একটু কম কম বার্গার খাবেন! আপনার পাশে বসতে কষ্ট হয়!

আজ কি হরতাল নাকি? রাত বাজে ৯টা। এখনি রাস্তা-ঘাট কেমন ভুতুড়ে হয়ে আছে। মানুষ-জনও কম, বাস-গাড়ি তো আরো কম!

আধা ঘন্টা ধরে কলাবাগান বাস-স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। একটু দূরেই একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে। আসার পর থেকেই বার বার আড়চোখে তাকিয়ে আমাকে দেখেছে।যেন জীবনে মেয়েমানুষ দেখেনি!

অল্প অল্প শীত পড়ছে। এলো-মেলো বাতাসের কারণে যার অনুভূতিটা বেশ জোরালো হয়েছে। খানিক দূরেই একটু কোলাহল মত শোনা গেল। ৪-৫জন ছেলের একট দল। অকারণেই উচ্চস্বরে হাসছে আর চিৎকার করে কথা বলছে। তারা যে ঠিক স্বাভাবিক অবস্থায় নেই বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না। ছেলেদের দলটাও বাস স্টপেজে এসেই জুটলো। ভাব-সাব সুবিধার মনে হচ্ছে না!

ছেলেদের দলটা ঠিক আমার কাছে এসেই থামলো। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। ছেলেগুলোর আগ্রহ যে আমার দিকে ভালভাবেই ঝুকেছে তা বেশ বুঝতে পারলাম।

এমন সময় সময় একটা বাস এসে থামলো। হতাশ হয়ে দেখলাম মিরপুর দশের বাস। এগুলো মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে যায়, কল্যানপুর যায় না! লোকটাকে প্রথমে বেশ উৎসাহী মনে হলো। কিন্ত শেষ পর্যন্ত সে বাসটাতে উঠলো না! কি জানি কই যাবে সে! ভালই হলো। ছেলেগুলোর দলটাকে দেখলাম রাস্তার পাশে ফুটপাথেই বসে পড়েছে। মতলব কি এদের?

হঠাৎ আম্মার ফোন, ‘হ্যালো, মা!’

‘এই তো আসতেছি বাসায়।’

‘তুমি টেনশন করো না!’

‘হ্যা, হ্যা চলে আসতেছি!’

এমন সময় আরো একটা বাস আসলো। এটাও মিরপুর লিংক! মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। বিপদ যখন আসে, সবদিক দিয়েই আসে! ব্যাগে এক্সট্রা টাকাও নেই যে রিক্সা নিয়ে চলে যাব!

ঠিক তখনি আরেকটা বাস আসলো, সাভার রুটের। এটাতে কল্যাণপুর নামা যাবে। কিন্তু পুরো বাসে তিল ধারণের জায়গা নেই। ছটফট করে উঠে হাত নেড়ে বাসটা থামানোর বৃথা চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না।

এমন সময় লোকটিকে দেখলাম আমার দিকে এগিয়ে আসছে!

‘আপনার কাছে কি পাওয়ার ব্যাংক হবে?’

অবাক হয়ে বললাম, ‘মানে?’

‘আসলে চার্জ ফুরিয়ে ফোনটা বন্ধ হয়ে আছে!’

– না, হবে না! আপনার কি ধারণা ঢাকা শহরের সব মানুষ ব্যাগে পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে ঘোরে?

‘স্যরি স্যরি! আই এম একক্সট্রিমলি স্যরি!’

সোডিয়ামের ঝাপসা হলুদ আলোতেও বোঝা গেল লোকটি বেশ লজ্জা পেয়েছে! ধুর! এতোটা কড়া ভাষায় না বললেও হতো!

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ! কিছুটা ইতস্তত করে লোকটা বললো, ‘কই যাবেন আপনি?’

– কল্যানপুর! আপনি?

‘আমি আসলে গাবতলীর দিকে যাব!’

ও আচ্ছা!

এমন সময় একটা রিক্সা আসলো। এই গাবতলী ১০০, গাবতলী ১০০চিৎকার করতে করতে! ইশ! ব্যাগে যদি টাকা থাকতো!

কেমন যেন অনিচ্ছা নিয়ে লোকটা রিক্সাটাকে থামালো! এখন নিশ্চয়ই আমাকে বলবে কল্যাণপুর নামিয়ে দেবে কি না!

ও মা! কিছু না বলেই দেখি রিক্সায় উঠে পড়েছে! একবার মাথা ঘুরিয়ে ছেলেগুলোর দিকে তাকালাম! পরক্ষণেই রওনা হতে থাকা রিক্সার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘শুনুন!’

-জ্বি

‘আমার কাছে না পাওয়ার ব্যাংক আছে!’

বেশ কষ্ট করে হাসি আড়াল করে লোকটা বললো, ‘আমি নামবো? নাকি আপনি আসবেন? কল্যাণপুর যেতে যেতে বেশ খানিকটা চার্জ দেয়া যাবে!’

আমিও নির্লজ্জের মত রিক্সায় উঠে পড়লাম! যা থাকে কপালে! সাথে সাথে লোকটির পকেটে থাকা বন্ধ ফোনটি চিৎকার করে বেজে উঠলো! আমি রাগ রাগ চোখে তার দিকে তাকালাম!

‘হ্যালো আম্মু!’

‘এই তো বাসার দিকে যাচ্ছি!’

‘না, একা না’

‘না, তুমি চিনবা না!’

‘আম্মু, আমি বাসায় গিয়ে কল দিচ্ছি! আল্লাহ হাফেজ!’

কেমন যেন অপরাধী চোখে লোকটা আমার দিকে তাকাচ্ছে! আমি বললাম, ‘পাওয়ার ব্যাংক কি এখনো লাগবে?’

– স্যরি! লাগবে না!

‘আপনি কি আসলেই গাবতলী যাচ্ছিলেন?’

ইয়ে মানে…গাবতলী হয়ে মিরপুর যাচ্ছিলাম আর কি!

লোকটার এই কথা শুনে আমি জোরে হেসে ফেললাম! সেও হেসে উঠলো!

অনেকক্ষণ দুজনেই চুপ! কেউ কোন কথা খুঁজে পাচ্ছি না! শ্যামলীর কাছাকাছি চলে আসলাম। এরপরেই কল্যানপুর!

আমি বললাম, ‘চশমা পরেন নি কেন?’

ভীষণ চমকে উঠে সে বললো, ‘মানে! আপনি কিভাবে জানেন আমি….!’

‘যেভাবে চোখ-মুখ কুঁচকে আশে-পাশে তাকাচ্ছেন! তাই মনে হলো!’

– আসলে ঠিকই ধরেছেন! অফিস থেকে বের হবার সময় ভুলে ওয়াশরুমে রেখে এসেছি!

রাস্তা খালি থাকায় অল্প সময়েই কল্যাণপুর চলে আসলাম! লোকটাকে থ্যাংক্স বলে রিক্সা থেকে নামলাম। একটু হেসে হাত নেড়ে সে রিক্সা ঘুরিয়ে রওনা হলো!

হঠাৎ একটু চিৎকার করে বললাম, ‘শুনুন!’

লোকটা ফিরে তাকালো!

‘একটু কম কম বার্গার খাবেন! আপনার পাশে বসতে কষ্ট হয়!’

লোকটা হা করে চেয়ে আছে, রিক্সাটা আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। আমিও হাঁটা শুরু করলাম। ফোন বের করে আবারো লোকটার প্রোফাইলে ঢুকলাম, রোজকার মত!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।