একটি প্রতিভার অপচয়

ইতিহাস গড়তে বাংলাদেশের প্রয়োজন ৩৭ বলে ৪৮ রান। হাতে আছে ৬টি উইকেট। সামনে বাধা গ্ল্যান ম্যাকগ্রা, জেসন গিলেস্পি ও মাইকেল ক্যাসপ্রোভিচের মত বোলাররা। উইকেটে খুব ভালভাবে জমে যাওয়া মোহাম্মদ আশরাফুলের সাথে এসে যোগ দিলেন ১৯ বছর বয়সী আফতাব আহমেদ। নেমেই সহজাত খেলাটা খেলতে শুরু করে দিলেন তিনি। বাউন্ডারি হাকিয়ে খুললেন রানের খাতা। ধারাবাহিকভাবে স্ট্রাইক রোটেট করে আশরাফুলকে চাপমুক্ত রাখার পাশাপাশি জুটি গড়তে লাগলেন। তবে সে জুটি ২৫ রানের বেশি এগোয়নি। ততক্ষণে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরির মাধ্যমে জয়ের ভীত গড়ে দিয়ে সাজঘরে ফিরে গেলেন আশরাফুল।

তখনও অজিদের কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দেয়া বাকি ছিল। বলে-রানে সমান ১০০ করে আশরাফুল আউট হয়ে যাবার পরও জয়ের জন্য বাংলাদেশের দরকার ছিল ১৭ বলে ২৩! এবার বাকি কাজটা সম্পন্ন করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন আফতাব। অস্ট্রেলিয়ার বড় বড় নামধারী বোলারদের সামলে একাই এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকলেন দলকে।

এগিয়ে যেতে যেতে শেষ ৬ বলে যখন দরকার ৭ রান তখন গিলেস্পির করা একটি লেন্থ বল উড়িয়ে ডিপ মিড উইকেটের সীমানায় আছড়ে ফেললেন তিনি। এরই সাথে প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়াকেও ছিটকে ফেললেন ম্যাচের বাইরে। পরের বলে সিঙ্গেল নেয়ার মাধ্যমে কার্ডিফের সবুজ ক্যানভাসে তুলির শেষ আচড়টা বসালেন। সমগ্র বাংলাদেশ যেন একসাথে গর্জন দিয়ে উঠলো তখন। দৌঁড়ে পপিং পিচ পার করার সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় আফতাব আহমেদের বুনো উল্লাস যা ছড়িয়ে পড়ে এদেশের ১৪ কোটি মানুষের মধ্যে।

৫০ তম ওভারের ২য় বলটি আফতাব আহমেদের ব্যাটের কানায়া লেগে উইকেট পেছনে যাওয়ার পর অ্যাডাম গিলক্রিস্ট বল থ্রো করে স্ট্যাম্প ভাঙ্গতে পুরোপুরি ব্যর্থ হলে কার্ডিফে ড্রেসিংরুমের ব্যালকনিতে শুরু হয়ে যায় বাঘেদের ক্যাঙ্গারু বধের উদযাপন। ততক্ষণে শেষ বিকেলের নায়ক আফতাব ড্রেসিংরুমের দিকে দিলেন ভো দৌঁড়। এক দৌঁড়ে বিপরীত প্রান্ত থেকে দৌঁড়ে আসা ঝাঁকড়া চুলের অধিকারী শাহরিয়ার নাফিসের কোলে চড়ে বসলেন। একজন বাংলাদেশি হিসেবে সেই মুহূর্তগুলো নিশ্চয়ই ভুলার নয়। তেমনি ভুলার নয় আফতাব আহমেদ নামটিও।

তখন টি-টোয়েন্টির রমরমা যুগ ছিল না। আইসিসি থেকেও স্বীকৃতি পেয়ে উঠেনি বর্তমান সময়ে ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই সংস্করণটি। ইংল্যান্ডের কাউন্টি টি-টোয়েন্টি লিগ ছাড়া আইপিএল, বিপিএল, বিগ ব্যাশের মত চাকচিক্যময় ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি লিগগুলোও তখন আয়োজিত হত না  বিশ্বব্যাপী। কিন্তু সেসময় বাংলাদেশ দলে একজন ব্যাটসম্যান ছিলেন যিনি টেস্ট, ওয়ানডে দুই সংস্করণেই টি-টোয়েন্টি মেজাজে ব্যাটিং করে যেতেন সবসময়। ছোটখাটো গড়নের হলেও বোলারদের মেরে তুলোধুনো করাই ছিল যার ব্যাটিং দর্শন সেই মারকাটারি ব্যাটসম্যানের নাম আফতাব আহমেদ।

