একটি প্রেমের গল্প!

আমার কাছে মনে হয় ওর সাথে কথা বলিনা দীর্ঘ এক সপ্তাহ, অথচ আমাদের কথা হয়না অন্তত একুশ দিন। এই হলো আমাদের প্রেম। আমরা একজন আরেকজনকে মিস যে করি তাও না। তারপরও আমরা প্রেমিক প্রেমিকা। প্রেমের শর্ত মেনে প্রতি সপ্তায় একটা ‘মিস ইউ’ মেসেজ অবশ্য একে অন্যকে পাঠাই।

আমাদের প্রেমের শুরুটা কিভাবে হয় বলি। গতবছরের কথা। কাজিনের বিয়েতে গিয়ে ওর সাথে আমার দেখা হয়। প্রথম দেখা যাকে বলে। আমি ওর কাছে গিয়ে বলি, ‘তুমি অনেক সুন্দর।’

ও বলে, ‘তুমিও হ্যান্ডসাম অনেক।’

আমি বলি, ‘চলো প্রেম করি।’

ও বলে, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’

আমি বলি, ‘আই লাভ ইউ তাইলে।’

ও বলে, ‘হুম, আই লাভ ইউ টু।’

তারপর আমি বাই বলে চলে আসি। সেদিন থেকেই আমরা প্রেমিক প্রেমিকা হয়ে যাই।

রাতে ওকে ফোন দিই। বলি, ‘শুনেছি প্রেম করতে হলে প্রতিদিন একটা কথা জিজ্ঞেস করতেই হয়। এটা নাকি প্রেমের নিয়ম। সেটা জিজ্ঞেস করতেই ফোন দিয়েছি।’

ও বলে, ‘হ্যা জিজ্ঞেস করো।’

আমি বলি, ‘বাবু খাইছো?’

ও উত্তর দেয়, ‘হ্যা খাইছি। তুমি?’

আমি বলি, ‘আমিও।’

ও বলে, ‘আচ্ছা রাখি তাইলে। বাই।’

ফোন রেখে দেই। এই হলো আমাদের প্রেম। আমি ফোনে রিমাইন্ডার সেট করে রেখেছি। তিনবেলা ওকে ফোন দিয়ে, ‘বাবু খাইছো’ জিজ্ঞেস করেই ফোন কেটে দেই।

কিছুদিন যাওয়ার পর আর নিয়মিত এটাও জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠে না। ওকে দেওয়া দুইটা কলের মাঝে বিরতি পড়ে যায় এক সপ্তাহ, দশদিন, অথবা আরো বেশি। এভাবেই আমাদের প্রেম চলে।

আমাদের কখনো ফোনে কথা বলতে ইচ্ছা করেনা। দেখা করতেও ইচ্ছা করেনা। তারপরও আমরা প্রেমিক প্রেমিকা। আমাদের ফেসবুকে ‘ইন এ রিলেশনশিপ’ স্ট্যাটাস দেয়া একে অন্যকে ট্যাগ করে। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘গার্লফ্রেন্ড আছে?’

আমি হ্যা সূচক উত্তর দিই।

কেউ যদি ওকে প্রশ্ন করে, ‘আর ইউ সিঙ্গেল?’

ও উত্তর দেয়, না।

সেদিন এক বড়ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোর গার্লফ্রেন্ডের বাসা কই?’

তখন আমার মনে পড়লো আমি আসলে সেটা জানিনা। এমনকি ও কিসে পড়ে, আদৌ লিখাপড়া করে নাকি, তাও জানিনা।

সেদিন রাতেই জেনে নিলাম।

এখন কেউ জিজ্ঞেস করলে আমি বলতে পারি।

আমি ওকে কিছু একটা বলবো ভেবেছিলাম, কিন্তু পরে ভুলে গেছি। কোনোভাবেই মনে পড়ছে না। সপ্তাহখানেক পর কথাটা মনে পড়তেই আমি কল দিলাম।

কথাটা হলো, ‘আমার তোমাকে ভীষণ মনে পড়ছে। সারাদিন ভাবছি তোমার কথা। তোমাকে না দেখলে আমার বুকের মধ্যে ফাকা ফাকা লাগছে। আমার চোখ তোমাকে দেখার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে অপেক্ষা করছে। চলো দেখা করি।’

আমি ওকে কথাটা বলার পর ও বললো, ‘আমারো একই অবস্থা।’

আমি বললাম, ‘কবে ফ্রি থাকবা?’

