এক কাপ কেকা কথন

টেলিভিশনের পর্দায় তিনি হরহামেশাই বলেন, এক চিমটি লবন, তার সাথে এক কাপ পেয়াজ কুঁচি। তিনি আর কেউ নন, বহুল আলোচিত রন্ধন শিল্পী কেকা ফেরদৌসী। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশী এই রন্ধনশিল্পীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা এবং ক্ষেত্রবিশেষে ব্যঙ্গবিদ্রুপও চলছে ব্যাপক হারে। পাঠকদের সামনে তাই তুলে ধরা হলো তারকা রন্ধনশিল্পী কেকা ফেরদৌসীর নানা দিক।

তার সম্পর্কে খুব মজার এবং বেশিরভাগ লোকের কাছে অজানা একটি তথ্য দিয়েই শুরু করা যাক এই কেকা কথনের। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে টেলিভিশনে রান্নার অনুষ্ঠান করছেন তিনি। রন্ধনশিল্পী হিসেবেই লোকে তাকে চেনে। অথচ কজনই বা জানেন, ছোট পর্দার আগেই বড় পর্দায় অভিষেক হয়েছিল কেকা ফেরদৌসীর। হ্যাঁ ঠিক তাই।

কেকা ফেরদৌসীর বাবা ফজলুল হক ছিলেন একজন স্বনামধন্য চলচিত্র পরিচালক। তারই পরিচালনায় নির্মিত হয় এদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচিত্র ‘প্রেসিডেন্ট’। আর এই চলচিত্রে প্রধান দুটি চরিত্রের একটিতে অভিনয় করেছিলেন শিশুশিল্পী কেকা। পারিবারিকভাবে কেকার পরিবার শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে ঘণিষ্ঠভাবে জাড়িত। কেকা ফেরদৌসীর মা বাংলাদেশর অন্যতম প্রধান নারী ঔপন্যাসিক রাবেয়া খাতুন।

কেকা ফেরদৌসী সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গ্র্যাজুয়েট। তিনি ভূগোল বিভাগে পড়াশোনা করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে স্বপ্ন দেখতেন নগর পরিকল্পনাবিদ হওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্নে ছেদ পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থাতেই বিয়ে হয়ে যাওয়ায়। নগর গড়তে না পারেন রান্নার জগতে তিনি বিশাল এক সাম্রাজ্য বানিয়েছেন তা বলাই যায়। জনপ্রিয় অনেক রেসিপি এবং রান্নার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি পেয়েছেন বিপুল দর্শকপরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা।

বাংলার আর দশটা মেয়ের মতোই তারও রান্নার হাতেখড়ি মায়ের কাছেই। কেকার রান্না পছন্দ করতেন তার বাবা এবং ভাই-বোনেরা। আর ভাই বোনদের মজার মজার খাবার তৈরি করে খাওয়ানোর ব্যাপারে তার ঝোক ছিল একেবারে ছোটবেলা থেকেই। মেয়ের রান্নার প্রতি ঝোঁক আছে বুঝতে পেরে সংস্কৃতিমনা বাবা ফজলুল হক মেয়েকে ঢাকার একটি রান্নার স্কুলে ভর্তি করে দেন। সেখানে বেশ কিছুদিন রান্না শেখেন কেকা ফেরদৌসী। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় ১৯৮০ সালে বিয়ে হয়ে যায় মুকিত মজুমদার বাবুর সঙ্গে। স্বামীর সঙ্গে পাড়ি জমান আমেরিকায়। সেখানে গিয়েও ভোলেন নি বাঙালির মসলার স্বাদ।

আর তাই আমেরিকানদের বার্গারের স্বাদ বাড়ানোর চেষ্টায় তৈরি করলেন স্পাইসি বার্গার। বিদেশি বন্ধুরাও খেয়ে প্রশংসা করলো। আজকের দিনে বাংলাদেশে বার্গার নিয়ে যে নানারকম এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে, নতুন নতুন বার্গার ভোজনরসিকদের তৃপ্ত করছে, তার পথিকৃত কিন্তু কেকা আপার তৈরি এই স্পাইসি বার্গারই। বাংলাদেশে বার্গারপ্রেমিদের এই তথ্যটা জানা জরুরী।

আমেরিকাতেই তিনি লক্ষ্য করলেন রান্না নিয়েও টেলিভিশনে নানা রকম অনুষ্ঠান হচ্ছে। রাঁধুনীরা পাচ্ছেন বড় বড় তারকার মত সম্মান। ভাবলেন নিজের দেশে নিজের ভাষাতে এরকম একটা অনুষ্ঠান তৈরি করতে পারলে ভালো হয়। বাংলা ভাষায় দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেলে রান্নার অনুষ্ঠানের ভাবনা থেকেই ১৯৮৪ সাল থেকে বিভিন্ন ধরনের রান্না নিয়ে খোঁজখবর করা শুরু করলেন। তবে টেলিভিশনে প্রথম রান্নার অনুষ্ঠানটি করেন ১৯৯৪ সালে, তখন দেশের একমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভিতে।

রান্নার অনুষ্ঠান করে দেশে বিদেশে অনেক পুরস্কারও জিতেছেন কেকা ফেরদৌসী। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ২০১০ সালে ফ্রান্সে প্যারিস কুক বুক ফেয়ারে টিভি সেলিব্রিটি শেফ-রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড ক্যাটাগরিতে গরম্যান্ড কুক বুক অ্যাওয়ার্ডস। ‘স্বাস্থ্য সচেতন রান্না’এই বইয়ের জন্য তাকে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। ১৫৭টি দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লড়ে এই অ্যাওয়ার্ড জিতেছে বাংলা ভাষায় লেখা কেকা ফেরদৌসীর বইটি।

এছাড়াও যুক্তরাজ্য থেকে তিনি পেয়েছেন ব্রিটিশ কারি অ্যাওয়ার্ড। এর পাশাপাশি তিনি জিতেছেন বেস্ট টিভি সেলিব্রেটি শেফ-রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাওয়ার্ড। বিশিষ্ট এই এই রন্ধনশিল্পী ভালোবাসেন ভ্রমণ করতে। তিনি ৩০ টি দেশ ভ্রমণ করেছেন।

রান্না বিষয়ক তার ১৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বইগুলো হচ্ছে, ডায়াবেটিসের মজাদার রান্না, মাইক্রোওয়েভ ওভেনে রান্না, স্বাস্থ্য সচেতন রান্না, দেশ বিদেশের রান্না, ঝটপট রান্না, হারানো দিনের রান্না, থাই চাইনীজ ও ভারতীয় রান্না, মজাদার রান্না, ঝটপট আচার এবং রকমারি নাস্তা ইত্যাদি। প্রতি বছর বিভিন্ন উৎসবে পত্রপত্রিকায় ও ম্যাগাজিনে তার রেসিপি প্রকাশিত হয়। এমন কি মোবাইলে ১৬২৫১ ডায়াল করে দর্শকরা শুনতে পারেন কেকা ফেরদৌসীর রেসিপি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।