খেলোয়াড়ি জীবনে ভরডরহীন ক্রিকেট খেলতেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন আফতাব। প্রতিপক্ষ কোন দল বা কোন বোলারকে মোকাবেলা করছেন তাতে মাথা না ঘামিয়ে শুধু ব্যাট চালিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁর ক্রিকেট দর্শন। হার্ড হিটিং ব্যাটিংয়ের জন্য খেলা শুরু করার অল্প সময়ের মধ্যেই দর্শক পরিমন্ডলে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।

তাই প্রতি ম্যাচে তিনি যখন ড্রেসিংরুম থেকে ব্যাট হাতে মাঠে প্রবেশ করতেন তখন গ্যালারিতে সমর্থকদের মধ্যে এক অন্যরকম আনন্দ উচ্ছ্বাস বয়ে যেত। ‘আফতাব… আফতাব’ কলরবে মুখরিত হয়ে যেত পুরো স্টেডিয়ামের গ্যালারি যা পুলকিত করত খোদ আফতাবকেই। সমর্থকদের এরূপ ভালবাসাই মাঠে আফতাব আহমেদের ভেতর থেকে ধুমধাড়াক্কা ব্যাটিংটাকে বের করে আনত সবসময়।

২০০২ সালের যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলে অভিষেক হয় আফতাব আহমেদের। টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহ করেন তিনি। ৬ ম্যাচে ২১.৮৩ গড়ে করেন ১৩১ রান। তারপর ২০০৪ সালে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় যুব বিশ্বকাপে খেলতে নেমে টুর্নামেন্টে দলের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬৭ রান সংগ্রহ করেন আফতাব। গড় ২৩.৮৫ এবং ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ৫৭ রান যা আসে প্লেট ফাইনালের মত গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচে। ফতুল্লায় সে ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে ৮ রানে হারিয়ে ২০০২ যুব বিশ্বকাপের প্লেট চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ যুব দল।

যুব দলে থাকা অবস্থায় নির্বাচকদের নজরে আসেন আফতাব আহমেদ। ২০০২ যুব বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে একটি ম্যাচে ৭৯ রানের ইনিংস খেলে জাতীয় দলের নির্বাচকদের নজর কাড়েন তিনি। ২০০৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে তাই প্রথমবারের মত তিনি দলে ডাক পান। তবে মূল সিরিজের আগে দুটি গা গরমের ম্যাচে নিজেকে মেলে ধরতে না পারায়া সেবার আর সাদা পোশাক গায়ে জড়ানো হয়নি তাঁর।

তারপর ঘরের মাঠে ২০০৪ সালে যুব বিশ্বকাপ খেলার ছয় মাসের মাথায়  জাতীয় দলে দ্বিতীয়বারের মত ডাক পান তিনি। তবে এবার আর টেস্টে দলে নয়, ওয়ানডে দলে। ২০০৪ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির জন্য নির্বাচকদের ঘোষণা করা ১৪ সদস্যের বাংলাদেশ দলে ঠাই পান আফতাব। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই ওয়ানডে অভিষেক হয়ে গেলেও তা মোটেও সুখকর ছিল না তাঁর জন্য। অভিষেক ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৩ বল খেলে তিনি মেরে বসেন ‘ডাক’। গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ও শেষ ম্যাচে অবশ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রানের খাতা খুলেন তিনি। খেলেন ৪৪ বলে ২১ রানের একটি ইনিংস।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পরপরই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজের জন্য দলে জায়গা করে নেন আফতাব। ঢাকায় প্রথম টেস্টে একাদশে সুযোগ না পেলেও পরের টেস্টেই নিজ শহর চট্টগ্রামে সাদা পোশাকে অভিষেক হয় তাঁর। ওয়ানডের মত টেস্ট অভিষেকটাও স্মরণীয় করে রাখতে পারেননি তিনি। দুই ইনিংসে ব্যাট করে সংগ্রহ করেন ২০ ও ২৮ রান। ব্যাট হাতে সেই ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্সের মত বিবর্ণ ছিল বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্সও। ম্যাচে তাদেরকে হারতে হয় ইনিংস ও ১০১ রানের বিশাল ব্যবধানে।

