এক খিলি পান || ছোটগল্প

কোহিনূর বেগম। মনকাড়া চেহারা। বয়স পঁয়তাল্লিশ হবে। শরীরের শক্ত বাঁধুনিতে দাদি হওয়ার বয়স যেন হার মেনেছে। ওর স্বামী ইয়াকুব আলি। সে একজন কাঠ মিস্ত্রি। তাই লোকে তাকে ইয়াকুব মিস্ত্রি বলেই ডাকে।

খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে যে এত প্রেম থাকতে পারে তা কোহিনূর বেগম আর ইয়াকুব মিস্ত্রীকে না দেখলে ঠাওর করা সম্ভব নয়।

সংসারে অভাব-অভিযোগ থাকলেও ইয়াকুব মিস্ত্রী তার স্ত্রীকে অন্যের বাসায় কাজ করতে দিতে নারাজ। কেবল ডাক্তার সাহেবের বাসায় যখন করে তাদের বান্দা কাজের সহায়তাকারী ছুটিতে বাড়ি যায় তখন সে তাদের রাঁধা-বারা করে দিয়ে বাড়ি চলে যায়।

ডাক্তার সাহেবের মা হাফিজা খাতুন আশি বছরের বৃদ্ধা নারী। কিন্তু এই বয়সেও তার সমস্ত সংসার নখ দর্পণে।পান থেকে চুন খসলেও তাঁকে আড়াল করা দায়।

হাফিজা খাতুনের বিশাল বাড়ি। বাড়িটি এতদিন তাঁর সন্তানাদিতে মুখোরিত ছিল। এখন সময়ের কবলে বাড়িটি শান্ত নির্জিব। এতবড় বাড়িতে তিনি এখন শুধু তাঁর ডাক্তার পুত্রকে নিয়ে থাকেন। বাড়ির বাকি সদস্য সবাই ঢাকায় বসবাস করে।ঢাকা থেকে যখন করে তাঁর নাতি- নাতনী, কন্যা-জামাতা আসে তখন তিনি ব্যস্তসমস্ত হয়ে পরেন।

হাফিজা খাতুনের সহায়তাকারী মন্নুজান আবার ছুটি নিয়ে বাড়ি গেছে। কোহিনূর বেগম যথাসময়ে কাজে যোগ দিয়েছে।তাই ইয়াকুব মিস্ত্রীর প্রাণ ওষ্টাগত।

প্রতিদিন একবার করে তার ডাক্তার সাহেবের বাড়ি আসা চাই। স্ত্রী কোহিনূরকে এক নজর দেখা আরকি।

ঠিক দুপুরে সে মুল ফটকে এসে দু’বার কাশি দিয়ে জানান দিবে সে এসেছে। আর শোনামাত্র এদিকে কোহিনূর উনুনের আঁচ কমিয়ে দিয়ে একরকম শাড়ির আঁচল উড়িয়ে স্বামীর কাছে দৌড়ে যায়। দাঁড়িয়ে দু’জন কিছুক্ষণ গল্প করে।

– ‘কে রে কোহিনূর?’ হাফিজা খাতুন বুঝতে পেরেও জিজ্ঞেস করে। কাজের সময় অযথা গল্প কেন।

– ‘মিস্ত্রী।’ কোহিনূর ইতস্তত করে বলে।

হাফিজা বেগম নিজের মনে বিড়বিড় করতে থাকে – কাজের সময় যত ঢং।

ইয়াকুব মিস্ত্রী দোকান থেকে কিনে আনা এক খিলি সাজানো পান কোহিনূরের হাতে তুলে দিয়ে চলে যায়।কোহিনূর পানের খিলি মুখে পুরে মুখ টিপে হেসে রান্না করতে বসে।

– ‘পান কোথায় পেলি?’ হাফিজা খাতুন জেনেও প্রশ্ন করে।

– ‘মিস্ত্রী দেইল।’ কোহিনূর মাথা নিচু করে হাসে।

– ‘এত প্রেম!’ হাফিজা বেগম আবার বিড়বিড় করতে থাকে – কাজের সময় যত বাহানা।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে আসা হাফিজা খাতুন তার যৌবনের চাওয়া-পাওয়ার কথা ভুলে গেছেন। তিনি সংসারের কাজ ছাড়া আর কিছু বুঝেন না।

হাফিজা খাতুন আবার কোহিনূরকে বেশ ভালবাসেন। আজ বাড়িতে পোলাও-মাংস রান্না হবে। হাফিজা খাতুন কোহিনূরের ছেলের বউ আর তার একমাত্র মেয়েকে নিমন্ত্রণ করেছেন।

আর আসবে তাঁর বড় মেয়ে, বড় মেয়ের নাতি।

এদিকে আবার ঢাকা থেকে এসেছে তাঁর সেজ কন্যা, সেজ কন্যার একমাত্র পুত্র। বেশ ভালই আয়োজন।

কোহিনূর তার মেয়ে আর পুত্র বঁধুকে নিয়ে রান্নাঘরে মহা ব্যস্তসমস্ত। এমন সময় মূল ফটকে দু’বার কাশির আওয়াজ। কোহিনূর লজ্জা পেয়ে না শোনার ভান করে। আবার সেই কাঙ্খিত আওয়াজ! কোহিনূর একরকম কাউকে বুঝতে না দিয়ে স্বামীর কাছে যায়।

– ‘কি কইবেন কন। আইজ বাড়িত সাগাই জেয়াপত খাইবে। মোর সময় নাই।’

– ‘কি আর কইম। তোকে দেখির আনু।’

– ‘বাড়িত দ্যাখেন আলা।ভাত খাইছেন?’

– ‘খাছু তো।সেই বাদে তো তোর বাদেন এক খিলি পান ধরি আসনু।’

– ‘কে রে কোহিনূর?’ হাফিজা খাতুন টেনে টেনে বলেন।তাঁর চোখ-কান সর্বক্ষণ সজাগ।

– ‘কাহো নোহায় নানী।’ বলে কোহিনূর পানের খিলি মুখে পুরে মুখ টিপে হাসি আড়াল করে রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পরে।

এক খিলি পানই যেন তাদের জীবনে স্বর্গ থেকে নেমে আসে ভালবাসার সুধা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।