একালের ফেলুদা, আমাদের ফেলুদা

উপেন্দ্রকিশোর রায়, সুকুমার রায় কিংবা বাবা সত্যজিৎ রায়ের মত প্রতিভাধর তিনি কোনো কালেই ছিলেন না। কিন্তু, ফেলুদা সিরিজ কিংবা ফেলুদা সিনেমায় বরাবরই সন্দীপ রায়কে উৎরে দিতেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। তারপরও খটকা লাগতো – একবিংশ শতাব্দীতে এসেও ফেলুদা ‘আধুনিক’ হতে পারলো না।

প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বালাই নেই। গুগল নেই, মোবাইল ফোনের ব্যবহার নেই। সেকালের পটভূমিতে আর কতদিন! দর্শক যখন শার্লক সিরিজের মাধ্যম গোয়েন্দা গল্পে প্রযুক্তির চূড়ান্ত ব্যবহার দেখে ফেলেছে তখন বাঙালির ‘শার্লক’ ফেলুদার অস্তিত্ব টিকে থাকা নিয়েই তৈরি হয়েছিল সংকট।

সেই সংকটে স্বস্তির সুবাতাস বয়ে দিলো যেন বাংলাদেশের ক্যান্ডি প্রোডাকশন ও টম ক্রিয়েশন্সের টেলিভিশন সিরিজ। প্রথম সিজনে থাকছে চারটি গল্প- শেয়াল দেবতা রহস্য, ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা, গোলকধাম রহস্য এবং গ্যাংটকে গণ্ডগোল।

ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করেছেন কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় এবং তোপসে চরিত্রে আছেন রিদ্ধি সেন। চ্যানেল আই ও বায়োস্কোপের কল্যানে এরই মধ্যে সবাই দেখে ফেলেছেন ‘একালের ফেলুদা’।

তো কেমন হল এই সময়ের ফেলুদা? কেমন করলেন পরমব্রত? জবাবে বলা উচিৎ – এই সময়ের প্রেক্ষাপটে মানানসই হয়েছে নির্মান, ‘সাবেক তোপশে’ পরমব্রত ছিলেন স্মার্ট। এই ফেলুদার আছে গুগল, হাই এন্ডের অ্যান্ড্রয়েড ফোন। অ্যাপেলের ল্যাপটপে ভাইবারে চ্যাট করে। হোয়াটসঅ্যাপে শিধু জ্যাঠার সাথে কথা বলে।

ফেলুদার ‘সহকারী’ও আধুনিক। ফেসবুক লাইভে বিস্তর সময় দেন। সারাদিন থাকেন ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’র ফেসবুক পেজ নিয়ে। এই ফেলুদা, এই তোপশে সব মিলিয়ে আরো বেশি আপন করে নেওয়া যায়।

আপন করে নেওয়ার আরো অনেক রসদও আছে। ফেলুদা পরমব্রত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার দেওয়াল ধরে হাঁটে, স্টার কাবাবে গিয়ে কাচ্চি খায়, শাহবাগে গিয়ে স্মৃতিকাতর হয়, ধানমন্ডি লেকের রাস্তা ধরে গাড়িতে করে ছোটে, মহাখালী-বনানীতে মোটর-বাইকে করে ভিলেনকে তাড়া করে, লাইব্রেরি গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ খুঁজে পায়। ঠিক আমাদের মতই বিয়ের জন্য ফেলুদাকেও তাগাদা শুনতে হয়।

হ্যা, নিসন্দেহে মোবাইলে বা হোয়াটসঅ্যাপের আলাপচারিতা, ফেলুদার মন কি ভাবছে সেটা পর্দায় দেখিয়ে দেওয়া – এমন বিষয়গুলো শার্লক সিরিজ থেকে অনুকরণ করা। কিন্তু, অনুকরণ থেকে যদি ভাল কিছু হয় তাহলে সেটা গ্রহণ করাই শ্রেয়।

পরিবর্তন এসেছে আবহ সঙ্গীতেও। সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ফেলুদা থিমের আদলে বনানো হয়েছে রক মিউজিক। ঠিক এ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিষয়গুলো মানানসই করে তোলা হয়েছে।

আধুনিকতা বা প্রেক্ষাপটের তাগিদে মূল গল্পের বেশ কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয়েছে। তবে, তাতে গল্পের মূল থিমে কোনো প্রভাব পড়েনি। একেবারে শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল টানটান উত্তেজনা।

সব মিলিয়ে একালের ফেলুদাকে ‘জিপিএ ফাইভ’ দিতেই হয়। শুধু একটা ব্যাপার, বাংলাদেশে সিঙারাকে সমুচা বলে না পরমবাবু!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।