এত প্রেমও তাকে সুখী রাখতে পারেনি

বলিউড সিনেমার শতবর্ষের ইতিহাসে সেরা সুন্দরীর কথা বললে যার নামটি সর্বাগ্রে আসে— তিনি হচ্ছেন মধুবালা। নার্গিস, মীনা কুমারীদের যুগেও যিনি স্বীয় অভিনয় প্রতিভা ও রূপের যাদুতে মাতিয়ে রাখতেন গোটা বোম্বে সিনে-পাড়া। স্বল্প সময়ের ক্যারিয়ারে যশ ও খ্যাতির চুড়ান্ত শীর্ষে আরোহণ করলেও ব্যক্তিগত জীবনে পিছু ছাড়েনি নিষ্ঠুর নিয়তি। তার জীবন-কাহিনী ট্র্যাজিক সিনেমার গল্পকেও যেনো হার মানায়!

ভারতীয় সিনেমার এই কিংবদন্তির বেড়ে ওঠা দিল্লীর এক দরিদ্র ও রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে। বাবা আতাউল্লাহ খান মেয়েকে পুরুষদের সাথে খুব একটা মিশতে দিতেন না। তারপরও এই অভিনেত্রীর বিভিন্ন সহশিল্পী, পরিচালক, প্রযোজকদের সঙ্গে ছয়টিরও বেশি রিলেশনের কথা জানা যায়। সদ্য তরুণী মধুবালা তার প্রতি সহশিল্পী ও পরিচালকদের মুগ্ধতা ও ভালোবাসা বেশ উপভোগও করতেন। কিন্তু সবগুলো রিলেশনই কোনো না কোনোভাবে খারাপ অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে সমাপ্ত হয়েছে। এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ঠিক এ রকমই চলতে থাকে। চলুন, এই লাস্যময়ী অভিনেত্রীর প্রেমোপাখ্যান নিয়ে কিছুটা ঘাটাঘাটি করা যাক।

কিশোরী মধুবালা প্রথমে তার প্রতিবেশি লতিফ নামের এক আইএএস অফিসারের প্রেমে পড়েন। এরপর একটি লাল গোলাপ-সহ সরাসরি ওই অফিসারকে প্রপোজ করে বসেন ইন্ডিয়ান সিনেমার এই নায়িকা! লতিফও প্রস্তাবটি ফেরাতে পারেনি। কিন্তু মধুবালা কিছুদিন যেতেই রিলেশন ভেঙ্গে দেন।

তবে, মধুবালার দেওয়া গোলাপটি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে লতিফ তার বইয়ের পাতায় গুঁজে রেখেছিলেন। জানা যায়, পরে এই শুকনো গোলাপটি সে মধুবালার সমাধিতে রেখেছিলো, এবং মধুবালার প্রতিটি মৃত্যুবার্ষিকীতে সে সমাধিতে যেতো। তার জীবনের বাকি অংশে সে সত্যিই মধুবালার প্রেমে ডুবে ছিলেন।

মাত্র নয় বছর বয়সে শিশু শিল্পী হিসেবে মধুবালা ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেও প্রথম প্রধান অভিনেত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন কিদার শর্মার একটি ছবিতে। স্ক্রিন টেস্টের সময় এই পরিচালক নাকি মধুবালার রুপে বিমোহিত হয়ে পড়ছিলেন। ইনিয়ে বিনিয়ে ভালোবাসার কথা বললেও এই নায়িকা কখনো বোঝার চেষ্টা করেনি। এটা ছিলো একপাক্ষিক ভালোবাসা। মধুবালা যখন প্রকাশ্যে বললেন, কিদার শর্মা তাঁর গুরু, তাঁকে তিনি গুরুর মতো শ্রদ্ধা করেন। তখন পরিচালক বুঝলেন, মধুবালার ভালবাসা তিনি কখনোই পাবেন না।

১৯৪৯ সালে রিলিজ হওয়া মধুবালার ‘মহল’ সিনেমাটি বক্স অফিসে বেশ সাফল্য পায়। বলা যায়, এই সিনেমাটিই ছিলো তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। এবং এই সিনেমার সাফল্যেই তিনি রাতারাতি তারকা বনে যান। কমল আমরোহি ও মধুবালার দেখা হয় এই ‘মহল’ সিনেমার সেটেই। মধুবালার লোভী বাবা চাইতেন কমলের সাথে যেনো তার মেয়ে মিশে, এবং তারা বিয়ে করে সংসার করেন। কিন্তু কমল ছিলেন বিবাহিত।

প্রকৃতপক্ষে কমলকে মধুবালা কখনোই ভালবাসেননি। তারপরও বাবার ইচ্ছে রাখতে গিয়ে তিনি শর্ত দেন, কমল তাকে বিয়ে করতে চাইলে আগে বর্তমান স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে হবে। কিন্তু কমল তা করতে রাজী হননি, ফলে যা হবার তাই হলো।