ঠিক এর পরের ম্যাচেই ভারতের বিপক্ষে সাদা পোশাকে প্রথম অর্ধশতক পেতে পেতেও পেলেন না আফতাব। আক্ষেপ মাত্র ৭ রানের। তারপর টানা কয়েকটি ম্যাচে খুব বাজে সময়ের মধ্য দিয়ে গেলেও টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থার আসনটা হারাননি তিনি। যে কারণে অভিষেকের পর থেকে টানা ৮ ইনিংসে অর্ধশতকের দেখা না পাওয়া আফতাবকে সঙ্গে করেই ২০০৫ সালে ইংল্যান্ড সফরে যায় বাংলাদেশ।

সেখানে প্রথম টেস্টে তেমন কিছু করে দেখাতে না পারলেও দ্বিতীয় টেস্টে ব্যাট হাতে জ্বলে ওঠেন তিনি। ওয়ানডের মত টেস্ট ক্রিকেটেও যে তেড়েফুঁড়ে খেলার স্বভাবটা বদলাতে পারেননি আফতাব তার প্রমাণ মেলে ২০০৫ এ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচে। সাদা পোশাকের ক্রিকেটে প্রথম এবং একমাত্র  অর্ধশতক পাওয়া সেই ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি খেলেন ৮২ বলে অপরাজিত ৮২ রানের একটি ইনিংস। স্টিভ হার্মিসন, ম্যাথু হগার্ড, অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফদের সুইং, পেস ও বাউন্স সামলিয়েই এই বিরোচিত ইনিংসটি খেলেন তিনি। সেখানে তাঁর ব্যাটিং ধরণ দেখে তখনকার ইংলিশ কাপ্তান মাইকেল ভন তাকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের বড় বিজ্ঞাপন বলে অভিহিত করেছিলেন।

আফতাবের এই মারমার কাটকাট খেলার ধরনই পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশের কার্ডিফকাব্য রচনা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কার্ডিফের সেই ম্যাচে আশরাফুলের সেঞ্চুরির পর শেষদিকে ২ চার ও ১ ছয়ে আফতাবের অপরাজিত ১৩ বলে ২১ রানের ইনিংসটি ৪ বল বাকি থাকতে বাংলাদেশকে পৌঁছে দেয় জয়ের দোরগোড়ায়।

কার্ডিফ জয়ের মত বাংলাদেশ ক্রিকেটের ঐতিহাসিক জয়গুলোর বেশকয়েকটিতেই রয়েছে আফতাব আহমেদের আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের অবদান।

২০০৬ সালে বগুড়ায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম কোন ওয়ানডে জয় পাওয়ার সেই ম্যাচে ২১ বলে অপরাজিত ৩২ রান করে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি। ম্যাচে বাংলাদেশ জয় পায় ৪ উইকেটে। এরপরের বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম জয়ের ম্যাচেও হেসেছিল তাঁর ব্যাট। ২০০৭ সালে জোহানসবার্গের ওয়ান্ডারার্সে সেই ম্যাচে উইন্ডিজের বিপক্ষে ১২৬.৫৩ স্ট্রাইকরেটে ৪৯ বলে অপরাজিত ৬২ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। তাঁর এই ইনিংসটি সাজানো ছিল ৮টি চার ও ১টি ছয়ের মারে যা বাংলাদেশকে ৬ উইকেটের একটি বড় জয় পেতে সাহায্য করে।

টুর্নামেন্টে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচেও অব্যাহত থাকে আফতাবের ব্যাটিং তান্ডব। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেই ম্যাচে ব্যাট করতে নেমেই মাখায়া এনটিনির একটি ওভারের শেষ ৩ বলে ১৬ রান নেয়ার ঘটনাটা আবারো ইঙ্গিত দেয় তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের। কেপটাউনে ইনিংসের ২য় ওভারের ১ম বলে নাজিমউদ্দিন আউট হয়ে গেলে উইকেটে ব্যাটিং করতে নামেন আফতাব। ১ম দুই বল সমীহ করে ঘন্টায় ৯০ মাইল বেগে করা এনটিনির তৃতীয় বলটি ডাউন দ্য উইকেটে এসে বাতাসে ভাসিয়ে ডিপ মিডউইকেটের সীমানায় আছড়ে ফেলেন তিনি।