ও বললো, ‘সামনের মাসের একুশ তারিখ বিকালে।’

আমি আচ্ছা ঠিকাছে বলে ফোন রেখে দিলাম।

আমরা দুজনই ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। আমি জহুরুল হক হলে থাকি আর ও সামসুন্নাহার হলে। ফোন করার প্রায় দেড়মাস পর, একুশ তারিখে বিকালে দুজন হল থেকে বের হয়ে একটা রেস্টুরেন্টে যাই। দুইটা পিজা অর্ডার দিয়ে চুপচাপ খেয়েদেয়ে আবার হলে ফিরে আসি। নিয়ম অনুযায়ী বিল আমি দেই। মাঝে একবার ও বলে, ‘আজ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বিকাল কাটাচ্ছি।’

আমি বলি, ‘আমার নিজের ক্ষেত্রেও ধারনা অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ।’

তার আরো চার মাস পর আমরা আবার দেখা করি।

কফি খেতে খেতে আমি বলি, ‘তোমাকে ছাড়া আমার প্রতিটা মুহুর্ত অসম্ভব কষ্টে কেটেছে।’

ও বলে, ‘আচ্ছা, তাইলে আমারো ভীষণ কষ্টে কেটেছে।’

কফি শেষ করে আমরা একে অন্যকে বাই বলে চলে আসি।

কোনো রাতে ভীষণ জোসনা নামলে আমি ওকে কল দিয়ে বলি, ‘আমাদের বিয়ের পর এরকম রাতে আমরা ছাদে যাবো।’

ও বলে, ‘আচ্ছা।’

ভীষণ শীত পড়লে আমি কল দিয়ে বলি, ‘কম্বলের নীচে তুমি আমার সাথে থাকলে ওম বেশি হতো।’

ও বলে, ‘আমার ক্ষেত্রেও একই ধারণা।’

ও কোথাও বেড়াতে গেলে আমাকে ফোন দিয়ে বলে, ‘এখানে আমার সাথে তুমি নেই বলে বেড়ানোর আনন্দটা পরিপূর্ণ হলো না।’

আমি কোথাও গেলে ওকে ফোন দেই, ‘তুমি সাথে নেই বলে এখানে আসার সমস্ত খুশিই ম্লান হয়ে গেলো।’

এভাবে আমাদের প্রতি মাসেই দুইএকবার কথা হয়। এভাবেই আমাদের প্রেম চলে। আমরা একে অন্যকে প্রেমিক প্রেমিকা হিসাবে জানি এবং মানি।

এরকম একদিন তিনমাস পর ও কল দিয়ে আমাকে বলে, ‘শুনো আমার বাসা থেকে ছেলে দেখছে। তুমি পারলে কিছু করো।’

আমি বলি, ‘আমি চাকরী খুজছি। চাকরীটা আগে পেয়ে নেই।’

তার আরো মাসদুয়েক পর আমি ওকে কল দিয়ে বলি, ‘চাকরীটা আমি পেয়ে গেছি মুনিয়া শুনছো?’

ও বলে, ‘আমার প্রচন্ড আনন্দ হচ্ছে এই খবর শুনে।’

এই ঘটনার পাঁচ মাস পর ও ফোন দিয়ে বলে, ‘আমার বাসা থেকে বিয়ে ঠিক করেছে। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।’

আমি বলি, ‘আমিও বাঁচবোনা তোমায় ছাড়া।’

তার আরো দেড়মাস পর ওর বিয়ে হয়ে যায়। আমি সেদিন রাতে বারে গিয়ে দুই পেগ মদ খেয়ে আসি। কারণ ও আমার প্রেমিকা। প্রেমিকার বিয়ে হলে প্রেমিকদের মদ খাওয়ার নিয়ম।

এভাবেই আমাদের দিন কেটে যায়। যেদিন রাতে খুব রোমান্টিক বৃষ্টি হয়, সেদিন ঘুম ভেঙে গেলে আমি ওর কথা ভেবে দুই তিনটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ি। এটাও করতে হয়। রুলস আর রুলস।

ওর এখন দুইটা বাচ্চা। এক ছেলে এক মেয়ে। আমার শুধু একটাই ছেলে। তারপরও আমরা একজন আরেকজনকে এখনো ভালোবাসি। নিয়ম মেনে নিয়মিত মিস করি। কিচ্ছু করার নেই। প্রেম যে করেছিলাম আমরা। প্রেম খুব গভীর একটা বিষয়। একবার প্রেম করলে তারপর বাকি জীবন সেটা বয়ে বেড়াতে হয়। কারণ এটাই প্রেমের নিয়ম।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।