মধুবালার রুপের মোহ থেকে বাদ যাননি পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টোও! শোনা যায়, তিনি প্রায়শই ‘মোগল ই আজম’-এর সেটে ঢুঁ মারতেন শুধুমাত্র মধুবালাকে এক নজর দেখার জন্য। মধুবালাও তাকে কিছুটা পছন্দ করতে শুরু করলেন, কিন্তু এই নায়িকার সাথে থিতু হবার মতো অবস্থা ভুট্টোর ছিলো না। যেহেতু তখন তার দুইটি স্ত্রী বর্তমান ছিলো।

পঞ্চাশের দশকে হিন্দি সিনেমার মহানায়ক দিলীপ কুমার ও মধুবালা জুটির অমর প্রেম কাহিনী আজও লোক মুখে ফেরে। ‘তারানা’ ছবির শুটিং সেটেই মূলত একে অপরের প্রেমে পড়ে তারা। ওই সময়ের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত এই অভিনেত্রী অনেকের সাথে সম্পর্কে জড়ালেও সত্যিকারভাবে মন কিন্তু দিলীপকেই দিয়েছিলেন। এক সময় তারা গাঁটছড়া বাঁধার চুড়ান্ত পরিকল্পনা করলেও বাবা আতাউল্লাহ খানের কারণে শেষ পর্যন্ত আর হয়ে ওঠেনি।

এমনিতে পেশাগত ও পারিবারিক জটিলতায় আগে থেকেই আতাউল্লাহ খান ও দিলীপ কুমারের মধ্যে একটি বৈরী সম্পর্ক শুরু হয়। এর মধ্যে ‘নয়া দৌড়’ সিনেমা নিয়ে একটা বড় ধরণের লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যায়। দিলীপ কুমারের বিপরীতে এ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ভূপালে যেতে হবে মধুবালাকে। কিন্তু বাবা আতাউল্লাহ মধুকে ভূপাল যাওয়ার অনুমতি দেননি।

এদিকে প্রযোজক বি আর শর্মা বেশ বিপাকে পড়ায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। অভিনেতা হিসেবে আদালতে আতাউল্লাহ খানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন দিলীপ কুমার। বিষয়টি বাবাভক্ত মধুবালাকে ভীষণভাবে আঘাত করে। যাই হোক, সবশেষে দিলীপ কুমার মধুবালাকে বিয়ে করার জন্য দুটি শর্ত দিয়েছিলেন। প্রথমত, তাকে পরিবার ছাড়তে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিনয় ছাড়তে হবে। মধুবালা অভিনয় ছাড়তে রাজী হলেও পরিবার ছাড়ার কথা ভাবতে পারেননি। পাহাড় সমান অভিমান বুকে চেপে সম্পর্ক ভেঙে দেন মধুবালা।

‘বদল’ সিনেমার শুটিং সেটে প্রেমনাথ মধুবালার প্রেমে হাবুডুবু খেতে লাগলেন। তিনিও একটি লাল গোলাপ সমেত মধুবালাকে প্রপোজ করেন, মধুবালাও হ্যাঁ বলে দেন। কিন্তু কিছুদিন পর এই নায়িকা প্রেমনাথকে আস্তে আস্তে এড়িয়ে যেতে শুরু করলেন, তার মন তখনও দিলিপ কুমারে পড়েছিলো। এই সম্পর্কও বেশিদিন টিকেনি।

শুধুমাত্র দিলীপ কুমারকে ভুলে থাকতে এবং অনেকটা জেদের বশেই মধুবালা আচমকা বিয়ে করেন গায়ক ও অভিনেতা কিশোর কুমারকে। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রণায় তাদের দাম্পত্য জীবন মোটেও সুখকর ছিলো না। কিশোরকুমারকেবিয়ের করলেও মধুবালা আশা করতেন একদিন হয়তো দিলীপ কুমার ফিরে আসবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

জানা যায়, জন্মগতভাবে মধুবালার হৃৎপিণ্ডে একটি ছিদ্র ছিল। তিনি আগে থেকেই নিজের এ অসুখ সম্পর্কে জানতেন। কিন্তু কাজ না পাওয়ার ভয়ে তার বাবা এটি প্রকাশ করতে বারণ করেন। পরবর্তীতে এটি বড় আকার ধারণ করে।

অসুখের কথা জানার পর মধুবালাকে লন্ডনে নিয়ে যান কিশোর কুমার। চিকিৎসকরা জানান, তিনি সর্বোচ্চ দু-এক বছর বাঁচবেন। কারণ, ততোদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। যাই হোক, দুঃসহ যন্ত্রণা আর দিলীপ কুমারকে বুকে নিয়ে তিনি আরও নয়টি বছর বেঁচেছিলেন। এরপর ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৩৬ বছর বয়সেঅনেকটা দুঃখ, কষ্ট ও ক্ষোভ নিয়ে মহাজগতে পাড়ি জমান রুপালী পর্দার এই মহারাণী।

– লাফিং কালার্স অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।