পরের বল লং অফ দিয়ে আবারো সীমানাছাড়া করার পর ওভারের শেষ বলে মিডউইকেট দিয়ে হাকান চার। যেই মাখায়া এনটিনির গতির ঝড়ে ভড়কে যেত বিশ্বের বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানরা সেই এনটিনির পর পর তিন বলে ২টি ওভার বাউন্ডারি ও ১টি বাউন্ডারি মারার দুঃসাহসই বলে দেয় আফতাব আহমেদ যেকোন বোলারের জন্য কতটা ভয়ঙ্কর ছিলেন। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেই ইনিংসটিকে খুব বেশি লম্বা করতে পারেননি তিনি। মর্নে মরকেলের বলে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফিরে যাবার আগে ১৪ বলে ৫ চার ও ২ ছয়ের সাহায্যে তিনি করেন ৩৬ রান যেখানে তাঁর অবিশ্বাস্য স্ট্রাইকরেটটি ছিল ২৫৭.১৪!

২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে বেশ ধারাবাহিক ছিলেন আফতাব আহমেদ। ৫ ম্যাচে ৪০.৫ গড়ে তাঁর সংগ্রহ ছিল ১৬২ রান যা বাংলাদেশের হয়ে পুরো টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ। তিনি যে সবসময় শুধু মেরেই খেলতেন এমনটিও নয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় দলের প্রয়োজনে মাঝেসাঝে ধীরস্থিরভাবেও ব্যাটিং করতেন তিনি। এই যেমন ২০০৪ সালে ভারতের বিপক্ষে ৩ ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডের কথা ধরা যাক।

নিজেদের ১০০ তম ওয়ানডের সেই ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে শুরুতে ৩৭ রানে তিনজন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে বিপাকে পড়ে যায় বাংলাদেশ। তখন ৫ নাম্বারে ব্যাট করতে এসে দলের হাল ধরেন আফতাব। ৯৮ বলে খেলেন ৬৭ রানের একটি ধীরগতির ইনিংস যা ২২৯ রানের একটি লড়াকু পুঁজি গড়ে তুলতে সাহায্য করে বাংলাদেশকে। পরবর্তীতে মাশরাফি, তাপস, রফিক ও সুজনের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ভারতের বিপক্ষে ১৫ রানের জয়ে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের শততম ওয়ানডে ম্যাচটাকে স্মরণীয় করে রাখে বাংলাদেশ।

ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি বোলিংটাও খুব একটা খারাপ করতেন না আফতাব যদিও তাকে কখনোই অলরাউন্ডার হিসেবে গণ্য করা হত না। ২০০৪ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে পুরো ১০ ওভার বোলিং করে মাত্র ৩১ রান খরচায় তিনি তুলে নেন ৫টি উইকেট যা ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ বাংলাদেশি বোলার হিসেবে ৫ উইকেট নেয়ার রেকর্ড হয়ে আছে ।

আফতাব আহমেদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার মাত্র ৬ বছরের। তবে তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারটা আরো দীর্ঘ হওয়ার কথা ছিল।আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিণত ক্রিকেটার হিসেবে যখন নিজেকে আত্মপ্রকাশ করেন ঠিক তখনই পথ হারিয়ে ফেলেন তিনি। ২০০৮ সালে জাতীয় দলের বেশকয়েকজন ক্রিকেটারের সাথে ‘নিষিদ্ধ ক্রিকেট লিগ’ আইসিএলে খেলতে যাওয়ায় সবার মত তাকেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।

দুই বছর পর অবশ্য বিসিবি তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ায় জাতীয় দলে আবারো ফিরেছিলেন তিনি কিন্তু পুরনো রূপে আর নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। দীর্ঘদিন খেলার সাথে যুক্ত না থাকায়  ফিটনেসে ছিল যথেষ্ট ঘাটতি, ব্যাটেও আগের ধারটা ছিল না সেইসাথে রিফ্লেক্সও কমে গিয়েছিল যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে তাঁর পারফরম্যান্সে। তাই দলে ফেরার পর ২০১০ সালে নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের সাথে ২টি টেস্ট ও ৫টি ওয়ানডে খেলে আবারো বাদ পড়ে যান তিনি।

