বড় আকারে রাষ্ট্রীয় সহযোগীতা পেতে শুরু করে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আনা হয় দীর্ঘমেয়াদে ‘হাই-প্রোফাইল’ কোচ – মহীন্দর অমরনাথ।

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।