তারপর আর দলে ফিরতে না পেরে ২০১৪ সালে সব ধরনের ক্রিকেটকে বিদায় জানান আফতাব আহমেদ।

পরিসংখ্যানের বিচারে আফতাবের ক্যারিয়ার বড়ই সাদামাটা। ৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ১৬ টেস্টে ২০.৭৮ গড়ে ৫৮২,ওয়ানডেতে ২৪.৭৩ গড়ে ১৯৫৪ এবং টি-২০ তে ১১ ম্যাচে ২২.৮০ গড়ে ২২৮ রান করেন তিনি।

চট্টগ্রামের ক্রিকেটাররা প্রতিভাবান হলেও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিভার সবটুকু বের করে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টাটা তাদের থাকে না বলে প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে। আর এই ধারণার অন্যতম কারণ বোধহয় আফতাব আহমেদ।

আফতাব আহমেদ যে বাংলাদেশের একজন প্রতিভাবান ক্রিকেটার ছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু খেলোয়াড়ি জীবনে তাঁর অনেক হেয়ালিপনা ছিল। এমনকি জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে পালানোর রেকর্ডও রয়েছে তাঁর। আন্তর্জাতিক অভিষেকের আগে বেশ কয়েকবার ক্যাম্পে ডাক পেয়েও দলে সুযোগ না পাওয়ায় হতাশাগ্রস্থ হয়ে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাওয়ার উদাহরণ রয়েছে আফতাবের।

আফতাব আহমেদ বরাবরই আরামপ্রিয় একজন মানুষ। ফিটনেসের প্রতি তিনি ছিলেন উদাসীন। ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’- এ কথাটিকে সবসময় এড়িয়ে চলতেন তিনি। এর ফলে তাঁর ক্যারিয়ারের সূর্য যে সময়টায় সবচেয়ে বেশি আলো ছড়ানোর কথা ছিল ঠিক সেসময়েই ডুবে যায়।

ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন একটু উদাসীন। তাঁর বাবা ছিলেন পুরাদস্তুর ক্রীড়াপ্রেমি। তাই ছেলেকে একসময় বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু পরিবার ও বন্ধুবান্ধব ছেড়ে সেখানে থাকতে হবে বলে কোনভাবেই বিকেএসপিতে ভর্তি হতে রাজি ছিলেন না আফতাব। তাই তাঁর বাবা অনেকটা জোরপূর্বক তাকে বিকেএসপিতে ভর্তি করান। একসময় সেখান থেকে জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণ করেন তিনি। কিন্তু ১৯৯৯ সালে পৃথিবী ত্যাগ করায় ক্রিকেটার ছেলের কীর্তিগাথা আর দেখে যাওয়া হয়নি বাবার।

ক্রিকেট থেকে অবসরে যাওয়ার পর কোচিং পেশায় নিয়োজিত হন আফতাব। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামে নিজের নামে একটি ক্রিকেট অ্যাকাডেমি চালু করেন তিনি। বর্তমানে কোচ হিসেবে সেখানে তিনি ক্ষুদে খেলোয়াড়দের ক্রিকেট প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরি স্টেডিয়ামের পাশে অবস্থিত মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স মাঠ ও নাসিরাবাদ বয়েজ স্কুল মাঠে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন তিনি। প্রশিক্ষণ চলে সপ্তাহে চারদিন।

সেখান থেকে প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের তুলে আনাই মূল লক্ষ্য তাঁর। মূলত চট্টগ্রাম থেকে পাইপলাইনে তেমন কোন  ক্রিকেটার না থাকায় তাঁর কোচিং পেশায় আসা। নিজ অ্যাকাডেমি থেকে অন্তত জাতীয় পর্যায়ে খেলার মত ক্রিকেটার তৈরি করতে চান তিনি। খেলোয়াড়ি জীবনে একটু উদাসীন থাকলেও কোচিং পেশায় বেশ পরিশ্রমী আফতাব আহমেদ। সেটাই তো স্বাভাবিক। শত শত ক্ষুদে বাচ্চাদের ক্রিকেটার হিসেবে ভবিষ্যত গড়ার দায়িত্ব যে এখন তাঁর কাঁধে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।